kalerkantho

শনিবার । ২১ ফাল্গুন ১৪২৭। ৬ মার্চ ২০২১। ২১ রজব ১৪৪২

বাংলা চাই, ইংরেজি চাই, আরো চাই...

মোস্তফা মামুন   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৪:০৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলা চাই, ইংরেজি চাই, আরো চাই...

ফেব্রুয়ারি মাস এলে দুটি ঘটনা ঘটে। একুশের চেতনা কারো কারো চিত্তে এমন চাঞ্চল্য তৈরি করে যে এই মাসে পুরোপুরি বাঙালি। বাংলায় কথা তো বলেনই, পারলে বাংলায় হাসেন। সম্ভব হলে বাংলায় কাঁদেন। আর বাংলার বিশ্বদরবারে আরো যোগ্য জায়গা পাওয়া উচিত—এজাতীয় তীব্র মত প্রকাশ করে আসর জমিয়ে তোলেন।

দ্বিতীয় পক্ষটা বুদ্ধিজীবীসুলভ উদাসীনতায় বলে, এ সবই বাড়াবাড়ি। এক মাসে বাংলা নিয়ে লাফালাফি কেন! বছর তো মাসের, তখন থাকেন কোথায়? এই ধরনের মৌসুমি বাংলাপ্রেমীর জন্য আজ বাংলার এই অবস্থা।

দুই মত চালু হওয়ার একটা কারণ প্রায় সব কিছুতেই আমাদের বহু মত। এর মধ্যে তর্কের সুবিধার্থে ছোট মতগুলো আড়াল হয়ে বড় দুটি মত প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দুই পক্ষের একটি হওয়ার সুবিধা যে এতে তর্ক করার একটা বিরোধী পক্ষ তো থাকলই। আবার বড় দল হলে তর্কে জেতার অনেক সঙ্গীও মিলল। দুই পক্ষ অবশ্য একটা জায়াগায় একমত। বাংলা যোগ্য মর্যাদা পাচ্ছে না।

যোগ্য মর্যাদা বিষয়টিও একটু গোলমেলে। আমার পরিচিত এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রনেতা সব সময় মনে করতেন, তাঁকে যোগ্য মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না। যাঁদের মধ্যে এমন খুঁতখুঁত থাকে, তাঁরা সত্যিই সমস্যায় পড়েন। হয়তো কোনো জায়গায় তিনটি চেয়ার, দেখা গেল তাঁর চেয়ারটারই পায়া ভাঙা। চা খেতে গেলে তাঁর সময় এলেই কাপ শেষ হয়ে যেত। নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাই তিনি খুব সোচ্চার থাকতেন। মাঝেমধ্যেই ধমকে উঠতেন—একজন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না!

তো একবার আমরা ঠিক করলাম, তাঁকে একটা বিরাট সম্মান দেব। পুষিয়ে দেব বেচারার সারা জীবনের আফসোস। জন্মদিনের দিন রাত ১২টা ১ মিনিটে সারপ্রাইজ দিয়ে বিরাট কেক কাটা হলো। হাতে তুলে দেওয়া হলো উপহারের সুদৃশ্য প্যাকেট। তিনি এই সম্মান প্রাপ্তিতে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘যা চেয়েছি তার চেয়ে বেশি পেয়েছি।’ এরপর প্যাকেটটা খুললেন। তাতে একটা বই। বইয়ের নাম, ‘যোগ্য মর্যাদা পেতে হলে যা করতে হয়!’

আমাদের এই নিষ্ঠুর রসিকতায় তিনি হতভম্ব। যোগ্য মর্যাদা দেওয়া হলো, না অমর্যাদা করা হলো—বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।

আমাদের সব ক্ষেত্রে যোগ্য মর্যাদার বিষয়টাই এমন। কী রকম মূল্যায়ন পাওয়া উচিত এটা বেশির ভাগই বুঝতে পারি না বলে যোগ্য মর্যাদা নিয়ে হৈচৈ করি। তাতে বাড়ে বাড়াবাড়ি। এর চাপে আসল বিষয়টা হাঁসফাঁস করে। মূল শিক্ষাটা শিকেয় ওঠে।

এই ফেব্রুয়ারিতে বাংলার এত রব ওঠে; কিন্তু সেই গান, স্লোগান আর মুখস্থ সব বক্তৃতায়ই সব শেষ। অথচ একটি প্রজন্ম যে বাংলা শিক্ষায় নিরুৎসাহ হয়ে উঠছে, সে নিয়ে কোনো ভাবনা আছে! এই সামাজিক প্রবণতাও বিশ্লেষণ জরুরি—কেন বাক্যে কয়েকটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার স্মার্টনেসের সংজ্ঞা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বাংলা শেখা মানে নিচের স্তরে রয়ে যাওয়া—এ রকম অসম্মানজনক তত্ত্বের চর্চা চলছে রীতিমতো। আর ওদিকে আমরা বাংলা-বাংলা ঢোল বাজাই। এই ঢোলটা তাই ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির হর্নের মতোই অসহ্য ও যন্ত্রণাময়। অথচ ফাঁকা আওয়াজ বাদ দিয়ে দরকার পুরো ভাষাশিক্ষা ভাবনাকে নতুন করে বিন্যস্ত করা।

আরেকটি গল্প বলি। বুঝতে সুবিধা হবে। মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশে যাচ্ছিলাম। সঙ্গী ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া চোস্ত ইংরেজিভাষী একজন। সেই সূত্রে যাত্রাপথে খুব খাতির পেল সে। এয়ারহোস্টেসদের সঙ্গে খাতিরও হয়ে গেল বেশ। কিন্তু সে দেশে পৌঁছার পর একটু সমস্যা। ওর এই কঠিন ইংরেজি স্থানীয় আরবরা খুব ভালো বুঝতে পারে না; বরং ওর চেয়ে আমার সাধারণ ইংরেজিতেই কাজ হয় বেশি। ‘আই গো’, ‘ইউ কাম’ দিয়ে কাজ হচ্ছে দেখে সে বেচারা হতবাক। একই ঘটনা ঘটবে আপনি যদি ইউরোপে যান। ইংল্যান্ড ছাড়া বাকি ইউরোপ ইংরেজি খুব একটা জানে না, জানলেও বলতে চায় না, সেখানেও ‘আই গো’, ‘ইউ কাম’ই বেশি কাজের। চীন-জাপান, লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার ফ্রেঞ্চ-ইতালিয়ান কলোনিতে গেলেও ঘটবে একই ঘটনা। এই দেখে শিক্ষা হয়েছে—আমরা যে মনে করি, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লেই পুরো দুনিয়ার সবার সঙ্গে ভাব হয়ে যাবে তাতে কত ভুল। সেই ভুলটা অনুভব করে পাল্টা চিন্তাও প্রবাহিত করা জরুরি। ইংলিশ মিডিয়াম যত না জরুরি, বিদেশের সঙ্গে তার চেয়ে বেশি জরুরি ইংরেজি ভাষাটাতে যোগাযোগ করার সাধারণ ক্ষমতা। আর সেটা খুবই সম্ভব আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। সেখানে ‘স্পোকেন ইংলিশে’ গুরুত্ব দিলেই দূর হয়ে যায় অনেক বড় বাধা। ইংলিশ মিডিয়ামের প্রাবল্যে পরের প্রজন্ম যে দেশের সংস্কৃতিবিমুখ হয়ে যাচ্ছে সেই সমস্যা অনেকটাই দূর হয়। মা-বাবা যদি বুঝতে পারেন, সাধারণ স্কুল থেকেই তাঁর সন্তান প্রয়োজনীয় ইংরেজিটা শিখে নেবে; তাহলে ধারদেনা করে, খরচের পাহাড়ে ডুবে সবাই ইংলিশ মিডিয়ামে ছুটবে না।

আমাদের শিক্ষায় ইংরেজি আছে। একটু বেশি ভালোভাবেই আছে। আমাদের ইন্টারমিডিয়েটে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে যে কঠিন গ্রামারের প্রশ্ন আসে এতে ইংরেজিভাষী দেশের অনেকেই ফেল করে বসবে। কিন্তু যারা এখানে অনেক অনেক নম্বর পায় তারাও দেখা যায় ইংরেজি বলতে গেলে মুখ শুকিয়ে মূক হয়ে যায়। কারণ আমরা ব্যাকরণে যতটা গুরুত্ব দিই ততটা গুরুত্ব নেই বলায় ও যোগাযোগে। ইংরেজির মতো গোলমেলে আরেকটা ব্যাপার আছে আরবির ক্ষেত্রে। যে মধ্যপ্রাচ্য সফরের কথা বলছিলাম সেখানকারই অভিজ্ঞতা। কোরআন শরিফ শিক্ষার সুবাদে আমাদের প্রায় সবাই কমবেশি আরবি পড়তে পারি। আরবিতে লেখা যত সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড আছে সব দিব্যি পড়তে পারছি। পড়তে পারছি; কিন্তু বুঝতে পারছি না। আর তখন আরেকটা উজ্জ্বল সম্ভাবনা নষ্ট করার আফসোসও হতে থাকল। প্রায় সবাই যেহেতু আরবি পড়াটা শিখে ফেলি, শিক্ষাব্যবস্থায় আরেকটু সমন্বয় করলে খুব সম্ভব আরবি ভাষাটাও পুরো শিখে ফেলা যায়। কিন্তু এখানেও খণ্ডিত এবং আংশিক শিক্ষা। তাই আমরা ইংরেজি ব্যাকরণ শিখি, বলতে শিখি না। আরবি পড়তে জানি, অর্থ জানি না। আর এভাবে দ্বিতীয় ভাষা জানার অভাবে বৈশ্বিক যোগাযোগে যে সমস্যা সেই দায়টা গিয়ে পড়ে বাংলার ওপর। মনে করি, বাংলা মিডিয়ামে পড়ে এবং বাংলায় মেতে থাকি বলেই ইংরেজি শেখা হচ্ছে না। পিছিয়ে পড়ছি। কেউ ছোটে ইংলিশ মিডিয়ামে। যাদের সেই ক্ষমতা নেই তারাও  বাংলার ওপর রেগে থাকে। ইংরেজি বা দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা সঠিক হলে তখনই বাংলা এই ভুল দায় থেকে মুক্তি পাবে। সমুন্নত থাকবে বাংলার গুরুত্ব ও মর্যাদা। ভাড়া করা ঢোল আর লাগবে না।

কারো কারো কাছে বিষয়টাকে ভারী লাগতে পারে। ভাষার এই ভার কমানোর জন্য তারাপদ রায়ের বিশাল সংগ্রহ থেকে একটা ভারতীয় কৌতুক শোনা যাক। এক ভদ্রলোক মারা যাওয়ার আগে ছেলেকে ধরলেন, ‘আমাকে সংস্কৃত শেখানোর ব্যবস্থা কর। কখন মরে যাই...’

ছেলে বলল, ‘জীবনে লাগল না। মরে গেলে সংস্কৃত লাগবে কেন?’

‘আরে স্বর্গের ভাষা হচ্ছে সংস্কৃত। সেটা না পারলে লজ্জার ব্যাপার হবে।’

ছোট ছেলে একটু দুষ্টুমি করে বলল, ‘বাবা, তুমি কী করে নিশ্চিত হলে যে স্বর্গে যাবে। নরকেও তো যেতে পারো।’

‘নরকে গেলে তো কোনো সমস্যা নেই। আমার হিন্দি তো জানাই আছে।’

হিন্দি তাহলে নরকের ভাষা! কৌতুকটার জাতীয়করণ করলাম না; কারণ এই ফেব্রুয়ারিতে বাংলার বিষয়ে আমাদের কেউ কেউ অতিরিক্ত আবেগী হয়ে যাই।

সেই আবেগপ্রবণদের জন্যও একটা গল্প আছে। আশির দশকে ইংল্যান্ডের এমসিসি দল এসেছে বাংলাদেশে খেলতে। ম্যাচ শুরুর আগে এমসিসির অধিনায়কের কাছে ভাষ্যকার জানতে চাইলেন, ‘হোয়াট ডু ইউ থিংক অ্যাবাউট দ্য পিস।’

অধিনায়ক একটু অবাক। এখানে পিস বা শান্তির প্রসঙ্গ আসবে কেন? তবু ভদ্রতা করে বললেন, ‘ইয়া। এভরিথিং ভেরি পিসফুল।’

ভাষ্যকার আঙুল দিয়ে মাঠের একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, ‘নো নো, আই অ্যাম টকিং অ্যাবাউট পিস’।

এবার অধিনায়ক বুঝলেন। হেসে বললেন, ‘ও তুমি পিচের কথা বলছ। ভালো। ব্যাটিং-বোলিং দুটোর জন্যই..’

বুঝলেন তো, ভাষ্যকার ভদ্রলোক আঞ্চলিকতার কারণে চ-কে ছ বা স-এর মতো উচ্চারণ করেন। তাই পিচ বা উইকেট হয়ে যায় পিস।

এর শিক্ষা কী এটাই যে ঠিকমতো ইংরেজি শিখতে হলেও আগে দরকার সঠিক বাংলা শিক্ষা!

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা