kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

বগুড়ার শেরপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিস

‘দুর্নীতিমুক্ত’ চত্বরে ঘুষই শেষকথা

লিমন বাসার, বগুড়া    

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:২১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘দুর্নীতিমুক্ত’ চত্বরে ঘুষই শেষকথা

‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত’। সবুজ জমিনে সাদা রঙের তুলিতে বাংলা হরফের বাক্যটি অফিস চত্বরের সাইনবোর্ডে ঝুলছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তব ছবি বড্ড ভয়ংকর। উঠতে-বসতে টাকা। মুখ থেকে কথা বের করতেও দেখাতে হয় টাকার চেহারা। টেবিলে টাকা ফেললে যেভাবে চাইবেন, সব কিছু হবে সেভাবেই! নামজারি, খতিয়ান, ডিসিআর, খাজনার রসিদ কিংবা ভূমি অফিসের রেকর্ডপত্র—সব কিছুই যেন ওদের ‘হাতের মোয়া’। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগসহ একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছায়ায় সেখানকার দলিল লেখক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট সদস্যদের কোনো রাগঢাক নেই। বছরের পর বছর এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ‘সৃষ্টিশীল’ অপকর্ম। ঘুষ লেনদেনের ব্যাপারটিকে শৈল্পিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া চত্বরটির নাম বগুড়ার শেরপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিস।

তবে গল্পের শেষ এখানে নয়, সমিতির নামে টাকা, অফিসের নামে টাকা, মসজিদের নামে টাকা, রসিদের নামে টাকা, বকশিশের নামে টাকা। সাবরেজিস্ট্রি অফিসটির চেয়ার-টেবিলও যেন টাকার জন্য ‘হাঁ’ করে আছে। কেউ জমি নিবন্ধন করতে এলে সরকার নির্ধারিত ফিয়ের বদলে দলিল লেখক সমিতির নির্ধারিত টাকার ছক ধরিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, এ টাকা না দিলে জমি নিবন্ধন হবেই না। এর ফলে সরকার নির্ধারিত ফিয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা নিরুপায় সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে নিত্যদিন। এমন চাঁদাবাজির কথা সবারই জানা। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য চলে সবার সামনেই। তবে ওই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করার সাহস নেই কারো।

ভুক্তভোগী ও দলিল লেখকরা জানান, সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লেখক সমিতির একটি সিন্ডিকেট দাঁড়িয়ে গেছে। সিন্ডিকেটের কুশীলবরা হলেন আওয়ামী লীগ নেতা আসিফ ইকবাল, বিএনপি নেতা জানে আলম খোকা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব আম্বিয়া, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মকবুল হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম হোসেন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম সানি, ছাত্রলীগের সাবেক উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনুর আত্মীয় নাসিম। অভিযোগ রয়েছে, এসব নেতার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ফেরদৌস খন্দকার ও সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সিন্ডিকেট তৈরি করে জমি রেজিস্ট্রি করতে আসা গ্রাহকদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি একটি দলিলের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর দলিল লেখকদের রকমারি চাতুরি ও অপকর্ম সামনে আসে। এরপর মুখ খুলতে শুরু করে কয়েকজন ভুক্তভোগী। শেরপুর শহরের ব্যবসায়ী আপেল মাহমুদ আশকারীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাবরেজিস্ট্রার সেখানে তৈরি করা দলিল জাল বলে বাতিল করেন। তবে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কারোর বিরুদ্ধে এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক বলেন, এক লাখ টাকা দামের জমি নিবন্ধন করতে সাফ-কবলার জন্য ছয় হাজার পাঁচ শ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। চালানের মাধ্যমে এই টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। এর সঙ্গে দলিল লেখকের সম্মানীসহ আরো এক হাজার পাঁচ শ টাকা হলেই চলে। তবে সেখানে গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এই টাকার মধ্যে সমিতির নামে নেওয়া হয় সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের জন্য নেওয়া হয় এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবে জমির দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘুষের টাকার অঙ্কও বাড়তে থাকে। দাবি করা টাকা না দিলে দলিল নিবন্ধন আর সম্ভব হয় না।

জমি নিবন্ধন করতে বিশালপুর এলাকা থেকে আসা হারান চন্দ্র, নাইশিমুল গ্রামের সিরাজউদ্দীন, মির্জাপুরের জহুরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, সাবরেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। কী হয় না এখানে। টাকা হলে সবই সম্ভব। নিয়মনীতির কোনো বালাই নেই। শুধু টাকার খেলা। অথচ সাবরেজিস্ট্রি অফিস দুর্নীতিমুক্ত, এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা পুরোটাই বিপরীত।

সরেজমিনে দেখা যায়, শেরপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক ও সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের বাইরেও অনেক মানুষের ব্যস্ততা। আবার অনেকেই জটলা করে এমনিতেই বসে আছে। অফিস প্রাঙ্গণে ঘুরতে থাকা বেশির ভাগ লোকই দালালচক্রের সদস্য। এরা কম টাকায় দলিল নিবন্ধন করে দেওয়ার কথা বলে পছন্দের দলিল লেখকদের কাছে মক্কেল ধরে এনে দেয়। বিনিময়ে পায় কমিশন। এখানেই শেষ নয়, সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভুয়া নামজারি, ডিসিআর, খতিয়ান, খাজনার রশিদ, আরএস রেকর্ডের জাল কাগজ তৈরি করে জমি নিবন্ধন করছে। এমনকি এসব জাল কাগপত্রের মাধ্যমে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেও সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।

এই চক্রের কাছে শেরপুরের সাবরেজিস্ট্রার নুর-এ আলমও অসহায়। সরকারি এই অফিসের সর্বময় ক্ষমতা তাঁর। কিন্তু তিনি চক্রের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সরাসরি কোনো জমি নিবন্ধন করেন না। সমিতির নির্ধারিত ফি ও কর্মকর্তার বিশেষ চিহ্ন থাকলেই সেই দলিল নিবন্ধন করেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব আম্বিয়া বলেন, ‘আমি কিংবা আমার দলের কোনো নেতা এই কাজের সহযোগিতা করেন না। আমরা কেউই সাবরেজিস্ট্রি অফিসে যাই না। এসব অভিযোগ মিথ্যা।’

তবে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জানে আলম খোকা বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে একটি সর্বসম্মত কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে কার্যক্রম কিভাবে চলবে সেটির একটি গাইডলাইনও করে দেওয়া হয়। তবে বেশির ভাগ সময়ই এসব গাইডলাইন মানা হয় না।’

দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ফেরদৌস খন্দকার অভিযোগের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য না করে পুরো বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

শেরপুর রেজিস্ট্রি অফিসের সাবরেজিস্ট্রার নুর-এ আলম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগ দিয়েছি। তাই অনেক কিছুই এখনো অজানা। তবে কোনো ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে জমি নিবন্ধন করা হবে না।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, শেরপুরে রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো সিন্ডিকেট নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা