kalerkantho

সোমবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭। ১ মার্চ ২০২১। ১৬ রজব ১৪৪২

টিকার উচ্ছ্বাসে অসতর্ক হলে ভয়ানক বিপদ

তৌফিক মারুফ   

৩০ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:২৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



টিকার উচ্ছ্বাসে অসতর্ক হলে ভয়ানক বিপদ

দেশে কয়েক দিন ধরে সব কিছু ছাপিয়ে সবার দৃষ্টি আটকে গেছে করোনাভাইরাসের টিকার ওপর। ভারত থেকে টিকা দেশে এসে পৌঁছানো, টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন ও টিকা দেওয়া নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে উচ্ছ্বাস চলছে। এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি আগের তুলনায় দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করার চিত্র উঠে আসছে শনাক্ত হার নিম্নমুখী হওয়ার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে দৈনিক শনাক্ত হার দুই সপ্তাহ ধরে ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অন্যদিকে মৃতের সংখ্যা থাকছে ২০ জনের নিচে। আর প্রায় ৯ মাসের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম—সাতজন। দৈনিক শনাক্তও থাকছে ৫০০ থেকে ৬০০ জনের মধ্যে।

তুলনামূলক এমন অগ্রগতির মধ্যে অন্য রকম আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বেশ কিছু দেশের উদাহরণ টেনে ধরে বলেছেন, শনাক্ত একেবারে নিচের দিকে নেমে যাওয়ার পরও অনেক দেশেই আবার উল্টো বেড়ে যায় সংক্রমণ। সর্বশেষ যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এই পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশও এই মুহূর্তে সতর্কতামূলক ব্যবস্থার দিকে পর্যাপ্ত নজরদারি না রাখলে নিম্নগতি থেকেও সংক্রমণ যেকোনো সময় ঘুরে গিয়ে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠতে পারে। আর তেমনটা হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে শুধু টিকা ঘিরে সব তৎপরতায় মনোনিবেশ না দিয়ে সংক্রমণ নিম্নগামী রাখা ও নিয়ন্ত্রণের ওপরও মনোযোগী হওয়া উচিত। তা না হলে শুধু টিকা দিয়ে সুরক্ষা কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকার গঠিত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে যাঁরা আছেন তাঁদের মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশ কিন্তু এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনের আওতায় কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। শনাক্ত কমাতে পারলেও সংক্রমণ কিন্তু আমরা কোনোভাবেই বন্ধ করতে পারছি না। আবার যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা মহামারি থেকে বাংলাদেশকে অবমুক্ত না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সংক্রমণ যতই কমে যাক, আমরা কিন্তু মহামারির আওতায় থাকব। শুধু টিকা দিলেই হবে না, আমাদের অন্য বিষয়গুলো এখনো কঠোরভাবেই অনুসরণের পদক্ষেপ চালিয়ে যেতে হবে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কিছুদিন আগেও যে ধরনের কিছু কার্যক্রম দেখা গিয়েছিল, সেগুলো এখন বন্ধ হয়ে গেছে। আবারও মানুষ বড় বড় সমাবেশ করছে, উৎসব করছে, পিকনিক করছে, প্রতিদিন শত শত বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, আগের মতোই ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র সচল হয়ে গেছে, সেসব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধির পোস্টার-ব্যানার থাকলেও বাস্তবে তা কিছুই মানা হচ্ছে না। সরকারের উচিত, এদিকে সতর্ক নজর রাখা।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিকা নিয়ে উচ্ছ্বাসের আড়ালে আমাদের সামনে যেকোনো সময় সংক্রমণ ঘুরে গিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ যেভাবে আমাদের জীবনযাত্রা চলতে দেখছি, তা খুবই উদ্বেগজনক। অনেকের ধারণা, দেশে যেহেতু টিকা এসে গেছে এখন আর আমাদের কোনো চিন্তা নেই, আমরা হয়তো টিকা দিয়েই করোনা থেকে মুক্তি পেয়ে যাব, কিন্তু সবার জানা উচিত, এখন পর্যন্ত এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমাদের চোখের সামনেই উদাহরণ হয়ে আছে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। যেখানে সংক্রমণ অশনাক্ত একেবারে শূন্যের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল এবং যা দেখে সেখানকার মানুষ ভেবেছিল তারা করোনা থেকে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে, তারা স্বাস্থ্যবিধি থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেসব দেশের মানুষ এখন আগের চেয়েও ভয়ানক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।’

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শনাক্ত কম হচ্ছে এবং এটি দুই সপ্তাহ ধরে ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। এটি খুবই আশর কথা, কিন্তু এই আশা যেকোনো সময়ের দুরাশায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা কিন্তু এখনো রয়ে গেছে। বহু দেশ একেবারে শূন্যের কাছাকাছি গিয়েও আবার তা চূড়ায় উঠে গেছে এবং কোথাও কোথাও আগের চেয়েও ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে সংক্রমণের টার্নিং পয়েন্টের দিকে গভীর মনোযোগ নিয়ে পর্যবেক্ষণ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে শনাক্ত এখন যে পর্যায়ে আছে, সেটা যেমন ধরে রাখার রাখতে হবে, অন্যদিকে পরীক্ষার সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। কারণ আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেকেই এখন আর পরীক্ষা করাতে আসছে না। উপসর্গ থাকলেও তারা নিজেরাই করোনা বলে ধরে নিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ফোনে পরামর্শ নিয়ে বাসায় বসে চিকিৎসা করাচ্ছে, যা খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার হয়ে উঠছে। এর কিছু পরিণতিও আমরা পাচ্ছি হাসপাতাল থেকে। এখনো যারা মারা যাচ্ছে তারা এভাবে বাসায় বসে নিজেরা বুঝে না বুঝে ও বৈজ্ঞানিকভাবে চিকিৎসা নিতে গিয়ে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে ছুটছে। আর তখন হাসপাতালের চিকিৎসকরা এ ধরনের অনেক রোগীকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে নিরূপায় হয়ে পড়ছে।’

মুশতাক হোসেন আরো বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আছে, নরসিংদীতে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজনের মৃত্যু ঘটেছে, যাদের করোনা টেস্ট নেগেটিভ ফল এলেও তাদের যথেষ্ট উপসর্গ ছিল—এমনকি ফুসফুসে গুরুতর ড্যামেজ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যেহেতু তাদের রেজাল্ট নেগেটিভ আসে তাই তাদের পজিটিভ হিসেবে ধরা হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমাদের আরেক পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, এখন যারা করোনার চিকিৎসা নিচ্ছে বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে কিংবা হাসপাতালে গিয়ে এর বেশির ভাগেরই ১০-১২ দিনের মধ্যে পরীক্ষার রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। কিন্তু তাদের উপসর্গ অনুসারে বিভিন্ন ধরনের করোনাজনিত সমস্যা শরীরে থেকেই যায়। এমন রোগীদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যু ঘটছে। ফলে করোনা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এখন যেভাবে ঢিলেঢালাভাবে চলছে, তা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। বরং সুরক্ষামূলক পদক্ষেপগুলো, বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর আবারও কঠোর নজরদারি করা দরকার।’

আইইডিসিআর পরিচালক ড. শিরীন বলেন, ‘বিভিন্ন দেশেই করোনার নতুন ধরন নিয়েও তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। আমাদের এখানেও যে এমন কিছু ঘটবে না, সেটা আমরা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারি না। ফলে এই সময় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ মানুষ ভাবছে শনাক্ত বন্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, মৃত্যু কমছে আবার দেশে টািকা এসেছে; তাই সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে অনিরাপদভাবে। এই সুযোগে আবারও করোনা যেকোনো মুহূর্তে হামলে পড়তে পারে দ্রুতগতিতে। আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে, সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করা, ঘন ঘন হাত ধোয়া এবং দূরত্ব মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। যারা টিকা নিয়েছে বা নেবে তাদেরও বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে যতক্ষণ না পুরো দেশ পুরোপুরি করোনামুক্ত না হয়।’

প্রায় একই কথা বলেন বিআরআইসিএমের মহাপরিচালক ড. মালা খান। গতকাল তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব কিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, আমাদের দেশে যেন এখন আর করোনা নেই। কিছু সচেতন মানুষ হয়তো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করছে, কিন্তু বেশির ভাগই উদাসীন। এর মধ্যে টিকা আসার পরে আরো যেন গা-ছাড়া ভাব দেখা দিয়েছে মানুষের মধ্যে। এমন পরিস্থিতি কিন্তু আমাদের আবারও বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই আমি বলব, করো নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কোনো অবস্থাতেই যেন ঢিলেঢালা হয়ে না যায়। আমাদের বারবার ইউরোপের দিকে নজর রাখতে হবে। এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘এককথায় বলতে চাই, এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের অনেক কিছুই আমাদের অজানা রয়ে গেছে। তাই আমরা যেন নিজেদের এখনই শতভাগ নিরাপত্তা না ভাবি।’

আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ আইসিডিডিআরবির একজন বিজ্ঞানী বলেন, ‘সরকারের হিসাবের বাইরে বহু মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং সুস্থ হয়েছে। তাদের মধ্যে হয়তো এক ধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে, কিন্তু তাদের কার শরীরে ওই ক্ষমতা কী পর্যায় আছে, তা নিয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। আবার যেহেতু আমাদের দেশে এখন উপসর্গহীন করোনাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেশি তাই তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল থাকার সম্ভাবনা বেশি। ফলে করোনাজয়ীদের শরীরে কত দিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহাল থাকবে, সেটা জানার জন্য পর্যাপ্ত গবেষণার দিকেও সরকারের নজর দেওয়া উচিত। তা না হলে বছরের পর বছরজুড়ে টিকা দিয়েও একদিকে যেমন করোনা কমানো যাবে না, অন্যদিকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া নাও যেতে পারে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা