kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

করোনার টিকা

নিবন্ধনের বিকল্প পথগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে না

তৌফিক মারুফ   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:৩৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিবন্ধনের বিকল্প পথগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে না

করোনাভাইরাসের টিকার নিবন্ধন আরো সহজ করতে তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সহজে নিবন্ধন করতে সরকারের হাতে আরো বেশ কিছু বিকল্প পথ থাকলেও তা কাজে লাগানো হচ্ছে না বলে মনে করছেন তাঁরা। টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়স, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং মোবাইল ফোনের গ্রাহকদের বয়স একই হওয়ায় কেন্দ্রে গিয়ে কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এড়িয়ে সরকারের উদ্যোগেই গণনিবন্ধন করা যায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ অবশ্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বুথ বসিয়ে বিনা মূল্যে নিবন্ধন করার পরামর্শ দিয়েছেন। আবার কারো কারো মতে, বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মীদেরও নিবন্ধন কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে সবার কথায় উঠে এসেছে, সরকার চাইলে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া আরো সহজ করতে পারত।

এদিকে আবার কোথাও কোথাও বিনা মূল্যে মানুষকে টিকার নিবন্ধন করে দিতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এসেছে কোনো কোনো সংস্থা বা ব্যক্তি। আর নিবন্ধনে আগ্রহী ব্যক্তিদের নিবন্ধন করে দেওয়ার টোপ ফেলে অলিগলিতে যেভাবে নিবন্ধন বাণিজ্য শুরু হয়েছে, তাতে মানুষের হয়রানি বাড়বে বলেই মনে করছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করার জন্য আরো পথ খুঁজছি। বিষয়টি যেহেতু আইসিটি মন্ত্রণালয় দেখভাল করছে, তাই তাদের সঙ্গে আমরা আরো আলাপ-আলোচনা করব। আমরাও চাই মানুষ যাতে সহজে নিবন্ধন করতে পারে এবং টিকা দিতে পারে।’

করোনা মোকাবেলায় জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার বিকল্প আরো অনেক সহজ পথ রয়েছে। সরকার সেদিকে এখনো নজর দিতে পারছে না বা সেগুলো কাজে লাগাচ্ছে না। এককথায় বলতে গেলে দেশে যারা তালিকাভুক্ত ভোটার তাঁরাই টিকার উপযোগী। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্র যাঁরা করছেন এবং বিতরণ করছেন, তাঁরা যেমন বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই টিকার নিবন্ধনে ভূমিকা রাখতে পারেন, তেমনি মোবাইল ফোনের গ্রাহকরাও টিকার আওতায় রয়েছেন। ফলে মোবাইল ফোন অপারেটররাও বিনা মূল্যে তাদের গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল কোনো পদ্ধতি চালু করতে পারে। আর মাঠ পর্যায়ে আইটি সেন্টারগুলো তো আছেই।’

সরকার নির্ধারিত কেন্দ্র হিসেবে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে বাঁশবাড়ি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশের কাঁটাসুরের ব্যবসায়ী মোরশেদুল ইসলাম জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে সেখানে গিয়ে টিকা নিতে চাইলে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরামর্শ দেওয়া হয়, বাইরে থেকে নিবন্ধন করে তারিখ অনুসারে যেতে। স্বল্পশিক্ষিত মোরশেদুল ক্ষুব্ধ হয়ে বেরিয়ে টিকা আর দেবেন না বলে হেঁটে যাচ্ছিলেন বাসার পথে। পথের পাশের কম্পিউটারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দেখেন, ‘এখানে করোনা টিকার রেজিস্ট্রেশন করা হয়’ লেখা কাগজ। ক্ষোভ কিছুটা কমিয়ে আইডি কার্ড বের করে দোকানের এক কর্মীর হাতে দিয়ে নিবন্ধন করে দিতে বলেন। ওই কর্মী কাজ শুরুর আগেই জানতে চান, ‘৪০ টাকা আছে তো? কম হইবো না কিন্তু!’ মোরশেদুল এবার আগের চেয়ে আরো ক্ষেপে নিজের কার্ডটি ছিনিয়ে নিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হৈচৈ শুরু করে দেন।

মোরশেদুল কালের কণ্ঠকে বলেন ‘দ্যাখছেন, কেমন একখান তামাশা পাতছে। সরকার কেন্দ্রে রেজিস্ট্রেশন বন্ধ কইর‌্যা এই ধান্দাবাজির সুযোগ কইর‌্যা দিছে। তাও আবার ৪০ টাকা!’ ওই দোকানের কর্মীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অন্য সব নিবন্ধনে তো আমরা আরো বেশি নেই। টিকার কারণে একটু কম নিচ্ছি। আমাগো তো খরচ আছে।’

ওই দোকানের মতো একই এলাকার আরো বেশ কিছু কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে দেখা গেছে ‘টিকার নিবন্ধন করা হয়’ লেখা কাগজ সাঁটা। তবে ফি কোথাও ৩০ টাকা, কোথাও ৪০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর নীলক্ষেত, কাঁটাবন, ফার্মগেট, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে একইভাবে নিবন্ধন বাণিজ্যের পসরা দেখা গেছে। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকা থেকে এমন নিবন্ধন বাণিজ্যের খবর পাওয়া গেছে। রামপুরা ওয়াপদা রোডের সব দোকানে এক দরে ৫০ টাকা করে টিকার নিবন্ধন ও প্রিন্ট করতে দেখা গেছে গতকাল বুধবার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শক ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন ও কাউন্সিলররা যাঁর যাঁর এলাকায় নির্বাচনের সময় যেভাবে ক্যাম্পেইন করেন, মানুষকে যেভাবে লিফলেট বা ভোটার স্লিপ বিতরণ করেন, বুথ বসিয়ে এখনো তাঁরা একইভাবে তাঁদের ভোটারদের বিনা মূল্যে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করলে মানুষের অনেক বেশি উপকার হতো।’

ঢাকার বাইরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামালপুর সদর হাসপাতালের টিকাদানকেন্দ্রে নিবন্ধন চালু আছে। টিকাদানকেন্দ্রের বাইরে আলাদা বুথ তৈরি করা হয়েছে ওই হাসপাতালের উদ্যোগেই। সেখানে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় ল্যাপটপ দিয়ে বিনা মূল্যে নিবন্ধন ও টিকা কার্ড প্রিন্ট করে দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে জামালপুর শহরের বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকানেও নিবন্ধন চলছে। যেখানে নিবন্ধন করতে নেওয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। 

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিবন্ধন ও প্রিন্ট করতে নেওয়া হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা, হবিগঞ্জে নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা, রাজশাহীর দুর্গাপুরে ২০ থেকে ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে, রাঙামাটির লংগদুতে নেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা