kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭। ৪ মার্চ ২০২১। ১৯ রজব ১৪৪২

ফাঁকির খেসারত দিতে হচ্ছে

ইকরামউজ্জমান   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:৪৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফাঁকির খেসারত দিতে হচ্ছে

ফাল্গুনের শেষ বিকেলে লাল বলের টেস্ট ক্রিকেটের রোমাঞ্চকর নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটল বিয়োগান্ত। দেশের খেলা তো স্রেফ একটি খেলা হতে পারে না। এই খেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতির ভাবমূর্তি এবং সম্মান। ২০১২ সালের পর দেশের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে আবার ধবল ধোলাই। ভাগ্যিস, বাংলাদেশ কম টেস্ট ম্যাচ খেলে। পুরো বিশ্ব জেনেছে, সর্বশক্তির অধিকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২-০) উপমহাদেশ থেকে ২০১২ সালের পর বাংলাদেশের মাটিতে তাদের পরাজিত করে সিরিজ জয় করেছে। টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে অবশ্য টিম ম্যানেজমেন্ট ও খেলোয়াড়রা দুই টেস্ট ম্যাচ থেকে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মূল খাতায় পয়েন্ট যোগের খোয়াব দেখছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটের আলাদা একটি সুমহান ঐতিহ্য আছে। এই দলটিকে হালকাভাবে দেখার কি কোনো সুযোগ আছে! প্রথম টেস্ট তো জিতিয়েছেন দুজন অভিষিক্ত খেলোয়াড়।

না, এটি ক্রিকেটের রসিকতা নয়। অযোগ্যের শাস্তি। যোগ্য দলের পুরস্কার। ভাগ্য তো আর অযোগ্যের পাশে দাঁড়াবে না। জাতীয় দল তো নিজেদের বারোটা নিজেরাই বাজিয়েছে। ২০০০ সাল থেকে টেস্ট ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাওয়ার পর থেকে সিরিজে ধবল ধোলাই হওয়ার তালিকা ক্রমেই বড় হচ্ছে। বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ খেলতে পারে না—এটি এক ধরনের মানসিক বাধা। টেস্ট ক্রিকেট রপ্ত করতে তাহলে আর কত বছর লাগবে! বাংলাদেশ যখন টেস্ট ম্যাচ খেলে, তখন খেলোয়াড়দের মধ্যে কতজন ম্যাচের মধ্যে থাকেন মানসিক এবং শারীরিকভাবে। টেস্ট ক্রিকেটে ভালো খেলতে হবে সেই কমিটমেন্ট মাঠে কোথায়?

খেলার সবচেয়ে পুরনো সংস্করণ হলো টেস্ট ক্রিকেট। ক্রিকেটের সামর্থ্য প্রমাণের শ্রেষ্ঠ মঞ্চ। একমাত্র সংস্করণ, যেখানে ক্রিকেটারদের সামর্থ্যের সত্যিকারের পরীক্ষা দিতে হয়। এর পরও ক্রিকেটবিশ্বের সব দেশের ক্রিকেটাররা সেরা ক্রিকেটার হতে চান। কিন্তু কেন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম লেখা হয়েছে, ‘ওয়ানডেতে আরো বেশি সুযোগ-সুবিধা পেলে বেশির ভাগ টেস্ট না খেলার দলে নাম লেখাবেন।’

ধবল ধোলাইয়ের পর তো সব অনুনয়-বিনয় অর্থহীন! দেশের ক্রিকেট তো লজ্জাজনকভাবে হেরেছে। কারোরই মেরুদণ্ড নেই। দেখা মেলেনি ক্রিকেটীয় দৃঢ় চরিত্র। কেউ সত্য ছিলেন বলে মনে হয় না। ধৈর্য আর সহিষ্ণুতা না থাকলে টেস্ট ক্রিকেট খেলার কী দরকার? মনঃসংযোগ তো দরকার মাঠের খেলায়, দলের সংকীর্ণতার মধ্যে নয়।

অধিনায়কের মন্তব্য পরাজয়ের সন্ধ্যায়, ‘একটু ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে খেললে হয়তো চিত্রটা অন্য রকম হতে পারত।’ দলকে মাঠ এবং ড্রেসিংরুমে লড়াইয়ের উষ্ণতায় উজ্জীবিত করার অন্যতম দায়িত্ব তো অধিনায়কের। দলটি তো হতে হবে এক সুতায় গাঁথা। চার দিন ইতিবাচক চিন্তা আর মনের জোর কোথায় ছিল? খেলোয়াড়দের কি বিশ্বাস ছিল নিজেদের সামর্থ্যের প্রতি? সব কিছু শেষ হওয়ার পর শূন্যহীন বিলাপ। একই কায়দায় পুরনো রেকর্ড বাজানো তো আর কত শুনতে ভালো লাগবে। সব ভুল শুধরে নেওয়া হবে। ভালো পরিকল্পনা নিয়ে দল আগামী দিনে খেলতে নামবে। সেই দিনগুলো কত দূরে।

কয়েক মাসের মধ্যে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ। তখন আবার কী দেখতে হবে? দুর্বল মনের কলম আটকে যাচ্ছে। কথায় আছে, ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। একটা সময় ছিল, বিভিন্নভাবে ধামাচাপা দেওয়ার খেলাটা ভালোভাবেই খেলা যেত। এখন তো আর সেই দিন নেই। স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে এসে মানুষ অনেক বেশি সচেতন। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব খুব ভালোভাবেই করছে। টেস্ট ক্রিকেটে এত বছরে কী প্রাপ্তি আছে। টক শোতে অনেক কথাই বলা হচ্ছে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ আর চিন্তা থেকে; কিন্তু মাঠের ক্রিকেট তো অন্য কথা বলছে। আর এই ক্রিকেটের চাহিদা তো অন্য রকম! ক্রিকেট চত্বরে ফাঁকি আর অযত্নতার খেসারত তো দিতেই হবে।

সাকিব আল হাসান দলে না থাকলে যদি জাতীয় দলকে মাঠে মানসিক দুর্বলতা নিয়ে লড়াই করতে হয়, তাহলে তো টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে অন্য চিন্তা করতে হবে। সাকিব বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। দলের জন্য অপরিহার্য অনুকরণীয় এবং একান্ত প্রয়োজনীয়। তাঁর ক্রিকেট সেন্স, তাঁর পারফরম্যান্স, তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কথা হলো, সাকিব ইনজুরিতে পড়তে পারেন, ব্যক্তিগত কারণে ছুটি নিতে পারেন, তাঁকে তো একটি সময় মাঠ থেকে সরে যেতেই হবে—তাঁর অনুপস্থিতিতে দল গঠন করতে সবচেয়ে বড় বাধা হবে। একজন ক্রিকেটারের ওপর এত বেশি নির্ভরশীলতা কেন? ক্রিকেট তো দলীয় খেলা। সবাই মিলেই তো একটি ইউনিট হিসেবে খেললে সাফল্যের স্বাদ মেলে। তা ছাড়া ক্রিকেটের চিন্তা তো কখনো একজনকে নিয়ে নয়। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্রিকেটের চিন্তা-ভাবনা কত বেশি দুর্বল এবং অকেজো। ক্রিকেট বোর্ড, টিম ম্যানেজমেন্ট, হেড কোচ এত বিশেষজ্ঞ—সবই মনে হচ্ছে অর্থহীন।

ক্রিকেটে আসলে কী হচ্ছে? সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনাহীন কার্যক্রম ছাড়াও তো ক্রিকেট সংগঠকরা সব সময়ই একে অপরকে দোষারোপ করছেন। একে অপরের পেছনে লেগে আছেন। অনেক সময়ই অনেক কিছু ঢাকার জন্য বিভিন্ন কথা বলা হয়, বিভিন্ন কথা রচনা করা হয়। সত্যি কিন্তু একসময় বেরিয়ে এসেছে।

ফিফটি হয়ে গেছে। আর কী চাই। এটি ব্যাটসম্যানের চিন্তা। বোলার ভাবেন, উইকেট নিশ্চিত করা হয়েছে, অতএব দলে স্থান তো নিশ্চিত। এদিকে দল দিশাহারা মাঠে। শেষ পরিণাম পরাজয়। ব্যাট-বলে সব ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স তো মূল্যহীন খেলা না জিততে পারলে। খেলা তো দেশের জন্য। উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এলে তো হারতেই হবে। একইভাবে বারবার আউট। খেলায় দায়িত্বশীলতার পরিচয় নেই। নেই সঠিক পরিকল্পনা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে হেরে যাওয়ার পর—সবার আরেক চেহারা। ভাবটা এমন, সব দোষ খেলোয়াড়দের। তাঁরা পারছেন না ঠিকমতো খেলতে। কথা হলো, তাহলে এত বিশেষজ্ঞ পুষে কী হবে? কথা উঠছে দল নির্বাচন নিয়ে। নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের ভূমিকা নিয়ে। কোচ ও অধিনায়ক তো আর সব কিছু করেননি। বোর্ডপ্রধান পরাজয়ের পর দারুণভাবে রি-অ্যাক্ট করেছেন। তাঁর ক্ষোভ এবং প্রতিক্রিয়ায় অনেক কথাই বের হয়ে এসেছে। তিনি বিরক্ত দল ও টিম ম্যানেজমেন্টের ওপর। তাঁর বক্তব্য হলো, এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। তাহলে তিনি কী করবেন? তিনি কি বিষয়টি অচিরেই ভুলে যাবেন?

টিম ম্যানেজমেন্টকে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, শুধরাতে হবে, পরিবর্তিত হতে হবে এবং তা গ্রহণ করতে হবে। দেশের ক্রিকেটে আমূল পরিবর্তন বড় দরকার। দরকার চিন্তা-ভাবনা এবং মানসিকতায়।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা