kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

নীল হতে পারে দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল

ড. মো. সহিদুজ্জামান   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:৫০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নীল হতে পারে দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল

‘নীল চাষ’ শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো ইংরেজ সাহেবের হাতে চাবুক, অসহায় কৃষকের চোখে জল, নিরুপায়ের আহাজারি ও ক্ষুধার হিংস্র থাবা। এখনো বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সময়ের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক নীলকুঠি। নীল বিদ্রোহের পর নীল চাষ বন্ধ হলেও বাংলাদেশে, বিশেষ করে রংপুরে নীলগাছ বিলুপ্ত হয়নি। চাষিদের বিদ্রোহের মুখে নীলকর সাহেবরা লেজ গুটিয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে ইতিহাসের ঘৃণিত অংশ হয়ে গেছে খোদ ব্রিটিশ শাসকরাই। ধুলার নিচে চাপা পড়ে গেছে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার। আবার বাংলাদেশের জমিতে নীলগাছ লক লক করে উঠে জানান দিচ্ছে নীল আছে আজও।

নীল সবার কাছে একটি পরিচিত রং। কমবেশি সবাই এই রং পছন্দও করে। কৃত্রিম নীল রং থাকলেও আমি যে নীল রঙের কথা বলছি তা প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত হয়। নীল হচ্ছে শিম পরিবারভুক্ত গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। স্থানীয়ভাবে মালগাছ, নিলিনী, রঞ্জনী, কালোকেশী, নীলপুষ্প ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। ইংরেজিতে নীলকে  Indigo এবং রোমান ভাষায়  Indicum বলা হয়। বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে,  Indigofera Tinctoria. বাংলার ভূখণ্ডে ইন্ডিগোফেরার ১৫ প্রজাতির গাছ জন্মাত।

সরেজমিনে গিয়ে রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় নীল চাষে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। নীল নিয়ে অনেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। ডা. নিখিল রায় (হরকলি, ঠাকুরপাড়া, পাগলাপীর, সৈয়দপুর, রংপুর) প্রায় ১৭ বছর ধরে বংশপরম্পরায় নীল চাষ ও উৎপাদন করে আসছেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন পরিদর্শনরত গবেষক ও এনজিওকর্মীদের।

এরই মধ্যে রংপুর ও দিনাজপুরে দু-তিনটি উপজেলার প্রায় ১০টি ইউনিয়নে সীমিত পরিসরে নীলের চাষ শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। গড়ে উঠেছে ছোটখাটো কারখানাও। সেই নীল দিয়ে রাঙিয়ে ব্যাগ, ফতুয়া, চাদর, নকশিকাঁথা ও বাহারি পণ্য তৈরি হচ্ছে। দেশ-বিদেশে এসব পণ্যের প্রচুর চাহিদাও রয়েছে। নীল চাষিদের আগ্রহ দেখে মনে হচ্ছে যে হারিয়ে যাওয়া নীল নতুনরূপে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

নীলগাছ দেখতে অনেকটা ঝোপ বা ধনচেগাছের মতো। এক থেকে দুই মিটার লম্বা হয়। জীবনকাল ছয় মাস। মার্চ-এপ্রিল মাসে বীজ বপন করলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে গাছ মারা যায়। গাছের পাতা সবুজ; কিন্তু যে ফুল হয় তা প্রথমে গোলাপি ও পরে বেগুনি রঙের হয়। তবে কিছু কিছু জাতের ফুল সাদা ও হলুদ রঙেরও হয়। ফল ও বীজ সরিষার মতো। মাষকলাইয়ের মতো এক চাষ দিয়েই বীজ বপন করা যায়। বীজ বপনের তিন মাস পর গাছের পাতা কাটা যায়। ছয় মাসের মধ্যে তিন-চারবার পাতা কাটা যায়। পাটগাছের মতো নীলগাছের নরম শাখাকে পানিতে জাগ দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নীল রং তৈরি করা হয়।

নীল কিন্তু শুধু রং হিসেবেই নয়, নানাক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। সুতি বা উলেন সিল্ক কাপড়ের রং উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে এর জুড়ি নেই। পাটগাছের মতো নীলগাছ উত্কৃষ্ট জ্বালানি ও জৈবসার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নীল থেকে তেলও হয়। জামা-কাপড় ব্যাকটেরিয়ামুক্ত রাখা এবং শরীর অ্যালার্জিমুক্ত রাখার ক্ষেত্রেও নীলের ভূমিকা আছে। নীল ব্যবহারে গায়ের চামড়াও ভালো থাকে। কলপ, নীলের খৈল থেকে লোশন, সেভিং ফোম ইত্যাদিও তৈরি হয়। ভেষজ গুণ থাকায় চিকিৎসাক্ষেত্রেও নানা অসুখে নীলগাছ ব্যবহার হয়।

নীল চাষে আর্থিক লাভ

স্থানীয়ভাবে নীল চাষকে মাল চাষ বলা হয়। পাতা থেকে নীল প্রস্তুত করা হয়। পাতা যত স্বাস্থ্যবান হয় তত বেশি নীল পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমিতে তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ কেজি (তিনবার হার্ভেস্টিংয়ে প্রাপ্ত মোট পরিমাণ) পাতা পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এ ছাড়া জ্বালানি বিক্রয় করে প্রায় তিন হাজার টাকা এবং বীজ বিক্রয় করে প্রায় ৩০০ টাকা আয় করা যায়। অর্থাৎ একজন চাষি এক বিঘা জমি থেকে বিনা খরচে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।

এক কেজি নীল প্রস্তুতের জন্য ২০০ থেকে ২৫০ কেজি পাতা লাগে। জনাব নিখিল রায় প্রতি কেজি নীল বিক্রি করেন চার হাজার টাকা দরে। উত্তম মানের নীল প্রস্তুত করা গেলে তার বাজারমূল্য প্রতি কেজি প্রায় ২০ হাজার টাকা, সে ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি দুই লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। প্রতি বিঘা জমিতে তার খরচ হয় মোট দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকা, ১৪ থেকে ১৫ কেজি নীল উৎপাদনের জন্য তার আয় ৫৬ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। 

নীল চাষে সেচ লাগে না। শুধু এক থেকে দুবার চাষ প্রয়োজন হয় এবং সারও তেমন লাগে না। বিঘাপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় কেজি ইউরিয়া প্রয়োজন হয়। পতিত জমিতেও নীল চাষ করা যায়।

নীল নিয়ে গবেষণা

যুক্তরাজ্যের গ্লোবাল চেঞ্জ রিসার্চ ফান্ড (জিসিআরএফ) পরিচালিত প্রকল্পে নীল চাষে আর্থিক লাভ এবং মৃত্তিকা ও পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও রংপুরের শাইরা সমাজকল্যাণ সংস্থার সহযোগিতায় তিনি রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছেন। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নীল উৎপাদন ও গুণাগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে প্রাথমিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয়।

প্রাথমিক গবেষণায় দেখা যায়, নীল চাষের কারণে মাটির ভৌত ও জৈব রাসায়নিক গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে নীল চাষ করার পর ওই জমিতে আমন ধান চাষে সার কম লাগে। নীল চাষ করার পর ওই জমিতে তামাক চাষ করলে বা অন্য সবজি চাষ করলে ফসলে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হয় এবং সবজিজাতীয় ফসলের আইলে নীল চাষ করলে অন্যান্য পোকা-মাকড়ের প্রাদুর্ভাব কম হয়।

নীল একটি লিগিউমিনাস বা গুল্মজাতের ফসল হওয়ায় বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন ফিক্স করে জমিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। নীলগাছের পাতা ঝরে পড়ে জমির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করে। ফলে নীল চাষের জন্য রাসায়নিক সার লাগে না বললেই চলে। কখনো কখনো শুধু সামান্য মাত্রায় ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। নীল ঢালু জমিতে বা পতিত জমিতে চাষ করলে তা মাটির ক্ষয়রোধ করতে সক্ষম হয়। নীল সবুজ সার হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।

আধুনিক উৎপাদন কৌশল ব্যবহার করে নীলের উৎপাদন ও পাতায় নীলের মৌলিক উপাদান ও গুণাগুণ কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় তা নিয়ে গবেষণা চলছে। কারণ মানসম্পন্ন নীল উৎপাদন করতে পারলে প্রতি কেজি নীল আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে (২৫০ ইউএস ডলার) বিক্রি করা সম্ভব।

প্রাকৃতিক রং সাধারণত অস্থায়ী ও পচনশীল হয়। কিন্তু বাংলাদেশে চাষকৃত নীলে এমন কী প্রাকৃতিক উপাদন আছে, যা ব্রিটিশদের আকৃষ্ট করেছিল, সেটিও গবেষকরা খুঁজে দেখছেন। এ ছাড়া শুধু রংপুর ও দিনাজপুরেই নয়, দেশের অন্যান্য জায়গায় গুণগত মানসম্পন্ন নীল উৎপাদন করা যায় কি না সেটি নিয়েও গবেষণা চলছে। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে উৎপাদিত নীলের চেয়ে বাংলাদেশে, বিশেষ করে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরের নীল গুণে ও মানে তুলনামূলকভাবে ভালো।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় নীলকে সরকারি কৃষিপণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারলে এবং কৃষিজমির নীল ও নীল থেকে উৎপাদিত পণ্য সরকারি অনুমোদন পেলে এটি একটি জনপ্রিয় কৃষিজাত ফসল হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে এবং মাটির ভৌত ও জৈব রাসায়নিক গুণাগুণ বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষিজমির টেকসই উৎপাদনশীতা বৃদ্ধি সম্ভব।

কৃত্রিম নীলের বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদনের অভাবে জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব এই প্রাকৃতিক নীল হতে পারে দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল।

লেখক : গবেষক ও অধ্যাপক

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা