kalerkantho

শুক্রবার । ২০ ফাল্গুন ১৪২৭। ৫ মার্চ ২০২১। ২০ রজব ১৪৪২

ভিন্নমত

শেয়ারবাজারের যোগসূত্র ভুললে চলবে না

আবু আহমেদ

অনলাইন ডেস্ক   

২৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০৪:০৪ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শেয়ারবাজারের যোগসূত্র ভুললে চলবে না

রিয়েল ইকোনমি বা প্রকৃত অর্থনীতি হচ্ছে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থা। শেয়ারবাজারের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটা কখনো কখনো প্রকৃত অর্থনীতির চেয়ে এগিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার ইকোনমিকে এগিয়ে নেয়। আবার উল্টোটাও হয়। অর্থনীতি খুব এগিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু শেয়ারবাজার পেছনে পড়ে আছে। বাস্তবে প্রকৃত অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। শেয়ারবাজার পরিস্থিতি বোঝার জন্য যোগসূত্রটা  বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রকৃত বিনিয়োগকারী শুধু শেয়ারবাজার সম্পর্কেই জ্ঞান রাখেন না, তিনি দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ও বিনিয়োগযোগ্য কম্পানি এবং এর প্রডাক্ট সম্পর্কেও খোঁজখবর নেন। এর মধ্য দিয়েই তিনি বিবেচনাবোধ অর্জন করেন, যা বিনিয়োগের ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য অপরিহার্য। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ভালো যাচ্ছে। তবে ওই যোগসূত্রটা ভুলে গেলে চলবে না। 

শেয়ারবাজারের ভ্যালুয়েশন নির্ভর করে সামনের দিনগুলো কেমন হতে পারে তার ওপর। বিনিয়োগকারীরা যদি উপলব্ধি করেন সামনে সুদিন আসছে, তাহলে তাঁরা বেশি মূল্যে শেয়ার কিনবেন। কারণ শেয়ারবাজারে আশাবাদ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। একটা কম্পানি সামনে ভালো করবে, এই বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত বেশি মূল্যে এর শেয়ারটা কেনা হয়। কিন্তু যখনই দেখা যায় যে কারণে ভালো করার কথা ভাবা হয়েছিল সেটা আর ঘটছে না, তখন শেয়ারের দাম পড়ে যায়। আবার অর্থনীতির সঙ্গে শেয়ারাবাজার যুক্ত এই অর্থে যে তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোর কম্পানির ইনকাম আসে প্রকৃত অর্থনীতি থেকে। মানে, অর্থনীতিতে ইনভেস্টমেন্ট, প্রডাকশন, কনজাম্পশন—এসব যদি ঊর্ধ্বগতিতে ঘটে, তাহলে তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোর আয় বাড়বে। মানে, প্রকৃত অর্থনীতি যদি চাঙ্গা হয়, তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোর আয়ও বাড়ে। এই জন্য বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত অর্থনীতি, তথা শেযারবাজারের বাইরের অর্থনীতিটা কেমন যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখে এবং এটাই দরকার। যেমন—বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি সাড়ে ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি করে, সেটা শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক বিষয়। আবার প্রবৃদ্ধি যদি হয় ৪ শতাংশ হারে, তাহলে শেয়ারবাজার পিছিয়ে পড়বে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধিটা কী? সেটা হচ্ছে কোনো ইকোনমিতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাজারমূল্য। আর জিডিপি বৃদ্ধির গতিটা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি। এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি যদি বেশি হয়, এর অর্থ হচ্ছে কম্পানিগুলোর আয় বেশি হচ্ছে। আয় বেশি হওয়া মানে কম্পানিগুলোর আর্নিং পার শেয়ার (ইপিএস) বা শেয়ারপ্রতি আয় বাড়বে। একই সঙ্গে ডিভিডেন্ট পে-আউটও (বিনিয়োগকারীদের মুনাফার আকার) বাড়বে। এতে শেয়ারহোল্ডাররা লাভবান হবে। যুক্তিটা হচ্ছে, প্রকৃত অর্থনীতি যদি রমরমা থাকে, তাহলে ধরে নেওয়া যায় সামগ্রিক শেয়ারবাজারেও  তেজিভাব বজায় থাকবে। কিন্তু প্রকৃত অর্থনীতি রুগণ অবস্থায় আছে; কিন্তু শেয়ারবাজার সেটা কোনো পরোয়া করছে না, ওপরের দিকেই যাচ্ছে, তেমন ঊর্ধ্বগতি শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে না। একটা পর্যায়ে তা পড়তে থাকে এবং অনেক লোক তখন শেয়ার কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শেয়ারবাজারের গতি সুদের হারের ওপরও নির্ভর করে। সুদের হার কম থাকলে অর্থ সহজলভ্য হয় এবং ভোগ বেড়ে যায়। ভোগ বাড়লে অর্থনীতি ফের চাঙ্গা হয় এবং এর প্রভাবে শেয়ারের মূল্যও বাড়ে। যারা ঋণ করে শেয়ার কিনে, তারাও কম সুদে ঋণ করতে পারবে। একসময় আমাদের এখানে মার্জিন লোনের সুদ ছিল ১৬ শতাংশের ওপর। এখন প্রজ্ঞাপন জারি করে বিএসইসি ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। যারা এখানে মার্জিন ঋণে শেয়ার কিনতে চায়, তারা কম সুদে কিনতে পারবে। এর অর্থ হচ্ছে বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়বে এবং শেয়ারের মূল্যও বাড়বে। সুদের হার এভাবেই শেয়ারবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আরেকটা বিষয় আছে। এফডিআর, সঞ্চয়পত্র ও বন্ডে যদি সুদের পরিমাণ কম হয়, তাহলে মানুষ মনে করে যে এখানে যেহেতু আয় কম, বিনিয়োগটা এদিক থেকে সরিয়ে শেয়ারবাজারে নিয়ে যাই। সরকারের সঞ্চয়পত্রের সুদহার কিছুটা ভিন্ন হলেও সেটা ইচ্ছামতো কেনা যায় না। ফলে মানুষ অর্থ সঞ্চয়ের দিকে না গিয়ে শেয়ারবাজারে নিয়ে যায় এবং বাজারে অর্থ সরবরাহ বেড়ে যায় এবং শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। যে অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে দেয়, সেখানে মানুষ মনে করে সে ভালো শেয়ার কিনে রাখলেই ভালো করবে। যেটা বাংলাদেশে এখনো ঘটছে। গত সাত মাসে শেয়ারবাজারের সূচক তিন হাজার ৯০০ পয়েন্ট থেকে প্রায় ছয় হাজারে উঠে গেছে। এ সময়ে প্রায় দুই হাজার সূচক বাড়ল, যা ৫০ শতাংশেরও বেশি। শেয়ারবাজারে এই যে বুলস রান ঘটে চলছে, তার পেছনে এই সুদহারও একটা কারণ।

বর্তমানে শেয়ারবাজারের তেজিভাবের আরেকটা কারণ হচ্ছে, বর্তমান সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা কিছু মানুষের মনোজগতে ইতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়েছে। তারা মনে করছে, শেয়ারবাজারে আগের মতো বিপর্যয় ঘটবে না। এখানে একটা সতর্কতাবার্তা দিয়ে রাখতে চাই। সেটা হচ্ছে, প্রত্যাশা থাকা ভালো; কিন্তু এর সীমা থাকা চাই। যদি পুরো মার্কেট ওভার ভ্যালুয়েশন হয়ে যায়, সুনির্দিষ্ট কোনো কম্পানি যদি অতি মূল্যায়িত হয়ে পড়ে, সেটা নিচে আসতে বাধ্য।
শেয়ারবাজারে কনফিডেন্স গড়ে তোলার একটা ব্যাপার আছে। সূচক ছয় হাজারের বেশি থাকলে তা বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

আমাদের সমস্যাটা ভিন্ন। আমাদের মূল সমস্যাটাই হচ্ছে বিনিয়োগযোগ্য  শেয়ারের সংখ্যা কম। আগে শেয়ারবাজার আমাদের অর্থনীতি থেকে পেছনে ছিল। এখন অনেকে বলেন, বর্তমান শেয়ারবাজার মোটামুটি অর্থনীতির সঙ্গে তাল রেখে চলছে। আমিও মোটামুটি একমত। তবে সতর্কতার বিষয়টা হলো বেশি বাড়তে গেলে ক্ষতি আছে। তাই আমাদের এটা এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না, সতর্কতা অবলম্ব করা খুবই প্রয়োজন। বাজারে অনেক কম্পানি আছে, যাদের প্রকৃত অর্থনীতিতে কোনো আয় নেই। তারা ১ শতাংশ ডিভিডেন্টও দিতে পারে না, অথচ তাদের শেয়ারের দাম তিন-চার গুণ বাড়ছে। মনে রাখা দরকার, আমাদের এখানে ৭০ শতাংশ কম্পানিই জাংক স্টক। এই  কোয়ালিটির শেয়ার নিয়ে বেশি দূর এগোনো যাবে না, ঠিকও হবে না। এটা তো ওয়াল স্ট্রিট না কিংবা মুম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের মতোও না। আমরা অনেক পেছনে। আর নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তো খারাপ কম্পানি নেয় না। নিলেও বাদ দিয়ে দেয় পারফরম্যান্স দেখে। আমাদের বাজার কথিত খারাপ কম্পানিতে ভর্তি। এখনো যেসব কম্পানি আইপিওতে আসছে, তাদের অনেকগুলোই সুবিধার না। এই জিনিসটা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাথায় রাখতে হবে।

চারদিক থেকে শুনছি, নতুন বিনিয়োগকারী আসছে, বিশেষ করে জেলা পর্যায় থেকে। ব্রোকার হাউস ভর্তি হচ্ছে এখন। ফলে বাজারে বেশি ফান্ড প্রবেশ করছে এবং শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু শেয়ারের ফান্ডামেন্টালস থেকে দাম যদি বিচ্ছিন্নভাবে বাড়ে, তাহলে সে শেয়ারের দাম ধরে রাখা যায় না। এটাই হলো মৌলিক কথা। শেয়ারের ফান্ডামেন্টাল থেকে বিচ্ছিন্নভাবে মূল্যবৃদ্ধি পেলে শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা অনুযায়ী মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা ঠিক আছে। কিন্তু আমি অনুরোধ করব, বিনিয়োগকারীদের, আপনি যে কম্পানির শেয়ার ক্রয় করছেন সে কম্পানির ভবিষ্যৎ আয় বাড়বে কি না সেটা দেখতে হবে। শেয়ার কেনা সহজ; কিন্তু কম্পানি স্টাডি করা কঠিন। একটি কম্পানির গত ১০ বছরের ইতিহাস কেমন, কখন তালিকাভুক্ত হলো, তারপর পারফরম্যান্স কেমন, এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, ম্যানেজমেন্ট কোয়ালিটি কেমন—এসব জেনে বিনিয়োগকারীকে শেয়ারবাজারে আসা উচিত। ওয়ারেন্ট বাফেট একটা কথা বলেছেন, ঝুঁকিটা আসে তখনই, যখন বিনিয়োগকারী যা করছেন সেটা সম্পর্কে তিনি নিজেও জানেন না। অর্থাৎ না জানাটাই আসল ঝুঁকি। আমাদের এখানে না জেনেই একটা শ্রেণি শেয়ারবাজারে চলে আসে।

সব শেষে বলব, শেয়ারবাজারের হাল-হকিকত বুঝতে হলে দেশের প্রকৃত অর্থনীতির সঙ্গে শেয়ারবাজারের যোগসূত্র খুঁজতে হবে। এই মুহূর্তে শেয়ারবাজার নিয়ে সবাই খুশি আছে। এটা ঠিক আছে। কিন্তু কিছু ভালো কম্পানি লিস্টিংয়ে আনাটাই হবে সিকিউরিটিজ কমিশনের বড় অর্জন। মন্দ কম্পানি নিয়ে খেলাধুলা চলে। জুয়া খেলা চলে। আর জুয়া খেলতে চাইলে কেউ জিতবে, কেউ হারবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ভালো কম্পানির বিকল্প নেই। আমাদের শেয়ারবাজারের ৯০ শতাংশ হচ্ছে ডে ট্রেডার, যারা তিন-চার দিন পর পর শেয়ার বেচাকেনা করে। মূলত ভালো কম্পানির অভাবেই বেশির ভাগ কথিত বিনিয়োগকারী ডে ট্রেডিং করে। ডে ট্রেডিং করে খুব বেশি লাভ হয় তা-ও নয়; কিন্তু তারা যেহেতু শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারী, কিছু একটা করতে হবে বলে তারা এটা করে। বিদেশেও ডে ট্রেডিং আছে। তবে পরিমাণে এত না। প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা গ্যাম্বলিং করে না। সুতরাং প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ভালো কম্পানি বাজারে নিয়ে আসতে হবে এবং শুধু সূচকের উন্নতির দিকে না তাকিয়ে বাজারের টেকসই উন্নতির দিকে চোখ রাখতে হবে। 

 


লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা