kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭। ৪ মার্চ ২০২১। ১৯ রজব ১৪৪২

শুভ সূচনা হলো টিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক    

২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:৪৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শুভ সূচনা হলো টিকার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল গণভবন থেকে টিকা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। দেশে প্রথম টিকা গ্রহণ করেন কুর্মিটোলা হাসপাতালের সিনিয়র নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তা। ছবি : পিআইডি

২৬ জনের শরীরে টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে গতকাল বুধবার দেশে করোনা মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে। গতকাল বিকেল পৌনে ৪টায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তা প্রথম টিকা নেন। এর কিছুক্ষণ আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই টিকাদান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। রুনুর পর প্রধানমন্ত্রীর সামনে আরো চারজন টিকা নেন। তাঁরা হলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম ইমরান হামিদ, কুর্মিটোলা হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ লুত্ফুল মবিন ও ট্রাফিক পুলিশের সদস্য দিদারুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গেই টিকা নেওয়ার সময় কথা বলেন এবং উৎসাহ ও সাহস জোগান।

উদ্বোধনী পর্বের পরে আরো ২১ জনকে টিকা দেওয়া হয়। গতকাল উদ্বোধনী দিনে টিকা দেওয়ার জন্য মোট ৩২ জনের নাম তালিকায় থাকলেও উপস্থিত ছিলেন ২৭ জন। এর মধ্যে সংসদ সদস্য হাফিজ আহমেদ মজুমদার শারীরিক কারণে টিকা নিতে পারেননি। যাঁরা টিকা নিয়েছেন, গত রাতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাঁরা সবাই ভালো, সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। কারো মধ্যেই কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কুর্মিটোলা প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক, সংসদ সদস্য হাফিজ আহমদ মজুমদার, সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খান, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল মান্নান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা।

অনুষ্ঠানস্থলে সরকারি সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোনো বেসরকারি সংবাদমাধ্যম রাখা হয়নি। যদিও বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলে এবং অনলাইনে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানের পরপরই উন্মুক্ত করা হয় টিকা নেওয়ার জন্য সরকারের তৈরি সুরক্ষা নিবন্ধন অ্যাপ।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাস এসে যেন বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছিল। কি ধনী কি গরিব, কাউকে বাদ দিল না। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, চলাফেরা সবই যেন থেমে যায়। মানুষের কাজকর্ম সব বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রণোদনা দিয়েছি। আরো কী করা যায় সে জন্য কাজ করছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের কাছে খবর আসে টিকার উদ্যোগের। আমরা সব জায়গায় চিঠি পাঠিয়ে খোঁজখবর নিতে চাই। এই পর্যায়েই আমরা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যোগাযোগ করি। দেশীয় প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো আমার সঙ্গে যোগোযোগ করে, আমি তাদেরকে বলি—যত দ্রুত সম্ভব টিকা আনার জন্য চেষ্টা করো। আমরা এ জন্য ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করি। অর্থ মন্ত্রণালয়কে অর্থ বরাদ্দের জন্য বলি। যত টাকা লাগে দিতে বলি। কারণ  দেশের মানুষকে সুরক্ষা দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা খুব দ্রুততার সঙ্গে নার্স, ডাক্তার, টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিয়েছি। সবাইকে প্রণোদনা দিয়েছি। করোনা মোকাবেলায় যারা কাজ করেছে তাদেরকেও প্রণোদনা দিয়েছি। সেই সময় যারা কাজ করেছে সেই ডাক্তার, নার্স, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন, নৌবাহিনী, বিজিবি, আনসারের সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনও মানুষের পাশে দাঁড়ায়।’

শেখ হাসিনা বলেন, ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় যে টিকা এনেছি তা দেওয়া শুরু হচ্ছে। আরো তিন কোটি টিকা আসবে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে সব ভালো কাজের সময়ই কিছু নেতিবাচক মত প্রকাশের লোক থাকে, হয়তো তাদের কাছ থেকে মানুষ কোনো সহযোগিতা পায় না। কিন্তু কোনো কাজ করতে গেলে তারা মানুষের মনে বিরূপ মনোভাব তৈরির জন্য সমালোচনা করতে থাকে, মানুষের মনে ভয়ভীতি ঢুকিয়ে দেয়। কিছুই তাদের ভালো লাগে না। এ জন্য (এই রোগের) কোনো ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে কি না সেটাও আমি জানি না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই যে ‘কিছুই ভালো লাগে না’ এটা একটা রোগ, যা আপনারা পত্রিকা খুললেই দেখতে পাবেন। সব কিছুর মধ্যেই তারা দোষ খুঁজবে। নানা প্রশ্ন তাদের। তাদেরকেও ভ্যাকসিন দিয়ে দেব, যাতে তারা সুস্থ থাকে। তারা সুস্থ না থাকলে আমাদেরকে সমালোচনা করবে কে! তাই তাদেরকে সাধুবাদ দিতে চাই। তারা যত বেশি সমালোচনা করেছে, আমরা তত বেশি কাজ করার প্রেরণা পেয়েছি। তাই যাদের কিছুই ভালো লাগে না রোগ আছে, অযথা মানুষকে ভয় দেখায়, তাদেরও টিকা দেব।” তিনি বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় সারা দেশে ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ জন্য টাকা খরচে আমরা কোনো কার্পণ্য করিনি। আমাদের চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি।’

বিশ্ব থেকে করোনাভাইরাসমুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী সবার কাছে দোয়া কামনা করেন। একই সঙ্গে যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে সব কিছু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতামত অনুসারেই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার খুব ইচ্ছা ছিল, নিজে সশরীরে থেকেই এই ভ্যাকসিন কার্যক্রমের উদ্বোধন করব। কিন্তু করোনার কারণেই আমি অনেকটা বন্দিদশায় আছি।’

অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক হাসপাতাল ভবনের বাইরে এসে অপেক্ষমাণ বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ব্রিফ করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে বহু প্রত্যাশিত করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। শুরুতে একজন নার্সসহ পাঁচজন টিকা দিয়েছেন। প্রথম দিনের তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, পর্যায়ক্রমে বাকিদের টিকাদান চলছে। বৃহস্পতিবার ঢাকার পাঁচটি হাসপাতালে প্রায় ৫০০ স্বাস্থ্যকর্মীকে টিকা দেওয়া হবে। ৭ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে সবার জন্য টিকাদান শুরু হবে।’

‘আপনারা কবে টিকা নিচ্ছেন’—সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি টিকা নেব বলে আশা করছি। অন্যদের দেওয়ার আগে আমরা নিলে বিষয়টি ভালো দেখায় না।’ তিনি বলেন, ‘যাঁরা টিকা দিয়েছেন তাঁদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তাঁরা সবাই ভালো আছেন ও স্বাভাবিক আছেন। কারো কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।’

গতকাল উদ্বোধনী পর্বের পাঁচজনের পর আর যাঁরা টিকা নিয়েছেন তাঁরা হলেন সামরিক চিকিৎসা সার্ভিস মহাপরিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহাবুবুর রহমান, চিকিৎসাবিদ অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী, কুর্মিটোলা হাসপাতালের ডা. আল মামুন শাহরিয়ার সরকার, ডা. ফরিদা ইয়াসমিন, ডা. আফরোজা জাহিন, অধ্যাপক ডা. আব্দুল কাদের খান, একটি অনলাইনের সাংবাদিক মাসুদ রায়হান পলাশ, আল মাসুম মোল্লা ও আমিরুল মোমেনিন, অন্যান্য পেশার মো. মাজেদুল ইসলাম, সানজিদা সুলতানা, আব্দুল হালিম, মো. এনামুল হক, মো. হামজা, সাম্মী আক্তার, কাজী জসিম উদ্দিন, আব্দুর রহিম, মোশারফ হোসেন, মুন্নী খাতুন, আশিফুল ইসলাম ও দেওয়ান হেমায়েত হোসেন।

কিছু টেরই পেলাম না

টিকা দেওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যেই কুর্মিটোলা হাসপাতাল ভবনের বাইরে বেরিয়ে এসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘আমি তো কিছু টেরই পেলাম না। সুচ এতই সূক্ষ্ম যে কোনো ব্যথা লাগেনি। এখন পর্যন্ত ভালো আছি, একেবারেই স্বাভাবিক আছি। এই টিকা নিতে কারো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সবাইকে অনুরোধ করব টিকা নেওয়ার জন্য।’ এর পরপরই বেরিয়ে আসেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও লেখক অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী। তিনিও অধ্যাপক নাসিমা সুলতানার কথাই যেন পুনর্ব্যক্ত করেন উচ্ছ্বাসের সঙ্গে।

প্রথম টিকা নেওয়া রুনু ভেরোনিকাও ভালোই আছেন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি বিভিন্নজনের সঙ্গে সেলফি তুলতে তুলতে বলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই, ভালোই তো আছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা