kalerkantho

রবিবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৫ রজব ১৪৪২

দ্বিতীয় ডোজের সময় পেছাচ্ছে!

তৌফিক মারুফ    

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:২২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দ্বিতীয় ডোজের সময় পেছাচ্ছে!

দেশে প্রয়োগ শুরু করা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনা টিকার দুই ডোজ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিরতির সময়সীমা নিয়ে আবারও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। দুই ডোজের মধ্যে বিরতির সময় বেশি হলে টিকার কার্যকারিতা বাড়ে এবং এতে বেশি সুরক্ষা পাওয়া যায়—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা এমন বক্তব্য দেওয়ার পর এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কারণ দেশে গণটিকা দেওয়া শুরুর আগে সরকারের পক্ষ থেকে টিকার দুই ডোজের মধ্যে চার সপ্তাহ বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর আগে দুই দফা পরিবর্তন করা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি দেশে টিকা দেওয়ার দুই ডোজের মধ্যবর্তী সময়সীমায় আরেক দফা পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন সিদ্ধান্তের পরে সরকার এখন চার সপ্তাহের পরিবর্তে আবার আট সপ্তাহ করার কথা ভাবছে বলে জানা গেছে।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কোভিশিল্ড এনেছে। প্রথম দফায় ভারতের উপহারসহ ৭০ লাখ ডোজ টিকা এসেছে। সরকার সেরাম থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার চুক্তি করেছে। 

টিকা আমদানির বিষয়টি যখন নিশ্চিত হয়েছিল, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছিল, প্রথম ডোজের চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, দুই ডোজের মধ্যে বিরতি চার থেকে ১২ সপ্তাহ হতে পারে। তবে সময়ের পার্থক্য বেশি হলে সুফল বেশি পাওয়া যায়। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুই ডোজের মধ্যে বিরতির সময় আট সপ্তাহ করে, কিন্তু দেশজুড়ে গণটিকা শুরুর  ঠিক  আগের  দিন  হঠাৎ  করেই আবার তা চার সপ্তাহে নামিয়ে আনা হয়। এরই মধ্যে যারা টিকা নিয়েছে তাদের সবাইকেই দ্বিতীয় ডোজ নিতে এক মাস পরে তারিখ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ জানে, তারা দ্বিতীয় ডোজ পাবে এক মাস পরে। এর মধ্যেই শুক্রবার রাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে জানান দেওয়া হয়, আট থেকে ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দিলে অধিকতর ফল পাওয়া যায়।

যদিও দুই ডোজের মধ্যে বিরতির সময় নিয়ে শুরু থেকেই একেক দেশ একেক পথে হাঁটছিল। কোথাও চার সপ্তাহ, কোথাও ছয় সপ্তাহ, কোথাও আট সপ্তাহ, আবার কোথাও ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাজ্যেই সরকার ও ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে দ্বিমত থাকায় দ্বিতীয় ডোজের সময় নির্ধারণ ছাড়াই প্রথম ডোজ দিয়ে দেওয়া হয় লাখ লাখ মানুষকে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রথম ডোজ দেওয়ার ছয় সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে এখনো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাসংক্রান্ত কারিগরি কমিটির একজন পরামর্শক ও বাংলাদেশের জাতীয় টিকাবিষয়ক কারিগরি দলের (নাইটেগ) একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা শুরু থেকেই ১২ সপ্তাহ বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন সরকারকে। সরকার তাঁদের পরামর্শকে কিছুটা গুরুত্ব দিয়ে আট সপ্তাহ করল, কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই কেন কাদের পরামর্শে চার সপ্তাহ করে ফেলল, সেটা তাঁদের বোধগম্য নয়। তাঁরা এরই মধ্যে নিজেরা আলাপ-আলোচনা করেছেন যে সরকারকে বলবেন আট থেকে-১২ সপ্তাহ বিরতি দেওয়ার জন্য।

করোনা মোকাবেলায় সরকার গঠিত জাতীয় কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটির আরেক সদস্য বলেন, টিকার মেয়াদের দিকে নজর রেখে হয়তো সরকার এটা করেছিল, কিন্তু এখন যেভাবে মানুষের মধ্যে সাড়া পড়েছে তাতে হাতে থাকা টিকা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োগ করা হয়ে যাবে। নতুন টিকাও চলে আসবে। ফলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাই যায়।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে মনে রাখতে হবে, কারিগরি বিষয়ে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তা না হলে বিপাকে পড়তে হয়। তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরও তো ভালো ভালো বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তাঁরা পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু তাঁরা কেন বিষয়গুলো দেখেন না, সেটা বোধগম্য নয়। চাকরির ভয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা না করলে কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনে নীতিনির্ধারকদের সহায়তা না করলে তো সরকারকেই বিপদে পড়তে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়গুলোই পরিবর্তনশীল। আমরা বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েই প্রয়োজন অনুসারে পরিকল্পনা অদল-বদল করে থাকি। সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়। ফলে এ ক্ষেত্রে আমরা বিশেষজ্ঞদের আবারও পরামর্শ নিয়েই দ্রুত সময়ের মধ্যেই হয়তো আট বা ১২ সপ্তাহ—যেটাই হোক করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব।’ তিনি আরো বলেন, ‘সারা দেশে টিকা নিতে আগ্রহী মানুষের নিবন্ধন প্রথম দিকে খুব কম দেখে আমরা দুই ডোজের মধ্যে বিরতির সময় আট সপ্তাহ থেকে কমিয়ে চার সপ্তাহে নিয়ে আসি। কারণ কিছু টিকার মেয়াদ ১৪ এপ্রিল শেষ হয়ে যাবে। আর বেশির ভাগেরই মেয়াদ জুন পর্যন্ত রয়েছে। এপ্রিল নিয়ে আমাদের একটু সংশয় তৈরি হয়েছিল, কিন্তু এখন প্রতিদিন যেভাবে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে তাতে আশা করি এপ্রিলের আগেই হাতে থাকা টিকা শেষ হবে। এ ছাড়া চলতি মাসেই কেনা টিকার আরো ৫০ লাখ ও কোভ্যাক্সের প্রায় এক কোটি ২৭  লাখ টিকা আসবে। ফলে দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে আর সমস্যা হবে না। তাই আমরা চার সপ্তাহের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতেই পারি যদি বিশেষজ্ঞরা মত দেন।’

অনুজীববিজ্ঞানী ড. সমীর কুমার সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, দেরিতে দিলে বেশি কার্যকর বলেই সর্বশেষ গবেষণায় বলা হয়েছে। সেই সময়টা আট থেকে ১২ সপ্তাহ হলে ভালো। তিনি আরো বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশ যার যার মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কারণ প্রথম ডোজ দেওয়ার পরে দ্বিতীয় ডোজের টিকার সংকুলান আছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। দেরিতে দিলে যেমন বেশি মানুষকে দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়, তেমনি কার্যকারিতাও ভালো পাওয়া যায়। তবে মেয়াদও কিছু ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, ‘আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দিলে ফল ভালো আসে বলা হচ্ছে, তাই আমাদের সেদিকেই থাকা দরকার। এতে লাভ বেশি হবে। এ ছাড়া আমরা তো জানতেই পেরেছি সময়মতো আরো টিকা আসছে।’

বাংলাদেশ ফার্মাকোলজি সোসাইটির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, একেক দেশ একেক রকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিদ্ধান্ত যে সবাই মানছে, তেমনটাও কিন্তু নয়। আগে প্রথম ডোজ নিশ্চিত যত দ্রুত করা যাবে, ততই ভালো। তিনি বলেন, ‘বিষয়গুলো সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিজ্ঞানীদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। বরং আমাদের জায়গা থেকে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিত টিকার সংকুলানের দিকে। আমাদের মতে রাখতে হবে, এখন পর্যন্ত চার-পাঁচ কোটি টিকার জোগান পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। বাকি জনগোষ্ঠীর কী হবে, সেটার হদিস কিন্তু এখনো নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা