kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

মুজিব বর্ষপঞ্জি : প্রেক্ষিত ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

এ কে এম কামরুল ইসলাম    

৩১ জানুয়ারি, ২০২১ ০৪:৫৭ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মুজিব বর্ষপঞ্জি : প্রেক্ষিত ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

প্রতি বৎসর এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। একদিকে বৃষ্টিবাদল অন্যদিকে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। 

পেশাগত কারণে প্রতি বৎসর বাজেটকে কিছুটা বিশ্লেষণ করতে হয় এবং প্রতি বৎসর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পায়। প্রাকৃতিকভাবেই জনগণের দুর্ভোগ ও সরকারী ব্যয়ে বিপুল অপচয় চলমান থাকে। এ থেকে মুক্তি পাবার জন্য নীতিনির্ধারকরা মাঝে মাঝে আলোচনা করেন কিন্তু ফলপ্রসূ কোন সমাধান আদৌ দেখতে পাই না। এ বৎসর জানুয়ারী থেকে মুজিব শতবর্ষের উদযাপন উপলক্ষে সারা দেশে সাজ সাজ রব শুরু হয়েছে, আমি মুজিববর্ষকে কেন্দ্র করে এতদিন যাবত যে অপচয় ও জনদুর্ভোগ চলমান, তা থেকে মুক্তির একটি সম্ভাব্য সমাধানের সূত্র খুঁজে পাই।

মুজিব শতবর্ষ শুরু হয়েছে ১৭ মার্চ ২০২০ এবং তা চলবে ২৬ মার্চ ২০২১ সাল পর্যন্ত। যদি মুজিববর্ষকে এখনই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া না যায়, তবে ২০২১ সালের পর তা আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যাবে। আমাদেরকে ২০৭০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী পালিত হবে। পরের বৎসরেই ২০৭১ সালে একটি সমৃদ্ধশালী উন্নত বাংলাদেশ তার একশততম বার্ষিকী পালন করবে ইনশাআল্লাহ।

বঙ্গবন্ধুর জন্মক্ষণকে নিয়ে যদি আমরা একটি বর্ষ গণনা শুরু করি, যা হবে সত্যিকার মুজিববর্ষ এবং মুজিব বর্ষপঞ্জি ১০১-এর মাধ্যমে তা প্রকাশিত হলো :

বর্ষ গণনা : বর্তমানে বাংলাদেশে ইংরেজী বর্ষপঞ্জি, যা সর্বাধিক প্রচলিত ক্যালেন্ডার। বাংলা বর্ষপঞ্জিও প্রচলিত, এ ছাড়া হিজরী সনও কিছুটা প্রচলিত। আরো একটি বর্ষপঞ্জি মুজিববর্ষ চালু হলে বাড়তি কোনো চাপ আসবে কিনা সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।

আর্থিক বৎসর গণনা : পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে প্রচলিত ইংরেজি ক্যালেন্ডার বর্ষের শুরুতে মানে ১ জানুয়ারী তাদের আর্থিক বৎসর শুরু করে। কিন্তু আমাদের দেশের আর্থিক বৎসর শুরু হয় ১ জুলাই থেকে, যা পরবর্তী বৎসরের ৩০ জুন শেষ হয়।

আমরা একটু দেখে নিতে চাই কতগুলি দেশ, কবে থেকে তাদের আর্থিক বৎসর শুরু করে :

এ ছাড়াও অল্প কয়েকটি দেশ বিচ্ছিন্ন তারিখে তাদের আর্থিক বৎসর শুরু করে। যেমন :

বিশ্লেষণের সুবিধার্থে আমাদের আর্থিক বৎসর প্রতি ৩ মাস করে ৪টি কোয়ার্টারে ভাগ করে নেয়া যাক :

প্রথম প্রান্তিক-Q1-৯২ দিন (জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর)

দ্বিতীয় প্রান্তিক-Q2-৯২ দিন (অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর)

তৃতীয় প্রান্তিক-Q3-৯০/৯১ দিন (জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী, মার্চ)

চতুর্থ প্রান্তিক-Q4-৯১ দিন (এপ্রিল, মে, জুন)


গণনার সুবিধার্থে আমরা প্রতিটি প্রান্তিক (Quarter)-কে মোট সময় কালের ২৫ শতাংশ হিসেবে গণনা করবো।

আমরা এবার বাংলাদেশে বিগত ৫ বছরের বাজেটকে বিশ্লেষণ করে দেখতে চাই :

প্রতি বৎসরই বাজেটের আকার বাড়ছে, একই সাথে উন্নয়ন বাজেটের পরিমাণ এবং হিস্যা বাড়ছে। যেহেতু আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে পড়েছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে যেভাবে লক্ষ্যস্থির করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তাতে আগামীতে বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকবে।

সময়ভিত্তিক উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন :

আমরা যদি সময়ভিত্তিক উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করি তাতে দেখা যায় যে প্রতি ৩ মাসের সময়কাল ও বাজেট বাস্তবায়ন একই তালে ঘটে না। এটা যেমন বাংলাদেশের জন্য সত্য, তেমনি প্রায় সব দেশের জন্যও কম-বেশি সত্য। নিচের সারণীর মাধ্যমে এটা দেখা যেতে পারে :

মুজিববর্ষ যেহেতু ইংরেজী মাসের প্রায় মাঝামাঝি শুরু হবে বর্তমান আর্থিক বর্ষের প্রতি প্রান্তিক এবং মুজিববর্ষের আর্থিক বর্ষের প্রান্তিক হুবহু এক হবে না।

উপরের সারণী থেকে এটাও স্পষ্ট যে প্রায় প্রতি বৎসরই গড়ে বাজেটের ১০% বাজেট অব্যবহৃত থেকে যায়।

উন্নয়নে আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাব :

এবার দৃষ্টিটা একটু অন্যদিকে ফেরানো যাক। সারা পৃথিবীব্যাপী আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল মাস থেকে বৃষ্টি-বাদল শুরু হয়ে যায়, যা অক্টোবর পর্যন্ত চলতে থাকে। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কাল আমাদের দেশে উন্নয়ন কাজের জন্য সব চাইতে উত্তম সময়। দেশের এলাকাভেদে বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়া একেক রকম। দেশের গড় বৃষ্টিপাত দিয়ে বিশ্লেষণ করলে সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে না। তবুও ঢাকার তিন মাস বা কোয়ার্টার ভিত্তিতে গড় বৃষ্টিপাত এবং কত দিন বৃষ্টিপাত হয়েছে তা দেখানো হলো :

আমরা যদি আরো লক্ষ করি যে Q4 বা শেষ তিন মাসের মাসিক ভিত্তিতে বাজেট বাস্তবায়নে একটি ব্যাপক ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়।

সুবিধাজনক আর্থিক বর্ষ :

উপরোক্ত পর্যালোচনার পর এটা এখন স্পষ্ট যে আমরা আমাদের আর্থিক বৎসর পরিবর্তন করে সম্পদের অধিকতর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি। যদি আমরা আমাদের আর্থিক বৎসর ৩ মাস বা সাড়ে ৩ মাস এগিয়ে আনতে পারি, তবে প্রাকৃতিকভাবে জনগণের দুর্ভোগ এবং সম্পদের অপচয় থেকে রেহাই পেতে পারি। এখন প্রশ্ন দেখা দিবে, বাংলা বর্ষ মানে ১ বৈশাখ বা ১৪ এপ্রিল কি একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। ১ বৈশাখ যদি আমরা আর্থিক বৎসর শুরু করি, তবে বর্তমান আর্থিক বৎসর থেকে ২ মাস ১৫ দিন এগিয়ে আসবে, এতেও আমরা উপকৃত হবো, কিন্তু পুরো সুবিধা নিতে পারবো না। ছোট বেলায় মনে আছে ১ বৈশাখ সকালে আমরা মেলায় যেতাম, দুপুরের পর থেকে আকাশ কালো থাকতো এবং বিকেলে অবশ্যম্ভাবীভাবেই কালবৈশাখী হতো। এটা যেনো অমোঘ বিধান, প্রতি বৎসরে একই ঘটনা ঘটতো। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এটা ক্রমাগত এগিয়ে আসছে। কোনো কোনো বৎসর মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়।

১ এপ্রিল যদি আর্থিক বৎসর শুরু হয়, তবে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য হয়তো ২৫ কিংবা ৩০ বৎসর পর আবার তা এগিয়ে আনার চিন্তা করতে হবে। সুতরাং সঠিক সংখ্যাগত উপাত্ত বা ডাটার বিশ্লেষণ না করেও আমরা বলতে পারি প্রস্তাবিত মুজিববর্ষ একটি সম্ভাব্য সমাধান, যা আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আগামীতে দক্ষ ও অধিকতর যোগ্য করে তুলবে।

বিপুল জাতীয় আর্থিক সাশ্রয় :

এই বৎসর আমাদের উন্নয়ন বাজেট ২ লক্ষ কোটি টাকার উপর, যার শতকরা ৪৩ ভাগই ব্যবহার করা হবে এপ্রিল, মে এবং জুন মাসে বা Q4 সময়কালে; যার আর্থিক মূল্য ৮৬,০০০ কোটি টাকা। যদি আমরা তিন মাস কিংবা সাড়ে তিন মাস আগে এই টাকাটা কাজে লাগাতে পারতাম, তবে প্রাকৃতিকভাবেই কমপক্ষে ১০ শতাংশ টাকা সাশ্রয় করতে পারতাম। তর্কের খাতিরে কেউ বলতে পারেন যে, সময়কাল যাই হোক আমরা তো বাজেট অনুযায়ীই টাকা ছাড় করছি, তবে সাশ্রয় কিভাবে হলো। আমার উত্তর হলো একই সমান টাকায় আমাদের কাজের মান অনেক উন্নত হবে, যদি ৫ বৎসরের পর রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ টাকা বরাদ্দ দিতে হয়, কাজের মান ভালো হলে ৬ বৎসর বা ৭ বৎসর পর রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বাজেট রাখতে হবে। একই সাথে আপামর জনগণ গুণগত মানসম্পন্ন অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারবে।

পরিবর্তনের এখনই সময়:

মুজিব বর্ষপঞ্জি স্মারক বর্ষপঞ্জি হিসেবে চালু করা শুধুমাত্র একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপার কিন্তু মুজিববর্ষকে আর্থিক বৎসর হিসেবে বিবেচনায় নিতে হলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আরো অনেক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। পক্ষে-বিপক্ষে সত্যিকার গঠনমূলক অংশগ্রহণ এবং ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার প্রয়োজন। মুজিববর্ষকে আর্থিক বৎসর হিসেবে বিবেচনায় নিলে আমাদের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে যাবে। ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সকল পর্যায়েই এটার প্রভাব পড়বে। তাই হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না, আমাদের অবশ্যই ইমপ্যাক্ট এনালাইসিস করে দেখতে হবে এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। পৃথিবীর অনেক দেশই তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার অভিপ্রায়ে আর্থিক বৎসর পরিবর্তন করেছে।

মুজিববর্ষ ক্যালেন্ডার কি নির্ভুল :

স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন দেখা দিবে সেটা হলো মুজিববর্ষের ক্যালেন্ডার কতটুকু নির্ভুল এবং যুক্তিযুক্ত। আদি ক্যালেন্ডার জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে ১৫৮২ খৃষ্টাব্দে পোপ গ্রেগরী (Pope Gregory-Xlll) যখন সংস্কার করেন তখন অক্টোবর মাসের ক্যালেন্ডার থেকে ১০ দিন বাদ দিয়ে দেন ৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ১৫৮২ তারিখের পরের দিন শুক্রবার ১৫ অক্টোবর ১৫৮২ খৃষ্টাব্দ হিসাবে গণ্য করা হয়।

পরবর্তীতে ১৭৫২ সালে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে প্রায় নির্ভুল করার জন্য আবারো পুনর্বিন্যাস করা হয়। আমরা যদি দেখি পৃথিবীর গড় জ্যোতিবর্ষ বা Astronomical year হচ্ছে ৩৬৫.২৪২১৮৯ দিন কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত Gregorian ক্যালেন্ডার হচ্ছে ৩৬৫.২৫ দিন, মানে প্রতি চার বৎসর পর পর একটি Leap Year যোগ করে ৩৬৬ দিনে বৎসরে গণনা করা হয়। যা ১২৮ বৎসরে একদিন সমন্বয় করতে হয় এবং সেহেতু চার (৪) দিয়ে ভাগ যাওয়া সত্ত্বেও ১৯০০, ২১০০, ২২০০, ২৩০০ সাল অধিবর্ষ বা Leap Year নয়, কারণ প্রতি শতবর্ষকে চারশত (৪০০) দিয়ে ভাগ যাওয়ার একটি অতিরিক্ত শর্ত পূরণ করতে হয়। এত কিছু পরও আমরা প্রতি বৎসর ২৭ সেকেন্ড ভুল গণনা করছি, যা প্রতি ৩২৩৬ বৎসর পর পর একদিনের সমন্বয় বা Adjustment করতে হবে।

উপরোক্ত বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট যে বর্তমানে প্রচলিত Greogrian ক্যালেন্ডার যতটুকু নির্ভুল, মুজিববর্ষের ক্যালেন্ডারও ততটুকু নির্ভুল। কম-বেশী ৩২৩৬ বৎসর পর নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ১ দিনের সমন্বয় করে এটা ঠিক করে নিবেন।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা