kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

অগ্রাধিকারে নজর নেই, টিকাকেন্দ্রে সবার ভিড়

তৌফিক মারুফ, ফাতিমা তুজ জোহরা ও সজিব ঘোষ    

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:০৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অগ্রাধিকারে নজর নেই, টিকাকেন্দ্রে সবার ভিড়

দেশে টিকা আসার আগে থেকেই সরকারের তরফ থেকে বলা হয় অগ্রাধিকারের কথা। অন্যান্য দেশেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই টিকা দিচ্ছে এখন পর্যন্ত। সব ক্ষেত্রেই করোনা মোকাবেলায় সম্মুখসারির কর্মী ও জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমে রাখা হয়েছে। দেশেও সেটাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দিতেই সরকার প্রথমে ৫৫ ঊর্ধ্বদের সুযোগ রেখেছিল এবং কেন্দ্রে গিয়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেছিল।

কিন্তু গত পাঁচ দিনে দেশে টিকা নেওয়ার আগ্রহ ও টিকা গ্রহণের গতি যতই বাড়ছে, ততই যেন ছিটকে পড়ছেন জ্যেষ্ঠ নাগরিক বা অপেক্ষাকৃত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর লোকজন। বিশেষ করে ৫৫ বছর থেকে বয়সসীমা ৪০ বছরে নামানোর পর টিকাকেন্দ্রগুলোতে যে ভিড় তৈরি হয়েছে, সেখানে ৪০-৫৫ বছরের মানুষেরই বেশি ভিড় দেখা মিলছে।

টিকাকেন্দ্রে নিবন্ধনের সুযোগ নিয়ে অপেক্ষাকৃত মধ্যবয়সী ও সম্মুখ সারির কর্মীদের তালিকায় পড়েন না, এমন ব্যক্তিরা বেশি সুযোগ নিচ্ছেন। বয়স্ক অনেকে কেন্দ্রে এলেও ভিড় ঠেলে নিবন্ধন বুথে অগ্রাধিকারের সুযোগ নিতেও পারছেন না।

টিকাকেন্দ্রে নিবন্ধনের কারণে কেন্দ্রে ভিড় হচ্ছে—এমন অজুহাতে গতকাল বৃহস্পতিবার সরকার ওই ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও পরে প্রয়োজনে তা আবার চালু করা যাবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

এদিকে আজ শুক্রবার টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন শিক্ষক কালের কণ্ঠকে বলেন, বাসায় ইন্টারনেট লাইনে সমস্যা, মোবাইলও খুব ভালো না। তাই নিজে কিছুটা চেষ্টা করেও অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারেননি। তাই স্ত্রীকে নিয়ে বাসার কাছেই মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু দেখতে পান, অল্প বয়সের লোকজন কর্মীদের ঘিরে আছে। দু-একবার স্বেচ্ছাসেবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও লাভ হয়নি। শরীরও খারাপ লাগছিল বলে বসে থাকতে না পেরে ফিরে আসেন। এমন পরিস্থিতি তাঁকে কষ্ট দিয়েছে বলে জানান তিনি।

শেরেবাংলানগরের একটি হাসপাতালের পরিচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, বয়স ৪০ করার পর থেকে ভিড় এতটাই বেড়ে গেছে যে তাঁর হাসপাতালের সম্মুখসারির কর্মীদেরও তিনি সুযোগ দিতে পারছেন না। অন্যদের আগে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বয়স্কদের প্রতি যদি অন্যরা আরেকটু সহানুভূতিশীল হন, তবে তাঁদের কাজ করতে সুবিধা হয়।

অন্য কেন্দ্রগুলোতেও প্রবীণদের তুলনায় মধ্যবয়সীদের ভিড়ই বেশি দেখা গেছে। যেসব প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা এসেছেন, তাঁরা নির্বিঘ্নে টিকা দিতে পেরেছেন। তবে সেখানেও প্রবীণদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা খুব একটা চোখে পড়েনি; যেমনটা কোথাও  কোথাও ভিআইপিদের জন্য রাখা হয়েছে।

গত কয়েক দিনে দেশে নিবন্ধন ১০ লাখ ছাড়ালেও এর মধ্যে ঠিক কত শতাংশ প্রবীণ মানুষ রয়েছেন কিংবা এ পর্যন্ত যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ টিকা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে ঠিক কত শতাংশ প্রবীণ এর কোনো সঠিক হিসাব এখনো বের করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিকা গ্রহণকারীদের বয়সভিত্তিক পর্যালোচনার কাজ চলছে।’

ওই অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় আরো দু-এক দিন সময় লাগতে পারে।

অবশ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে এক অনুষ্ঠানে বলেন, এখন থেকে কেন্দ্রে গিয়ে নিবন্ধন বন্ধ থাকবে। যাঁরা নিবন্ধন করে আসবেন, শুধু তাঁদের টিকা দেওয়া হবে। প্রয়োজনে পরে আবার এই প্রক্রিয়া চালু করা যাবে। তিনি বলেন, বেশির ভাগই কেন্দ্রে গিয়ে নিবন্ধন করছেন। এ ক্ষেত্রে বয়স্করা সুযোগ পাচ্ছেন কম, তাঁদের কষ্ট হচ্ছে। যাঁরা টিকা দেন তাঁদের নানা হয়রানি হচ্ছে।

কুয়েত মৈত্রীতে স্বস্তির সঙ্গে আছে হয়রানি : দুপুর ১২টা। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের মূল ফটক ধরে সামনে এগোতে ছোট খোলা মাঠ। গাছের ছায়ায় চেয়ারে সরিবদ্ধভাবে বসে অপেক্ষা করছেন একদল মানুষ। কেউ আক্ষেপ নিয়ে অভিযোগ করছেন, কেউ বা সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তাঁরা সবাই এসেছেন টিকা নিতে।

মাঠের সামনেই ছোট এক কক্ষে দেওয়া হচ্ছে টিকা। একসঙ্গে ১০ জনকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসেছেন ৪০ বছর থেকে শুরু করে ৭০ বছরের বেশি বয়সের অনেকে। হুইলচেয়ারে কিংবা লাঠিতে ভর দিয়ে স্বামী-সন্তান সঙ্গে নিয়ে এসেছেন কেউ কেউ।

টিকা নেওয়ার পর ৭১ বছর বয়সী মীর বক্স কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে এসেছি টিকা নিতে। টিকা নিয়ে ভালো লাগছে। ভয় না পেয়ে সবারই টিকা নেওয়া উচিত।’

সরেজমিনে ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, চল্লিশোর্ধ্ব অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে এসেছেন। তাঁরা টিকা নিতে বসে আছেন। দক্ষিণখান থেকে আসা মীর ইব্রাহীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ৪০ বছরের বেশি বয়সীরা টিকা নিতে পারবেন, টেলিভিশনে এমন প্রচার দেখেই তাঁর মতো অনেকেই এসেছেন। কিন্তু এখানে তাঁদের বলা হচ্ছে, কুর্মিটোলায় গেলে টিকা পাওয়া যাবে। এভাবে অনেকে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর থেকে আসা এক নারী বলছিলেন, তাঁর স্বামীর স্টেনটিং (হৃদযন্ত্রে রিং পরানো) করা হয়েছে। এখানে আসার পর বলা হচ্ছে পাঁচ দিন পরে টিকা নিতে। যাঁরা হৃদরোগী তাঁদের জন্য  আগে থেকে এই প্রচারটা থাকা উচিত।

নিবন্ধনের চাপ ঢাকা মেডিক্যালেও : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত দুই দিনের তুলনায় গতকাল টিকা নিতে আসা মানুষের ভিড় দেখা গেছে। দায়িত্বরত মেডিক্যাল অফিসার তাসমীনা পারভীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভ্যাকসিনের (টিকা) প্রতি মানুষের ভয় কমেছে এবং আগ্রহ বেড়েছে। গতকাল (বুধবার) যেখানে আমরা ৯৩০ জনকে ভ্যাকসিন দিয়েছি, সেখানে আজ দুপুরের মধ্যেই এক হাজার ৪০০ মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।’

ডা. তাসমীনা পারভীন বলেন, ‘এখানে নিবন্ধনেরও চাপ রয়েছে। অনেকেই উপস্থিত নিবন্ধন করে টিকা নিচ্ছেন। সে ক্ষেত্রেও এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।’ হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে নিবন্ধন করার ক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ এবং যারা একেবারেই পড়াশোনা জানেন না, এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

দিনে ২ লাখ ছাড়াল টিকা নেওয়া : দেশে গণটিকা শুরুর পঞ্চম দিনে গতকাল এক দিনেই সারা দেশে টিকা নিয়েছেন দুই লাখ চার হাজার ৫৪০ জন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে টিকা নিয়েছেন পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৩০৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ তিন লাখ ৮৬ হাজার ৫৭৮ জন ও নারী এক লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ জন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা