kalerkantho

রবিবার। ২২ ফাল্গুন ১৪২৭। ৭ মার্চ ২০২১। ২২ রজব ১৪৪২

সুন্দরবন ইকোট্যুরিজমে বিবেচনার বিষয়গুলো

বিধান চন্দ্র দাস   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৫:১৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুন্দরবন ইকোট্যুরিজমে বিবেচনার বিষয়গুলো

আজকাল সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম-সংক্রান্ত খবরাখবর বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে বেশ লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকাশনায়ও সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম শব্দদ্বয় ব্যবহার করা হচ্ছে। সুন্দরবনে ইকোট্যুরিজম সুবিধাদি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প শিগগিরই চালু হবে বলে শোনা গেছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মাধ্যমে সুন্দরবন ছাড়াও দেশের অন্যান্য পর্যটন এলাকার সঙ্গেও ইকোট্যুরিজম শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

এসব কারণে ইকোট্যুরিজম শব্দটির সঙ্গে ইদানীং আমরা অনেকে পরিচিত। এই শব্দটির বাংলা করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব পর্যটন। সাধারণের বোঝার জন্য বাংলাটি ঠিকই আছে। তবে ইকোট্যুরিজম বলতে যা বোঝায়, তার সবটুকু পরিবেশবান্ধব পর্যটন বলতে পরিষ্কার হয় না।

ইকোট্যুরিজম বলতে আসলে কী বোঝায়? আমরা অনেকেই মনে করি, কোনো জায়গার প্রাণী, উদ্ভিদ তথা জায়গাটির ক্ষতি না করে আনন্দময় যে ভ্রমণ, সেটিই হচ্ছে ইকোট্যুরিজম। সত্যি কথা বলতে কি, ইকোট্যুরিজম বলতে একসময় এ রকমই বোঝানো হতো; কিন্তু বর্তমানে শব্দটির আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় অন্য বিষয়কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিগত শতকের আশির দশকে (কারো মতে সত্তরের দশকে) দুটি শব্দ—ইকোলজি (বাস্তুতত্ত্ব) ও ট্যুরিজম (পর্যটন) মিলে ইকোট্যুরিজম শব্দটির উৎপত্তি হয়। তখন থেকে পরবর্তী প্রায় দুই দশকে ইকোট্যুরিজম শব্দটির সংজ্ঞা বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ইকোট্যুরিজম সমিতি (দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইকোট্যুরিজম সোসাইটি–টিআইইএস) থেকে ২০১৫ সালে ইকোট্যুরিজমের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে : ‘প্রাকৃতিক স্থানে দায়বদ্ধ ভ্রমণ, সেই স্থানের সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুস্থায়ী কল্যাণ এবং এসংক্রান্ত ব্যাখ্যা ও শিক্ষা।’ এই শিক্ষা ভ্রমণকারী ও ভ্রমণ পরিচালনাকারী উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। অক্সফোর্ড অভিধানে ইকোট্যুরিজমের সংজ্ঞায় পরিবেশগতভাবে হুমকিগ্রস্ত স্থানটির সংরক্ষণে সহায়তা এবং কেমব্রিজ অভিধানে জায়গাটির ক্ষতি না করাসহ স্থানীয় জনগণকে সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে। আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) ইকোট্যুরিজম শব্দটির ব্যাখ্যায় টিআইইএসকৃত সংজ্ঞাটির সঙ্গে আরো কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এগুলো হচ্ছে : ভ্রমণস্থানের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ, পরিবেশগত ও সামাজিক অধ্যয়ন, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি, অভিঘাত হ্রাসকরণ, মূল্যায়ন ইত্যাদি। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি টিআইইএসকৃত সংজ্ঞাটি সমর্থন করে।

তা হলে দেখা যাচ্ছে—ইকোট্যুরিজম বিষয়টির পরিধি অনেক বিস্তৃত। কোনো একটি জায়গায় পর্যটকরা কেমনভাবে যাবেন, সময় কাটাবেন এবং ফিরে আসবেন—এর মধ্যেই বিষয়টি আবদ্ধ নয়। ইকোট্যুরিজমের ওপর বিগত দুই দশকে অসংখ্য প্রবন্ধ ও কিছু গ্রন্থ লেখা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও ইকোট্যুরিজম-সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই কোনো একটি ভ্রমণের জায়গায় ইকোট্যুরিজম বাস্তবায়ন করতে হলে অনেক কিছু বিবেচনায় নিতে হয়। সুন্দরবন ইকোট্যুরিজমে আন্তর্জাতিক ধারণার সঙ্গে স্থানীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি অনুপম রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে :

১. দায়বদ্ধ ভ্রমণ : বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর থেকে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি পুস্তিকায় (সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা) সুন্দরবনের পর্যটক, ট্যুর অপারেটর ও বন বিভাগের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। ইকোট্যুরিজম শব্দটি ব্যবহার না করলে এগুলো ঠিকই আছে। কিন্তু ইকোট্যুরিজমের কথা বললে, কান টানলে মাথা আসার মতো ইকোট্যুরিস্ট ও ইকোট্যুর অপারেটর বিষয় দুটি চলে আসে। ইকোট্যুরিস্ট (বাস্তুতাত্ত্বিক দায়বদ্ধ পর্যটক) ও সাধারণ ট্যুরিস্টের মধ্যে পার্থক্য আছে। সেই কারণে বাংলাদেশ সুন্দরবনের বাস্তবতায় ইকোট্যুরিস্ট, ইকোট্যুর অপারেটর ও বন বিভাগের দায়িত্ব সম্পর্কে নীতিমালা নতুন করে তৈরি করা প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, সুন্দরবনে পর্যটকের উপস্থিতিতে বন্য প্রাণী ও প্রকৃতির প্রত্যক্ষভাবে কোনো উপকার হয় না; বরং ক্ষতিই হয়। কাজেই ইকোট্যুরিস্ট ও ইকোট্যুর অপারেটর ধারণা—এই দুই পক্ষের মধ্যে দায়বদ্ধতা তৈরি করে এই ক্ষতিকে যত দূর সম্ভব হ্রাস করতে পারে। দৈনিক পর্যটক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণসহ সুন্দরবনের গভীরে পর্যটক প্রবেশ নিরুৎসাহ করা প্রয়োজন।

২. সংরক্ষণ : সুন্দরবন সংরক্ষণে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে সুন্দরবন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গে সুন্দরবনের পরিমাণ বাংলাদেশের থেকেও কম। তবু তাদের সুন্দরবন বিষয়ে একটি শক্তিশালী দপ্তর আছে। সুন্দরবনবিষয়ক পৃথক স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রীও আছেন। এই দপ্তরের অধীনে সুন্দরবন উন্নয়ন বোর্ড কাজ করে। সচিব বা যুগ্ম সচিবও আছেন এই দপ্তরে। আমাদের দেশে বর্তমান বাস্তবতায় সুন্দরবনবিষয়ক একটি অধিদপ্তর এবং তার অধীনে সুন্দরবন গবেষণা ইনস্টিটিউট করা প্রয়োজন। সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করতে হলে নানা রকম বিষয়ের বিশেষজ্ঞ (উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব, বন, মাটি, পানি, বাস্তুতন্ত্র/পরিবেশ, প্রকৌশল, সমাজ ও অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি) দিয়ে নিয়মিতভাবে জরিপ, পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এসব বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে সুন্দরবনবিষয়ক গবেষণা ইনস্টিটিউট এখন সময়ের দাবি। প্রকল্প করে এই কাজ করা সম্ভব হবে না। সুন্দরবনের বর্তমান দুটি বিভাগ (পূর্ব ও পশ্চিম) ভেঙে কমপক্ষে চারটি বিভাগ তৈরি করা এবং সেই অনুযায়ী রেঞ্জ সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সুন্দরবন সংরক্ষণে কো-ব্যবস্থাপনা বিবেচনা করা যেতে পারে।

৩. স্থানীয় জনগোষ্ঠী জড়িতকরণ : ইকোট্যুরিজমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জড়িত করার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। সুন্দরবনের সম্পদকেন্দ্রিক প্রত্যক্ষ প্রভাববলয় এই বনের সীমান্তরেখা থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বলয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ বনের মাছ, কাঠ, পাতা, মধু ইত্যাদি আহরণের ওপর নির্ভরশীল। ইকোট্যুরিজম বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের বনজ সম্পদ আহরণনির্ভরতা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে তার জন্য গবেষণা প্রয়োজন। ইকোট্যুর পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট কাজে সহায়তা, ইকোহোস্টিং বা ইকোলজিং, দোভাষী, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুভ্যেনির শপ, কারুশিল্প, লোকসংস্কৃতি পরিবেশন, কমিউনিটিভিত্তিক দৃষ্টিনন্দন প্রাণী প্রজনন বা পালন কেন্দ্র (হরিণ, কুমির, কচ্ছপ, সাপ, পাখি, প্রজাপতি, জোনাকি প্রভৃতি) পরিচালনা, গোলমধু তৈরি প্রদর্শন, সুন্দরবন মিউজিয়াম পরিচালনা ইত্যাদি বিষয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জড়িত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান আশা করা যায়। অনেকে এখন কমিউনিটিভিত্তিক ইকোট্যুরিজমকে উৎসাহিত করছেন। সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসরত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে মুন্ডা, ওঁরাও, মাহাতো ও বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষকে ইকোট্যুরিজমে জড়িত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৪. শিক্ষা : ইকোট্যুরিজমে ট্যুরিস্ট ও ট্যুর পরিচালনা সংশ্লিষ্ট সবার শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, বিশেষ করে বন্য প্রাণীর গুরুত্ব, দূষণ ও নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ ইকোট্যুরিজমের অপরিহার্য অংশ বলে বর্তমানে বিবেচনা করা হয়।

ম্যানগ্রোভ অরণ্য অন্য যেকোনো অরণ্য থেকে বড় বেশি স্পর্শকাতর। এখানকার বাস্তুতন্ত্রের উপাদানগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক। সেই কারণে সুন্দরবন ইকোট্যুরিজমে বন্য প্রাণীর সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর অনেক জায়গায় ইকোট্যুরিজম সফলতার মুখ দেখেনি এবং অনেক বিশেষজ্ঞ ইকোট্যুরিজমকেও ট্যুরিজমের মতো প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন। তার অন্যতম কারণ, ইকোট্যুরিজমের বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়া। কাজেই সুন্দরবনে ইকোট্যুরিজমের নামে ট্যুরিজম হচ্ছে কি না সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা