kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ৯ মার্চ ২০২১। ২৪ রজব ১৪৪২

টিকা যদি টাকা হতো!

মোস্তফা মামুন   

২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০৪:০৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



টিকা যদি টাকা হতো!

তখনকার আমলে স্কুলে বেতের ভয়ের পাশাপাশি মজাও ছিল বেশ। কোনো কোনো দিন দেখা যেত চলে এসেছে ম্যাজিকের দল। সবাইকে ম্যাজিক দেখাবে। কখনো আসত বিস্কুটের টিন বা দুধ। তখনকার সমাজ বাস্তবতায় বিস্কুট খাওয়া বা দুধ পান করা সব পরিবারে সম্ভব ছিল না। দুধ-বিস্কুটের আশা স্কুলমুখিতা তৈরি করত। উটের মাংস যে খাওয়া যায় সেটাও স্কুলে মাংস বিতরণের মাধ্যমেই জেনেছিলাম। কোরবানির পর সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে স্কুলে চলে আসত মাংসের স্তূপ। কাজেই স্কুল একটা মজার জায়গা—বিরাট আকারের বেত এবং শিক্ষকদের গর্জন সত্ত্বেও।

সমস্যা ছিল একটাই। মাঝেমধ্যে টিকার লোক চলে আসতেন। সুঁই-সিরিঞ্জ নিয়ে ওঁরা হাজির। সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের গেট বন্ধ করে দেওয়া হতো। টিকার লোক এলেই লাফঝাঁপ শুরু হয় বলে পরে সতর্ক হয়ে ওঁরা আসতেন একরকম ছদ্মবেশে। প্রথমে নানা গল্পটল্প বলতেন। একপর্যায়ে একটা গল্প শুরু হতো, রাজা-রানির সুখে বাস করার কাহিনি, যার শেষে শোনা যেত রানির অসুখ করেছে, টিকা নিতে হবে, রানি ভয় পাচ্ছেন, সবাই মিলে রাজি করান, তারপর টিকা নিয়ে রানি নাচতে নাচতে বলেন, ‘কী মজা, কী মজা।’ ওদিকে নাচের ফাঁকেই তাঁর অসুখ হাওয়া। এমন গল্পেও খুব লাভ হতো না। কয়েকজন ঠিকই জানালা দিয়ে পালাত। কারো কারো পালানোর গতির স্মৃতি মনে এলে এ-ও মনে হয়, যদি ওদের সেই দৌড়টার টাইমিং হিসাব করা হতো তাহলে বোল্টের রেকর্ড হয়তো সেই ২৫-৩০ বছর আগে বাংলাদেশেই হয়ে যায়। যা হোক, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা হিসেবে একবার টিকার লোক আসার সঙ্গে সঙ্গেই টিচার ঘোষণা করলেন, পেছনের জানালা বন্ধ। জানালা বন্ধ করতে পাঠানো হলো ক্লাসের সবচেয়ে বাধ্য ছাত্রকে। সে গেল। তারপর জানালা দিয়ে নিজেই এমন দৌড় যে টিচারের মুখে কুমিরের হাঁ। স্যারদের প্রিয় ছাত্রেরই যখন এই অবস্থা, তখন অপ্রিয়রা এই কাজ করবেই। করতও।

যা হোক, সেসব পুরনো দিন গেছে। এখন বোধ হয় আর স্কুলে ওসব ব্যাপার নেই। টিকাদান ব্যবস্থা অনেক সমন্বিত ও সম্প্রসারিত। এর সুবিধা বোঝানো গেছে। ভীতিও কমানো গেছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও টিকা নিতে খুব আপত্তি নেই। আর তাই ভেবেছিলাম, টিকার ভয়ে পালানোর দিন বোধ হয় গেছে। কিন্তু পৃথিবীতে কোনো কিছুই পুরোপুরি যায় না। শিক্ষাটা আবার পেলাম। করোনার ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে পেছনের দরজা খোঁজার মানুষ এত বেশি দেখছি যে মাঝেমধ্যে মনে হয়, স্কুলের সেই বেতওয়ালা শিক্ষকদের পুনরাবির্ভাবের বোধ হয় দরকার হবে।

বাংলাদেশে করোনা বিষয়ে অদ্ভুত কিছু সামাজিক প্রবণতা খেয়াল করলাম। প্রথমে যখন করোনা ধরা পড়ছিল না, তখন অনেকেরই মন খারাপ যেন। তাদের একজনের সঙ্গে আলাপ হলো একদিন। ‘দেশে করোনা আসেনি—এটা তো ভালো ব্যাপার। আপনি এত হা-হুতাশ করছেন কেন?’

‘করোনা আসেনি মানে! এসে খেয়েদেয়ে ঘুমাচ্ছে।’

‘তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি না কেন?’

‘সরকার দেখতে দিচ্ছে না। লুকিয়ে রেখেছে। মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান শেষ হলেই ঘোষণা দেবে।’

‘তাই নাকি?’

‘আমার কাছে পাকা খবর আছে, কয়েক হাজার করোনা রোগীকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।’

পাগলের প্রলাপ মনে হলো। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম, এ রকম পাগলের সংখ্যা কম নয়। তাদের ধারণা হলো সরকার করোনা লুকাচ্ছে।

তারপর করোনা প্রকাশিত হলো, মুজিববর্ষও বাতিল হলো। তবু সেই সব মানুষ খুশি নন। লকডাউন দিতে দেরি হওয়ায় তাঁরা খেপে যান। দিলে আবার বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য সব শেষ। আমাদের তো আমেরিকা-ইউরোপের মতো রাজত্ব নেই।’

করোনা আমাদের অনেক কিছু চিনিয়েছে। এমনিতে আমরা অবশ্য নিজেদের কাছে চেনাই। পরস্পরবিরোধিতা ও সরকারবিরোধিতাই আমাদের মূল সামাজিক নীতি। তবু এই চেনা চেহারারও এমন সব ছবি বেরিয়েছে যে আশ্চর্য হয়ে গেছি। আমাদেরকে খুব ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করে ফেসবুকে ভেসে বেড়ানো এই বাণীটা, ‘করোনা আমেরিকায় হলে আল্লার গজব। সৌদি আরবে হলে ঈমানি পরীক্ষা। আর বাংলাদেশে হলে সরকারের ব্যর্থতা।’ বাংলাদেশি চরিত্রের এমন চমৎকার চিত্রণ বোধ হয় আহমদ ছফাও করতে পারেননি।

টিকার ক্ষেত্রেও সেই পরস্পরবিরোধিতা আর সরকারবিরোধিতার নীতি। ‘টিকা আসছে না, সরকার পারছে না, ভারতের সঙ্গে এমন সম্পর্ক থেকে কী লাভ?’ কত প্রশ্ন। ভারতের কোন কাগজে সেরামের কোন লোকের কী মন্তব্য বেরিয়েছে, ব্রাজিল টিকা নিয়ে চলে যাচ্ছে—এসব আওয়াজে সরকারের যায় যায় অবস্থা। টিকা এলো। হিসাবের চেয়েও বেশি। ভেবেছিলাম, এই ৭০ লাখ আসার পর কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে। কিন্তু হায়...। অথচ আমরা সবাই জানি টিকা ছাড়া এই মহামারি থেকে মুক্তি নেই। সেই স্বচ্ছন্দ জীবনে ফিরতে সবারই টিকা নিতে হবে।

একটা কাজ অবশ্য টিকা আসাতেই হয়ে গেল। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি দুই দলের গত ৪০ বছরের মারামারি দেখে আমরা কি কল্পনা করতে পেরেছিলাম—এমন দিন আসবে যে ওরা একে অন্যের জন্য ভালোবাসা দেখাবে! রিজভী বলছেন, আওয়ামী লীগের ভিআইপিদের আগে টিকা দেওয়া হোক। আওয়ামী লীগ বলছে, বিএনপি চাইলে আগে ওদের টিকা দেওয়া হবে। দুই দলের মধ্যে যে অন্যের প্রতি ভালোবাসার রেশ আজও রয়ে গেছে করোনার টিকা না এলে আমরা জানতাম? একেক সময় মনে হয় করোনা দূর করতে পারুক-না পারুক, করোনার টিকা এর চেয়েও বড় কাজ এরই মধ্যে করে ফেলেছে।

তাহলে যে আমরা শুনছি নরওয়েতে অনেক লোক মারা গেছে, অন্যান্য জায়গায়ও অনেকের নানা সমস্যা হয়েছে! এই টিকার ওপর ভরসা রাখি কী করে? অনেকের প্রশ্ন। কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর মিথ্যা নয়। সব টিকায়ই এমন অল্পবিস্তর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু এই টিকার কারণে মৃত্যু হয়েছে—এমন কিছু কোথাও প্রমাণিত হয়নি। সমস্যা হলো এই খবরগুলো আমরা দেখছি এবং বিশ্বাস করছি, কিন্তু খেয়াল করছি না যে আরো লাখ লাখ মানুষ নির্বিঘ্নে টিকা দিয়ে যাচ্ছে। আর এই জায়গায় সরকারের দায়। সঠিক প্রচার নেই বলেই অপপ্রচার এমন ডানা মেলছে। এর আগে করোনার শুরুতে লেজে-গোবরে করে ফেলা, স্বাস্থ্য বিভাগের বিস্ময়কর সমন্বয়হীনতা, শাহেদ-সাবরিনা কাণ্ড মিলিয়ে ওদের গ্রহণযোগ্যতা এমনই প্রশ্নবিদ্ধ যে মানুষের অবিশ্বাসের যথেষ্ট কারণ আছে। আচ্ছা, টিকা আসার পর সাত দিনই বা বসে থাকা কেন? এটা যে জরুরি, জীবন-মরণের প্রশ্ন—সেসব ভুলে সেই আয়োজন-উদ্বোধন নিয়েই ব্যস্ততা। সঠিক ব্যবস্থাপনার বদলে বেঠিক আমলাতান্ত্রিকতা। এই সুযোগটাই নিচ্ছেন উদ্দেশ্যবাদী রাজনীতিকরা। অপপ্রচারমুখী বুদ্ধিজীবীরা। দায় তাই আমার, আমাদের, ধ্বংসাত্মক রাজনীতির এবং অবশ্যই স্বাস্থ্য বিভাগের।

আমরা সবাই যার যার জায়গায় ব্যর্থ বলেই টিকা এসে যাওয়ার পরও সাজ সাজ রবের বদলে সংশয়, ফিসফাস। সবাই বিনয়ী এবং ত্যাগী সেজে বলছে, ‘আপ পেহেলে’।

‘আপ পেহেলে’র একটা কাহিনি শুনুন। দুই বন্ধু গল্প করছে। একজন বলল, ‘আমি ইউরোপে গিয়ে দেখলাম, ওখানে সব বাস খালি যাচ্ছে। একজন আরেকজনকে ‘আপ পেহেলে’ বা আপনি আগে যান বলে তাঁকে আগে উঠতে বলছে; কিন্তু এত ভদ্র যে কেউই আগে উঠতে চাচ্ছে না। ফলে বাস-ট্রেন সব খালি চলছে।’

চালবাজ দ্বিতীয় বন্ধু বলল, ‘আমি আমেরিকায় গিয়ে দেখলাম অন্য ব্যাপার। ওখানে দুটো বাচ্চা জন্মেছে ৫০ বছর বয়সে।’

‘বলো কী? কিভাবে?’

‘যমজ। একজন আরেকজনকে ‘আপ পেহেলে’ বলে কেউ আর মায়ের পেট থেকে আগে বেরোতে চায় না। ৫০ বছর ভদ্রতা শেষে ওদের মনে হলো মৃত্যুর সময় এসে যাচ্ছে। কাজেই বেরোনো দরকার। লটারি করে শেষে...’

কে জানে, আমাদের টিকার ক্ষেত্রে এ রকম কাণ্ড হয়ে যায় কি না! করোনায় হাসপাতালে মানুষ মরছে। সরকার আর স্বাস্থ্য বিভাগকে গালাগালি চলছে। কিন্তু ওদিকে লাখ লাখ টিকা পড়ে আছে...

লেখাটা শেষ করে এনেছি এই সময় লেখার বিষয় শুনে এক বন্ধু বলল, ‘তোমার মনে আছে, ইমরান খান একবার এসেছিল টিকা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে।’

‘মনে আছে।’

‘‘তো ইমরান ‘আপনার শিশুকে টিকা দিন’ কথাটা বলতে গিয়ে টিকা উচ্চারণ করতে পারছিল না। বারবার বলছিল ‘টাকা দিন’। শেষে ডাবিং-টাবিং করে বিজ্ঞাপনটা ঠিক করা হয়।’’

‘এর সঙ্গে এখনকার সময়ের সম্পর্ক কী?’

‘‘ধরো, প্রচারণায় বলা হলো, ‘দলে দলে আসুন। নিরাপদে টাকা নিন।’ তাহলেই দেখবে ভিড় তৈরি হয়ে যাবে। তখন...’’

হাসির কথা। হাসলাম না। এমন গুরুতর বিষয় নিয়ে হাসা যায় না।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা