kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

স্বাস্থ্যসেবা খাতে বৈশ্বিক চাহিদা ও আমাদের প্রস্তুতি

বিধান চন্দ্র দাস   

২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৫৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বাস্থ্যসেবা খাতে বৈশ্বিক চাহিদা ও আমাদের প্রস্তুতি

‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়ন’ শীর্ষক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা দিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাদপ্রতিম হৃদরোগ সার্জন ডা. দেবীপ্রসাদ শেঠি। তিনি তাঁর বক্তৃতার শেষের দিকে হাতির আঁকা সুন্দর একটি ছবি দেখিয়েছিলেন। ছবিটি দেখানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে, একটি প্রাণী যদি যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুন্দর শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারে, তাহলে গ্রামের অদক্ষ একজন নারীকেও ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসকের সাহায্যকারী তৈরি করা সম্ভব।

তিনি তাঁর হাসপাতালে এটি করে দেখিয়েছেনও। গ্রামের স্কুল পাস অদক্ষ মেয়েদের দুই বছর প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি তাদের হার্ট অপারেশনের মতো জটিল একটি অপারেশনকক্ষের নার্সের বিকল্প সাহায্যকারী বা ক্রিটিকাল কেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে গড়ে তুলেছেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে অভাবনীয়। শিক্ষণীয় তো বটেই। বিশেষ করে আমাদের দেশে আসন্ন কভিড-১৯-এর টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত শেষ করতে হলে এই ধারণাটি বিবেচনা করা যেতে পারে।

ডা. শেঠির বক্তব্য শুনে ও স্লাইডস দেখে বোঝা গেল যে তিনি শুধু একজন ভালো চিকিৎসক নন, একজন সুবক্তা ও বিচিত্র প্রতিভাসম্পন্ন বিদ্বজ্জনও বটে। অপারেশন থিয়েটারে সুনিপুণভাবে ছুরি-কাঁচি ব্যবহারে কঠিনতম হৃিপণ্ডের সমস্যা তিনি সমাধান করতে পারেন জানি। তবে তার বাইরে অর্থনীতি ও উন্নয়নের মতো কঠিন ও জটিল বিষয় নিয়েও যে তিনি কথা বলতে পারেন, সেটি আমি অন্তত আগে জানতে পারিনি। অনুষ্ঠানে সংযুক্ত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শ্যামলী নাসরীন চৌধুরীও সে কথা উল্লেখ করেন।

ডা. শেঠি ভারতের মানুষ হলেও তাঁর ভাবনা বাংলাদেশের জন্যও অনেকটা প্রযোজ্য। তিনি তাঁর বক্তব্যের প্রথম দিকে একজন কৃষকের ছবি দেখিয়েছেন। কৃষকটি তাকিয়ে আছেন আকাশে মেঘের উদ্দেশ্যে। বৃষ্টির জন্য। এই বৃষ্টি কৃষকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ডা. শেঠি বর্ণনা করেন, অল্প বৃষ্টিতে ফসল হবে না। কৃষকের ক্ষতি। পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে বাম্পার ফলন। সে ক্ষেত্রেও কৃষক ফসলের প্রকৃত মূল্য পাবেন না। আবার কৃষিতে অধিক যন্ত্রায়ন—বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিকল্প কর্মসংস্থানে ঠেলে দেবে। সে ক্ষেত্রে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত কী ভূমিকা পালন করতে পারে? তিনি দেখালেন যে একুশ শতকের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হবে স্বাস্থ্যসেবা খাত। কিন্তু তাঁর মতে, খুব অল্পসংখ্যক নীতিনির্ধারক এ বিষয়টি অনুধাবন করেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মতো কৃষিনির্ভর দেশগুলোতে অবশ্য বৃষ্টি সমস্যা ছাড়াও কৃষকের আরো অনেক সমস্যা আছে। যেমন–জমির মালিকানা, ভূমিহীনতা, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, ঋণের ফাঁদ, সার-বীজ-কীটনাশক ক্রয়ে ক্রমবর্ধমান ব্যয় ইত্যাদি। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অবস্থায় কৃষি এক বিরাট ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। আগামী দিনে ভূগর্ভস্থ পানিও সব জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী পাওয়া যাবে না। বৃষ্টির সঙ্গে এগুলো যোগ করলে ডা. শেঠির ভাবনা আরো বেশি মান্যতা পায়।

আমাদের দেশে কৃষি বাদে অন্যান্য খাতেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। দেশের অর্থনীতিতে অন্যতম বড় খাতও মাঝেমধ্যে নগদ সহায়তার জন্য সরকারের কাছে হাত পাতে। নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তাদের মোকাবেলা করতে হয়। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবার দক্ষ জনশক্তি একটি অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠতে পারে। ডা. শেঠি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়টি আলোচনা করলেন। তিনি দেখালেন যে আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বাস্থ্যসেবা খাত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে আইটি, তেল-গ্যাস, পরিবহন, মিডিয়া, এনার্জি, পোশাক খাত ইত্যাদির তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা খাত অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। কাজেই তার সুবিধা নিতে হলে আমাদের এখনই পরিকল্পনা করে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

ভাবার কোনো কারণ নেই যে ডা. শেঠি নিজে চিকিৎসক বলে স্বাস্থ্যসেবাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সম্ভাবনাময় বলে অভিহিত করেছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যের পক্ষে পৃথিবীর সেরা সব উৎস থেকে পরিসংখ্যানও দেখিয়েছেন। পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু যতই বৃদ্ধি পাক মানুষের অসুস্থ হওয়ার হার কিন্তু কমেনি। সত্যি কথা বলতে কী আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাই মানুষের অকাল মৃত্যুহার কমিয়ে দিয়েছে। মূলত পরিবেশগত কারণে আগামী দিনে অসুস্থতার হার আরো বৃদ্ধি পাবে। করোনাভাইরাসের মতো কিংবা এর থেকেও কয়েক গুণ বেশি ক্ষতি করার সম্ভাবনাযুক্ত নতুন নতুন ভাইরাস আক্রমণ করবে মানুষকে। এসব কারণে আগামী দিনে প্রয়োজন হবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ জনবলের।

স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ জনবল তৈরি করা গেলে তা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনও করা যাবে। বর্তমানে আমাদের দেশ থেকে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল আমাদের অর্থনীতিতে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারবে। ডা. শেঠি বলেছেন, আগামী দিনে বিদেশ, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে লাখ লাখ পদে লোক নিয়োগ হবে। এসব পদে বেতনও হবে অনেক বেশি। কাজেই সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের ডাক্তার, নার্স ও মেডিক্যাল টেকনিশিয়ানদের যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ায় চাকরির জন্য পরীক্ষায় পাস করার মতো করে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করার জন্য এটি হবে আমাদের জন্য এক মহাসুযোগ।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী আগামী ১০-১২ বছরের মধ্যে গোটা পৃথিবীতে আট কোটি স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন হবে। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানদের এখন ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে চাকরি করতে হলে নানা রকম পরীক্ষা পাস করাসহ ভিসার জটিল সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। কিন্তু তারা সমস্যায় পড়লে এসব নিয়ম অনেক শিথিল করবে। প্রশ্ন হচ্ছে, যখন তারা শিথিল করবে তখন কী আমরা তাত্ক্ষণিক সেই পরিমাণ চিকিৎসাকর্মী সরবরাহ করতে পারব?

ডা. শেঠির মতে, ধনী দেশের চিকিৎসাকর্মীরা সাধারণত অসুস্থ রোগীদের পাশে থেকে দীর্ঘ সময় সেবা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। একটি দেশ যখন ধনী হয়, তখন সেখানে স্বাস্থ্যসেবা চাকরি অনাকর্ষণীয় হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের সংস্কৃতিই হচ্ছে অসুস্থ মানুষের সেবা করা। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও ইউরোপ-আমেরিকার মতো নয়। কিউবা ও ফিলিপাইন তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে পাঠিয়ে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার উপার্জন করছে। কাজেই পরিকল্পনামাফিক এগোতে পারলে স্বাস্থ্যসেবা খাত আমাদের জন্য অপার সম্ভাবনা বয়ে আনবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মাননীয় তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এমপি ডা. শেঠির বক্তৃতা থেকে অনেক কিছু শিখলেন বলে জানালেন। তিনি নার্স তৈরিতে ডা. শেঠির পরামর্শ বিবেচনা করার কথা বললেন। অনুষ্ঠানে সংযুক্ত প্রফেসর কামরুল হাসান খান ও প্রফেসর আবদুল মান্নান ডা. শেঠির বক্তৃতার প্রশংসা করেন। ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সদস্যসচিব প্রফেসর মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলসহ অন্যরা ধন্যবাদার্হ এই কারণে যে ডা. শেঠিকে যুক্ত করে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে তাঁর একটি আশাজাগানিয়া বক্তব্য শোনার সুযোগ করে দিলেন। আমরা আশা করব, দেশের পাঁচটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক চাহিদা অনুসারে দক্ষ চিকিৎসা জনবল তৈরিতে এখনই সচেষ্ট হবেন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা