kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

চট্টগ্রাম সিটির ফল বিশ্লেষণ

ঘরোয়া দ্রোহে ভোট নামল অর্ধেকে

ভোট পড়েছে মাত্র ২২.৪৯ শতাংশ

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম    

২৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:০৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঘরোয়া দ্রোহে ভোট নামল অর্ধেকে

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) এবারই প্রথম সব কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে ভোট হয়েছে। কিন্তু দিন শেষে ভোট পড়েছে মাত্র ২২.৪৯ শতাংশ, যা ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে কাস্ট হওয়া ভোটের অর্ধেকের চেয়েও কম। সেবার মোট ভোট পড়েছিল আট লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৩টি, যা মোট ভোটের ৪৭.৯ শতাংশ। কিন্তু ছয় বছরের ব্যবধানে এবারের নির্বাচনে ভোটার বাড়লেও ভোট পড়েছে মাত্র চার লাখ ৩৫ হাজার ৪৯০টি, যদিও এবারের নির্বাচনে ভোটার ছিল ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন।

৩৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে ৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডের ৩৫টি কেন্দ্রে ভোট পড়ে মাত্র ৯.৩৪ শতাংশ। এই ওয়ার্ডের ৮৭ হাজার ৭৬৪ ভোটের মধ্যে কাস্ট হয়েছে মোটে আট হাজার ১৯৭ ভোট। এর মধ্যে ১৮১ নম্বর টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার মহিলা ভোটকেন্দ্রে মাত্র ২.৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই কেন্দ্রের এক হাজার ৮৪৫ ভোটারের মধ্যে মাত্র ৪৮ জন কেন্দ্রে এসে ভোট দিয়েছেন।

স্বার্থপর কাউন্সিলর : কম ভোট পড়ার কারণ হিসেবে নির্বাচন কমিশন করোনাভাইরাস আতঙ্ককে সামনে আনলেও ওয়ার্ডভিত্তিক ফলে ভিন্ন ছবি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে যেসব ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের শক্ত বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল সেসব ওয়ার্ডে কম পড়েছে ভোট। নির্বাচনের দিন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হাতে গোনা কয়েকটি ওয়ার্ড ছাড়া কোনোটিতেই বিএনপি কর্মীদের দেখা যায়নি। সকাল থেকেই কেন্দ্র দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন মূলত সরকারদলীয় ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা।

কেন্দ্রের দখল যে প্রার্থী নিতে পেরেছেন, ভোটার নৌকার সমর্থক হলেও কাউন্সিলর পদে বিপরীত ঘরানার হলেই তাঁদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। চসিকের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে কথা হয় রণজিৎ কুমার নামের এক ভোটারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি মেয়র পদে নৌকা প্রতীকে ভোট দিব, এটা জেনেও আমাকে কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়নি আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলরের লোকজন। তাদের ধারণা, কাউন্সিলর পদে আমি বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দিব। কাউন্সিলরের নিজের স্বার্থের জন্য নৌকার ভোটকেও তারা জলাঞ্জলি দিচ্ছে।’ দখল পাল্টা দখল হওয়া সব কেন্দ্রেই এমন চেহারায় দেখা গেছে। আজীবন নৌকার রাজনীতি করে আসা অনেককেই কেন্দ্রে ঢুকতে না পেরে আক্ষেপ করতে দেখা গেছে।

এ কারণেই বিদ্রোহী থাকা ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৯.৩৪ শতাংশ, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে ১১.৫ শতাংশ, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ১৩.২৩ শতাংশ, ১১ নম্বর ওয়ার্ডে ১৫ শতাংশ, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ১৬.১৪ শতাংশ, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ১৯.৪৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।

সকাল ৮টায় ভোটগ্রণের শুরুতেই প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারদের লম্বা লাইন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রের আশপাশে ভোটারদের দেখা গেলেও কেন্দ্রের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়। মেশিনে আঙুলের ছাপ মেলানোর পর যখন গোপন কক্ষে গিয়ে একজনের ভোট কাউন্সিলরের সমর্থকরা দিয়ে দিচ্ছেন, তা চাউর হওয়ার পর ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ভোট কম পড়ার এটাও একটি কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

রামপুর ওয়ার্ডে ৮০ শতাংশ ভোট : নির্বাচনে সর্বসাকুল্যে যেখানে ভোট পড়েছে ২২.৪৯ শতাংশ, সেখানে ২৫ নম্বর রামপুর ওয়ার্ডে ভোট পড়েছে ৮০ শতাংশ! এই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আব্দুস সবুর লিটন ৩০ হাজার ৮১০ ভোট পেয়ে বিএনপি সমর্থিত শহীদ মোহাম্মদ চৌধুরীকে (দুই হাজার ১৮৯ ভোট) বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এই ওয়ার্ডের আওতাধীন সংরক্ষিত ওয়ার্ডের অন্য দুই ওয়ার্ড ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলীতে ১৫ শতাংশ এবং ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডে ৩২ শতাংশ ভোট পড়ে।

রামপুর ওয়ার্ডে অস্বাভাবিক ভোটের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ভয়ংকর জালিয়াতি আর অনিয়মের চিত্র পাওয়া যায়। ভোটারসংখ্যা বাড়াতে প্রিসাইডিং অফিসারকে মারধরের তথ্যও মিলেছে। রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া ফল বিবরণীতে দেখা যায়, এই ওয়ার্ডের অনেক কেন্দ্রে ৯০ শতাংশের ওপরে ভোট পড়েছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভোটগ্রহণের সময় শেষ হওয়ার পর প্রকৃত ফল পাল্টে দেওয়ার জন্য এই ওয়ার্ডের সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসারদের ওপর চাপ দেয় কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুস সবুর লিটন। ডিউ পয়েন্ট স্কুল কেন্দ্রে দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসার ফল জালিয়াতিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে লিটন নিজেই শারীরিকভাবে নাজেহাল করেছে বলে অভিযোগ আছে।

অন্য ওয়ার্ডের কেন্দ্রগুলোর ফল বিবরণীর সঙ্গে ইভিএমের প্রিন্ট কপি দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের ফলের সঙ্গে ইভিএম প্রিন্টের কপি সংযুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

রামপুর ওয়ার্ডে অস্বাভাবিক ভোটের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একেক ওয়ার্ডে একেক রকম ভোট হতেই পারে। চট্টগ্রামে অনেক এলাকা শ্রমিক অধ্যুষিত, সেখানে ভোটের তারতম্য হবে। এর পরও যদি কোনো কিছু দৃষ্টিকটু হয় আমরা অবশ্যই খতিয়ে দেখব।’

জামানত হারিয়েছেন বিএনপির শাহাদাত : নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনে গৃহীত ভোটের এক-অষ্টমাংশের কম ভোট পেলে প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। সেই হিসাবে মোট গৃহীত ভোট চার লাখ ৩৫ হাজার ৪৯০ ভোটের মধ্যে জামানত ধরে রাখতে হলে কমপক্ষে ৫৪ হাজার ৪৩৭টি ভোট পেতে হবে মেয়র প্রার্থীদের। কিন্তু বিএনপির মেয়র প্রার্থী পেয়েছেন ৫২ হাজার ৪৮৯টি। এ ছাড়া মেয়র পদে নির্বাচন করা অন্য প্রার্থীদের মধ্যে মোমবাতি প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এম এ মতিন দুই হাজার ১২৬ ভোট, আম প্রতীক নিয়ে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) আবুল মনজুর চার হাজার ৬৫৩ ভোট, হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জান্নাতুল ইসলাম চার হাজার ৯৮০ ভোট, চেয়ার প্রতীক নিয়ে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ এক হাজার ১০৯ ভোট এবং হাতি প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে খোকন চৌধুরী ৮৮৫ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা