kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

নির্বাচনে টাকার খেলা ও দুর্নীতি

এ কে এম শাহনাওয়াজ   

৩০ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৪১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নির্বাচনে টাকার খেলা ও দুর্নীতি

ক্রমেই সামাজিক অবক্ষয় আমাদের অনেকটা বিধ্বস্ত করে ফেলছে যেন। দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ঔজ্জ্বল্যকে নানা নৈরাজ্য অনেকটা বিবর্ণ করে ফেলছে। ঘুষ-দুর্নীতি এ দেশের ইতিহাসে পুরনো রোগ। তবে একসময় ঘুষখোররা লুকিয়ে ঘুষ খেত। বাবার অপকীর্তির জন্য সন্তানরা লজ্জিত থাকত। এখন অনেক সন্তানই বাবার অবৈধ সম্পদের জোয়ারে আনন্দে আর গর্বে ভাসে। ভুক্তভোগীরা জানেন, ঘুষ না দিলে সেবা সংস্থার ফাইল নড়বে না। এসব নিবারণের জন্য সরকারি দায়িত্বশীলরা থাকলেও তাঁরা সাধারণত কোনো রহস্যজনক কারণে এদিকে নজর দেন না। ঘুষখোর আর দুর্নীতিবাজদের সন্তানরা বাবার কৃতিত্বে এখন বেশ গর্বিত ভঙ্গিতেই পথ চলে। কিন্তু এসব ঐতিহ্যিক দুর্নীতিকে ছাপিয়ে এখন সমাজ অবক্ষয়ের নতুন নতুন ধারার জন্ম দিচ্ছে। ধর্ষণ একটি মহামারির রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে কিশোর গ্যাং বলে আরেকটি উৎপাতের জন্ম হয়েছে। আর রাজনৈতিক দুর্নীতি তো সব দুর্নীতির ওপর ছাতা মেলে ধরে আছে অনেক দিন থেকে।

যাঁরা ১৯৫৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত জাতীয় পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের স্মৃতিচারণা করতে পারেন, তাঁরা বলবেন, নির্বাচনী ব্যয়ের সহজ সীমারেখা টানা যেত তখন। খরচের ক্ষেত্রগুলো কী ছিল? বাঁশের বেড়া দিয়ে নির্বাচনী প্রচারকেন্দ্র বানানো। এখানে বিড়ি, চা আর টোস্ট বিস্কুটের ব্যবস্থা রাখা। ব্যানার-ফেস্টুনের ব্যবস্থা করা। যে কর্মী বাহিনী চোঙা ফুঁকে নির্বাচনী মিছিল করবে তাদের চা-নাশতা আর সময় বিশেষে ভাত খাওয়ার বন্দোবস্ত করা। এর বাইরে অদৃশ্য কোনো খরচ যদি থেকেও থাকে, তবে তা এতই ব্যতিক্রম যে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থায় এর তেমন প্রভাব পড়ত না। এ পর্বে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার থেকে শুরু করে জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা সাধারণভাবে নিজেদের জনগণের নেতা বা সেবক ভাবতে অভ্যস্ত ছিলেন। নির্বাচনে যেটুকু ব্যয় হতো তা তাঁদের সাধারণ বাজেটের অন্তর্গত হিসেবেই মেনে নিতে অভ্যস্ত ছিলেন। নির্বাচনে জেতার পর বাজেটের ক্ষতিপূরণ নিয়ে তাঁদের কোনো ভাবনা থাকত না। আর্থিক সামর্থ্যহীন জনপ্রিয় নেতারা তখন মূল্য পেতেন। তাঁদের নির্বাচনী ব্যয় কিছুটা দল, কিছুটা সামর্থ্যবান এলাকাবাসীই বহন করত। এ কারণে বিরাট নির্বাচনী ব্যয়ের দায় মাথায় বইতে হতো না বলে সুদে-আসলে টাকা উসুলের দায়িত্বও বহন করতে হতো না। বেশির ভাগ নেতা নিজেদের জননেতাই মনে করতেন। জনকল্যাণকে তাঁরা ব্রত হিসেবে মানতেন।

বিক্রমপুরে আমার এক দাদার গল্প মানুষের মুখে মুখে শুনেছি। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রী ছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি ছিলেন এলাকার জনপ্রিয় নেতা। অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দীর্ঘকাল তিনি ইউনিয়ন পরিষদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। শুনেছি, তাঁর অনেক জমিজিরাত ছিল। দীর্ঘকাল জনপ্রতিনিধি থাকায় জীবদ্দশায়ই জনকল্যাণে প্রায় সব জমি খুইয়ে দিয়েছিলেন। এখন তাঁর সন্তানরা কায়ক্লেশে জীবন নির্বাহ করছে। আপনারা সবাই মানবেন এমন উদাহরণ একটি নয়—দেশজুড়ে অসংখ্য ছিল।

সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া পৌর নির্বাচনের একটি তথ্য দিই। একটি ওয়ার্ডে সামনের সারিতে থাকা তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন। সিটিং কাউন্সিলর এবারও দাঁড়িয়েছেন। গতবার নির্বাচনে যা খরচ করেছেন সে তুলনায় টাকা কামাইয়ের লক্ষ্য নাকি পুরোপরি অর্জিত হয়নি। তাই এবার জিততেই হবে; কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী দুজনই অর্থশালী। জনশ্রুতি আছে, একজন মাদকের কারবার করে বিপুল বিত্ত করেছেন। আরেকজন ব্যবসা-বাণিজ্য করে ধনবান। তাই টাকা খরচে এগিয়ে থাকতে হবে। এ কারণে মূলবান এক বিঘা জমি বেচে দিয়েছেন। আমি ভাবি, কাউন্সিলর প্রার্থীদেরই যদি এত খরচ করতে হয়, তাহলে মেয়রদের ক্ষেত্রে অঙ্কটা কেমন হবে। এই ধারায় সংসদ নির্বাচনের অবস্থাটা সহজেই অনুমেয়। নির্বাচনে এমন টাকার খেলার সূত্রে স্বাভাবিকভাবেই দুর্নীতির শাখা-প্রশাখা মেলবে।

এরই মধ্যে বড় দলগুলোর নির্বাচনে ব্যয়ের ক্ষেত্র অনেক সম্প্রসারিত হয়েছে। যেমন—একটি ব্যয় পরিচালনা করতে হচ্ছে দলীয়ভাবে, আরেকটি ব্যয় পরিচালনা করতে হচ্ছে প্রার্থীকে। এ ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুতি ও খরচ একরকম, আবার বিরোধী দলে থেকে নির্বাচন মোকাবেলার প্রস্তুতি ও খরচ অন্য রকম। নির্বাচনী ফল নিজ দলের পক্ষে রাখার জন্য ক্ষমতায় থাকতেই দলীয় লোক বসাতে হবে উপযুক্ত জায়গাগুলোতে। পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন ফিট রাখতে করণীয় সব করে যেতে হবে। তাঁবেদার নির্বাচন কমিশন বানাতে হবে। এর জন্য বিপুল খরচের প্রয়োজন। এসবের জন্য প্রয়োজন শতসহস্র কোটি মুদ্রা। আর তা নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী সেল চাই। এমন জটিল কার্যক্রম সফল করার জন্য বিপুল অঙ্কের চাঁদা যাদের ওপর আরোপ করা হয়, বিনিময়ে তাদের প্রভূত সুবিধা দিতে হয় রাষ্ট্রের ও প্রশাসনের বারোটা বাজিয়ে। এ কারণেই শত শত কোটি টাকার ঋণখেলাপিরা ঋণের টাকা নিজেরাই যেন তামাদি ঘোষণা করে মাথা উঁচু করে চলেন, আবার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে এমপিও হন। সবুজসংকেতে সরকারি খাসজমিগুলোকে নিজেদের তালুক বানিয়ে ফেলেন। লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে শত কোটি কোটি টাকা নিজের এবং পরিজনদের নামে স্বদেশের এবং বিদেশের ব্যাংকে তুলে রাখেন।

এভাবে দলের আশীর্বাদ নিয়ে প্রার্থীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন নির্বাচনী খরচ জোগাতে। ব্যবসায়ী আমলা জোগাড় করেন যে যার কায়দামতো। বণিক বুদ্ধি মুনাফা খোঁজে। অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে ভবিষ্যতে তা বহুগুণে ফিরে পাওয়ার অঙ্গীকার আদায় করে নেয়। এমনও শোনা যায়, অনেক অর্থলগ্নিকারী বণিকগোষ্ঠী আছে, যারা কোনো ঝুঁকিতে থাকতে চায় না। ক্ষমতার সিঁড়িতে পা রাখা দুই পক্ষকেই টাকা বিলিয়ে যায়। কারণ ক্ষমতায় যে-ই আসুক বণিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা যাবে না।

এসবের পরও প্রতিযোগিতার নির্বাচনে আরো অর্থের দরকার পড়ে। তখন শুরু হয় মনোনয়ন বেচা। কোটি কোটি টাকা দলীয় ফান্ডে দিয়ে দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে রাজনীতি করা ত্যাগী নেতাকে কনুইয়ের গুঁতায় ঠেলে ফেলে ভুঁইফোড় বণিক নির্বাচনের টিকিট পেয়ে যান। স্বাভাবিকভাবেই এসব এমপিকে চোখে দেখার সৌভাগ্য এলাকাবাসীর প্রায়ই হয় না। এই বণিক-রাজনীতিকরা সংসদ সদস্যের টিকিট বুকপকেটে রেখে নির্বাচনে লগ্নি করা টাকা বহুগুণে ফেরত আনার নানা তদবিরে ব্যস্ত থাকেন।

নির্বাচনের মাঠে কর্মীরাও এখন কমার্শিয়াল হয়ে গেছেন বা তাঁদের কমার্শিয়াল বানানো হচ্ছে। চা-বিস্কুট আর বিড়ি খাওয়ালে এখন চলছে না। ভোটকেন্দ্র দখল বা এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য এখন রীতিমতো টাকা ছড়িয়ে ষণ্ডা পুষতে হচ্ছে। বিগত কোনো এক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিক্রমপুর গিয়েছিলাম। শুনে অবাক হলাম, পেশিবহুল গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের ১৫ জনকে নাকি নির্বাচনে কাজ করার জন্য প্রার্থী ১৫টি মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছেন। আরেক পক্ষের প্রার্থী তাঁর কর্মীদের দিয়েছেন ১০০টি মোবাইল ফোন।

নির্বাচনে এমন উন্মুক্ত টাকার খেলাই জন্ম দিচ্ছে রাজনৈতিক দুর্নীতির। কালো টাকাকে পরোক্ষ অনুমোদন দিতে হচ্ছে। সন্ত্রাসী পুষতে হচ্ছে। দুর্নীতিপরায়ণ আমলা আর অসাধু ব্যবসায়ীকে রাষ্ট্র আর দলের নীতিনির্ধারক বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব বাস্তবতার কারণে আজ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতানেত্রীর প্রতি আমাদের আবেদন থাকবে, যদি আপনাদের মধ্যে সামান্যতম দেশপ্রেম অবশিষ্ট থাকে এবং দেশে যদি প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে টাকার খেলা আর সন্ত্রাসী পোষার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসুন। বিপুল কালো টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন বিক্রি বন্ধ করুন। তাহলে ক্ষমতায় গিয়ে কাউকে অন্যায় সুবিধা দিতে হবে না। অর্থবিত্তের গুণে নয়, জননেতার গুণাবলি বিচারে প্রার্থী নির্বাচন করুন। ইতিবাচক রাজনীতি চর্চার মধ্য দিয়ে রাজনীতিকে মোকাবেলা করুন। আপনাদের মনোনীত প্রার্থীরা যদি নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয় নেতা হয়ে থাকেন, জনগণের কাছে থেকে নিজেকে যোগ্য বলে প্রমাণ করতে পারেন, তবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথটাকে তিনিই এগিয়ে দিতে পারবেন। এমন প্রার্থীর জন্য টাকা ছড়াতে হয় না। পেশিশক্তি ভাড়া করতে হয় না। মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন আর টাকা ছড়িয়ে তরুণসমাজের চরিত্র হনন করার প্রয়োজন পড়ে না। তবে এটুকু নিশ্চিত করতে হবে যে প্রকৃত ভোটার তাঁর নিজের ভোটটি স্বাধীন বিবেচনায় দিতে পারবেন। অবশ্য আমার এক রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট আত্মীয় এসব চিন্তাকে ভাবকল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে টাকা না উড়িয়ে নির্বাচনে জেতা সম্ভব নয়।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা