kalerkantho

রবিবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৫ রজব ১৪৪২

সু চির জন্য মায়াকান্নার প্রয়োজন নেই

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

অনলাইন ডেস্ক   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৪:০১ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সু চির জন্য মায়াকান্নার প্রয়োজন নেই

শান্তি প্রতিষ্ঠায় কিছু করার আগেই অং সান সু চি ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন। বিশ্বধন্য নমস্য প্রতিষ্ঠান নোবেল কমিটি আরো কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এ রকম বিশাল উদারতার পরিচয় দিয়েছে। আগাম আশায় কেন শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয় তা এক বিরাট রহস্য। তবে শেকসপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু মনীষীর কথামতো মানুষের মধ্যে থাকা অপার মেধা ক্ষমতায় সে রহস্য যে ধরা পড়ে না, তা নয়। কিন্তু সে কথা আমরা সব সময় বলতে চাই না। কারণ বাংলাদেশবাসী, আমরাও একই রকম শান্তিতে নোবেল প্রাপ্ত হয়ে ধন্য এবং আনন্দিত ও আমোদিত হয়েছি। তবে সু চিকে পশ্চিমা বিশ্বের আগাম বুকিং দিয়ে রাখার বিপরীতে চীন কী ভূমিকা নেবে সেটাই তখন দেখার বিষয় ছিল। সেটা এখন স্পষ্ট দেখতে পারছি। পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়া কী করতে না পারে। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন পশ্চিমা মিডিয়ার গুণে ভিলেন হয়ে গেলেন। আর সু চি রাতারাতি বিশ্বের আইকনে পরিণত হলেন। তবে পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং তখন ত্যাগের মন্ত্রে সংকল্পবদ্ধ সু চিকে দেখে অনেকের মতো আমিও আশাবাদী হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, প্রতিবেশী বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সত্তর-একাত্তরে প্রদর্শিত রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও কৌশল থেকে সু চি শিক্ষা নেবেন এবং জন-ম্যান্ডেটের শক্তিতে আপসহীন থেকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতিত-বঞ্চিত মিয়ানমারের সাধারণ মানুষকে সত্যিকারার্থে সামরিক শাসকদের কবল থেকে মুক্ত করবেন। তাই ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চি যখন বিপুল বিজয় পেলেন তখন সহযোগী একটি দৈনিকের উপসম্পাদকীয়তে বিরাট প্রবন্ধ লিখে সু চির পিতা-মাতা ও তাঁর নিজের আগের কথা সংবেদনশীল ভাষায় উল্লেখপূর্বক অভিনন্দন জানিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিলাম। সেই প্রবন্ধে প্রবলভাবে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলাম, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তিনি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ নেবেন। তখনো প্রায় চার লাখ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছিল। তখনই পর পর কয়েকটি কলামে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বলেছিলাম, এই সমস্যার সমাধান না হলে এটা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের জন্য নিরাপত্তার বিষফোড়া হয়ে থাকবে। যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তখন এটিও লিখেছিলাম, বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মিয়ানমারের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয় থাকলে সেটিও সমাধানের এখন উত্তম সময়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে বিশ্ব অঙ্গনে প্রমাণ করেছেন, প্রতিবেশীসহ বিদেশি কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। সু চি ও তাঁর সরকার সামরিক জান্তার পুতুল হয়ে গেলেন। আফসোস হলো এই ভেবে, আমি না হয় অজ্ঞ; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দহনে জীবন পুণ্য হয়’, সেটি সু চির বেলায় তাহলে হয়নি।

শান্তিতে নোবেল পাওয়া নেত্রী ধর্ষণ, গণহত্যা, জাতিগত নিধনসহ জ্বালাও-পোড়াওয়ের পক্ষে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, নিজে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে উপস্থিত হয়ে সব অপরাধ ঢাকা দিতে ওকালতি করলেন, বললেন এসবের কিছুই হয়নি। গত সাড়ে তিন বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সু চির সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে অনেক আলোচনা করেছে এবং প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে, যার কোনো কিছুই কার্যকর হয়নি। পুতুল মাস্টার তা চায়নি। কারণ রাজনৈতিক কৌশলের খেলায় সু চির সরকারকে অপদস্থ করা এবং অক্ষম ও অপদার্থ প্রমাণ করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। গণতান্ত্রিক দেশেও এমন রাজনৈতিক খেলা হয়। ভারতের কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি সংসদে উপস্থাপন করলে তখনকার বিরোধী দল বিজেপি প্রবলভাবে বিরুদ্ধাচরণ শুধু নয়, প্রস্তাবিত বিলের কাগজ ছিঁড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় বিজেপি সরকার সর্বসম্মতভাবে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষর করে। মিয়ানমারের সেনাশাসকরা নতুন করে সর্বময় কর্তৃত্ব হাতে নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ইতিবাচক ভূমিকা নেবে কি না তা নিয়ে অনেক সংশয় আছে। তবে গত পাঁচ বছর সু চির সরকারকে ব্যর্থ করার কাজে লিপ্ত থাকায় অভিভাবক চীনের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য চেষ্টায় ফল আসেনি, সেটা বোঝা যায়।

১৯৬২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসা সব সেনা কমান্ডার যা করেছেন, যা পেয়েছেন সে সব উল্টে নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতো ঘটনা ঘটার ঝুঁকি সেনাবাহিনী নিতে পারবে না, নেবে না। এটা যুক্তির কথা, বাস্তবতা। সুতরাং সু চির রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে নিজেদের তৈরি সংবিধানে সব হাত-পা বেঁধে ২০১৫ সালে নামে মাত্র সু চিকে ক্ষমতায় বসার সুযোগ দেয়। হতে পারে আইনগতভাবে সব দায় সু চি সরকারের ওপর পড়বে বিধায় সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা নিধন চালায়। এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য সু চির রাজনীতি নিঃশেষ করার জন্য আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে সু চিকে ওকালতি করতে বাধ্য করে। যার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হিরো থেকে সু চি ভিলেনে পরিণত হন। রবীন্দ্রনাথের ‘পণরক্ষা’ কবিতা পড়া থাকলে হয়তো সু চি এই ভুল করতেন না। দুর্গেশ দুমরাজের মতো প্রভুর কর্মে বীরের ধর্মে বিরোধ মেটাতে দুর্গদুয়ারে জীবন বিসর্জন দিতেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সু চিকে আর বাড়তে দেওয়া হবে না, সেটা ২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল দেখেই বোঝা গেছে। নির্বাচনে সেনাসমর্থিত দলের শোচনীয় ব্যর্থতায় ২০০৮ সালের সংবিধান ও বর্তমান সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতার বিরুদ্ধে হুমকিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, সু চির দলের ব্যাংক অ্যান্ড ফাইলের মধ্যে গত কয়েক বছরে চীনবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং অজুহাত তোলার একটা সুযোগ যখন আছে, সেটিকে সেনাবাহিনী হাতছাড়া করতে চায়নি। কারচুপি হয়েছে, এই অভিযোগে নির্বাচনের ফল বাতিল করে আপাতত এক বছরের জন্য জরুরি আইন জারি করা হয়েছে। সব ক্ষমতা এখন সেনাবাহিনীর হাতে। ইয়াঙ্গুনসহ কিছু বড় শহরে সু চির পক্ষে মানুষের বিক্ষোভ চলছে। আগের মতোই কিছুদিনের মধ্যে এসব মিলিয়ে যাবে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ব কড়া কড়া কথা বলছে, যা তারা আগেও অনেক বলেছে। এসব বিক্ষোভ ও কথায় সেনা কর্তৃপক্ষকে কর্ণপাত করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের সামনে আপাতত নেই। নতুন কিছু বিধি-নিষেধ এলেও সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞায় পশ্চিমা বিশ্ব যাবে না। চীনের পরে মিয়ানমারের অন্য অবলম্বন আসিয়ান জোটভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কঠিন কথা এ পর্যন্ত কেউ বলেনি। আমেরিকার সঙ্গে কোনো রকম সামরিক সংঘাত হলে মিয়ানমার হবে চীনের লাইফ লাইন, অর্থাৎ বেঁচে থাকার অবলম্বন। চীন বলছে, সামরিক অভ্যুত্থান নয়, মিয়ানমারের মন্ত্রিসভায় রদবদল হয়েছে। আমেরিকার নতুন প্রশাসনের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরো অবনতি হওয়ার আলামত দেখা যাচ্ছে। জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর ইস্যু, তাইওয়ান, হংকং এবং দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বন্দ্ব নিয়ে জো বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের মন্তব্যে চীন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এত কিছু জটিল সমীকরণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কী হতে চলেছে, সেটাই আমাদের জন্য মুখ্য বিষয়। এটা বোঝার জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দায়িত্বগ্রহণকারী নতুন মন্ত্রীদের আরো কিছু সময় দিতে হবে। তাঁরা সব দিক পর্যালোচনা করে তারপর পদক্ষেপ নেবেন। একতরফাভাবে কিছুই হবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে গত কয়েক মাসে চীনের পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক ছিল। সু চির সরকারের চেয়ে মিয়ানমার সেনা কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানে বেশি আগ্রহী, এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি তারা চীনের মধ্যস্থতায় দেখানোর চেষ্টা করতে পারে। রাজনীতিতে এমন হয়, যার উদাহরণ লেখার মাঝখানে দিয়েছি। তবে সেটা কতখানি সফল হবে তা বহু ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভরশীল, যার সব কিছু এখন এককভাবে চীন বা মিয়ানমারের হাতেও নেই। বিশ্বের বড় পক্ষগুলো এখানে খেলতে চাইবে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখা কঠিন হলেও বাস্তবতা তার চেয়ে আরো বেশি কঠিন। সু চির সরকার পাঁচ বছরে কিছুই করতে পারেনি, বরং সব কিছু আরো পেছনের দিকে গেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চাইলে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গেই বসতে হবে, অন্য কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং সে পথ সুগম করার স্বার্থে অযথা সু চির জন্য অন্তত আমাদের মায়াকান্না করার কোনো প্রয়োজন নেই।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা