kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

সম্পর্কের নতুন অধ্যায় ভ্যাকসিন মৈত্রী

জয়ন্ত ঘোষাল   

২৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৩৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সম্পর্কের নতুন অধ্যায় ভ্যাকসিন মৈত্রী

এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমান যখন ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল, তখন শুধু সেটি একটি বিমানের নিছক অবতরণ নয়, এই বিমান অবতরণটি করোনা কূটনীতির, প্রতিষেধক কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় সূচিত করল। এই বিমানে এসে পৌঁছল ২০ লাখ ডোজ টিকা। অনেক আগে থেকেই ভারত এই টিকা দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি ভারত পূরণ করল। আগামী দিনেও ভারত আরো প্রতিষেধক পাঠানোর ব্যাপারে সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে। ঢাকায় এই প্রতিষেধক পৌঁছানোর পরপরই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সম্পর্ককে তাঁর দেশ যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, করোনাভাইরাসের টিকা প্রদান, সেই গুরুত্ব এবং সম্পর্কের মাত্রাকে বহন করছে। এটা তার পরিচায়ক। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। তার কারণ এই মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হচ্ছে। সম্পর্কের এই অধ্যায়ের ভিত্তি ভূমি হলো ভ্যাকসিন মৈত্রী বা প্রতিষেধক মৈত্রী। এই মৈত্রী ভারতের জন্যও এক প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার। তার কারণ একদিক থেকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মোক্ষম বাণী—প্রতিবেশীই প্রথম। অর্থাৎ ‘নেইবারস ফার্স্ট’ পলিসি।

আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্ব কম দেওয়ার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠছিল। আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় বেশি ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রমুখী পররাষ্ট্রনীতির প্রতি নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছিল। এখন আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আবার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ পরিসর বহন করে। অতীতেও আমি এ রকম কথা লিখেছি। বারবার বলছি, বাংলাদেশের জিও স্ট্র্যাটেজিক পজিশনের একটা গুরুত্ব রয়েছে। তার কারণ কূটনীতিতে যে মৈত্রী, সেই মৈত্রীতে যেমন আবেগের উপাদান থাকে এবং তা নিশ্চয় থাকবে। শুধু ভারতের কেন, এটা গোটা পৃথিবীর রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সেখানে আবেগ জড়িয়ে থাকে। এই রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আবেগ কাজ করে। বলা হয় পলিটিক্যাল ইমোশন। এই পলিটিক্যাল ইমোশন নিয়ে পৃথিবীর তাবড় তাবড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তাবড় তাবড় গবেষক রাজনৈতিক আবেগ নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেন। এই আবেগের পাশাপাশি একটা যুক্তিবাদী বস্তুনিষ্ঠ দিক আছে। মনে রাখতে হবে, ভারত প্রতিষেধক উৎপাদনের ক্ষেত্রেও খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করছে। এটাকে ক্ষুদ্র রাজনীতি, সংকীর্ণ রাজনীতি, দলীয় রাজনীতির নিরিখে দেখলে চলবে না। বিজেপি-কংগ্রেসের ভারতীয় রাজনীতির মেরুকরণের প্রিজমে দেখলেও চলবে না। এখানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিষেধক উৎপাদনের জায়গাটাকে গুরুত্ব দেওয়া মানে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের গুরুত্ব দেওয়া। আজ গোটা পৃথিবীতে শতকরা ৬০ ভাগ প্রতিষেধক ভারত থেকে উৎপাদন হয়ে যাচ্ছে। এটা কিছু কম কথা নয়। এটা শ্লাঘার বিষয়। তার মধ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র যেমন আছে, তেমনি আবার অন্যান্য বেশ কিছু রাষ্ট্রে ভারত প্রতিষেধক পাঠাচ্ছে। যেখানে যেমন প্রয়োজন হচ্ছে। পাকিস্তান ও ইরান ভারতের কাছ থেকে প্রতিষেধক চায়নি। সুতরাং পাকিস্তান ও ইরানকে ভারত প্রতিষেধক পাঠাচ্ছে না। মনে করা হচ্ছে পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে, হয়তো ইরানও চীনের কাছ থেকে প্রতিষেধক নেবে। কিন্তু ভারতের যে প্রতিষেধক পাঠানোর কূটনীতি, সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে আবেগের পটভূমি আছে। সেটা যেমন সত্য, তেমন এই প্রতিষেধক কূটনীতির মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রতিষেধক পাঠানোর মাধ্যমে এই মুহূর্তে চীনের করোনা প্রতিষেধক কূটনীতিরও মোকাবেলা করা হচ্ছে। চীন-পাকিস্তান অক্ষ, যেটা নিরাপত্তার দিক থেকে নিশ্চয় একটা জটিল এবং কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর বাইডেনের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি চীন ও পাকিস্তান সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে কতটা থাকবে, কতটা থাকবে না এখনো পর্যন্ত খুব স্পষ্ট নয়। নিশ্চয় তারা ভারসাম্য বজায় রাখবে। ট্রাম্পের মতো বাইডেন নিশ্চয় ব্যক্তিগতভাবে পাকিস্তানবিরোধী হবেন না। এমন মনে করা হচ্ছে পাকিস্তানকে যে অর্থ সাহায্য বা প্রতিষেধকের সাহায্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে, সেগুলো বাইডেনের নেতৃত্বে আবার চালু হতে পারে। চীনের সঙ্গে বাইডেন সংঘাতের পথে না গিয়ে ট্রাম্প যেটা করেছিলেন, আবার একটা আলোচনার পথে যেতে পারেন—এমনটাও মনে করা হচ্ছে। যেমনটা একসময় ওবামাও তাঁর চীন সফরের মাধ্যমে চেষ্টা করেছিলেন।

এ রকম একটা পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পটভূমিতে বাংলাদেশকে আমাদের কতটা প্রয়োজন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং সেদিক থেকে ভারত প্রথম যখন করোনা প্রতিষেধক পাঠানোর কাজ শুরু করল, তখন প্রথমে মালদ্বীপে পাঠানো হয়েছে এক লাখ ডোজ। ভুটানে দেড় লাখ ডোজ। তারপর বাংলাদেশ ও নেপালে পাঠানো হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে অনেক বেশি। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কভিড-১৯ টিকা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদন করছে। সেটা বিভিন্ন রাষ্ট্রে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের এই প্রতিষেধক মৈত্রীর ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল। তার কারণ হলো রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি এই দুই দেশের মধ্যে কার্যত একটা রক্তের সম্পর্ক। সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই অন্তরঙ্গতা এবং যৌথভাবে শত্রুর মোকাবেলা। ব্যক্তিগত স্তরে নেতৃত্বের মেলবন্ধন। এসবই একটা অন্য ধরনের মৈত্রীর পটভূমি এরই মধ্যে রচনা করে রেখেছেন। বিশেষ করে এখন, এই মুজিববর্ষে। সেই স্মৃতি। সেই ভালোবাসা। সেই আবেগ। দুই দেশের এই বন্ধন,  যাকে আমরা বলি রক্তের বন্ধন, সেই বন্ধন মজবুত করবে বৈ দুর্বল করবে না। মুজিববর্ষ উদযাপনের এই সময়ে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ ইমরান ২২ জানুয়ারি দিল্লির বিজ্ঞানভবনে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তিতে রচিত প্রদর্শনী দেখতে যান। এই প্রদর্শনী গত ১৭ ডিসেম্বর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নরেন্দ্র মোদির মধ্যকার ভিডিও সম্মেলনের সময় ভার্চুয়ালি উদ্বোধন হয়েছিল। এই প্রদর্শনীটি দেখে মুহাম্মদ ইমরান বলেছেন, ‘একটি অসাধারণ প্রদর্শনী।’ যেখানে রয়েছে বহু দুর্লভ ছবি। শুধু যুদ্ধের ছবি নয়। নেতাদের ছবি। বহু অপ্রচলিত বা অচলিত ছবি এবং তথ্য আছে। এটা দুই দেশের সরকার যৌথভাবে দেখভাল করছে। মুহাম্মদ ইমরান এই প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখেন। সমস্ত তথ্য দিয়ে একটি বিবৃতি জারি করেন। আবার এই প্রদর্শনীটি কলকাতায়ও নিয়ে যাওয়া হবে। ঢাকায়ও এই প্রদর্শনী বেশ কিছুদিন থাকবে। তারপর সব শেষে যাবে জাতিসংঘে। ২০২০ থেকে ২০২১ সালে চলতে থাকা এই প্রদর্শনীটি চলবে। এই প্রদর্শনীর কথা উত্থাপন করলাম শুধু এটুকুর জন্য, যে একদিকে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক, অন্যদিকে মুজিববর্ষ উদযাপনের ব্যবস্থা। তার পাশাপাশি প্রতিষেধক পাঠানোর কূটনীতি। এই কূটনীতিটা একটা প্রতিষেধক মৈত্রীর নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আমরা আশাবাদী এই দুই দেশের প্রতিষেধক মৈত্রী নিশ্চিতভাবেই সফল হবে।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা