kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

পণ্যে ভেজালেও হবে মানি লন্ডারিং মামলা

এস এম আজাদ   

১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পণ্যে ভেজালেও হবে মানি লন্ডারিং মামলা

ভেজাল ও নকল পণ্য উৎপাদন এবং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থপাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এ আইনে ভেজাল কারবারিদের অবৈধ অর্থের বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে মামলা করার বিধান থাকলেও কয়েক বছর তা হয়নি। সম্প্রতি ভেজাল কারবারিদের এ আইনের আওতায় আনতে মামলা দায়েরের জন্য অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াড।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, গত ৪ অক্টোবর গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায় এসিআই বাংলাদেশ লিমিটেডের গুদামে অভিযান চালিয়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ‘স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজার’ জব্দের পর পরীক্ষা করে বিষাক্ত মিথানলের উপস্থিতি পান। আর ১১ অক্টোবর মিরপুরের ডিপোতে অভিযান চালিয়ে এসিআইকে এক কোটি টাকা জরিমানা এবং বাজার থেকে ভেজাল স্যানিটাইজার প্রত্যাহার করার আদেশ দেন আদালত। গণমাধ্যমে এ খবর প্রচারিত হলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টির পর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মানি লন্ডারিংয়ের অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ ডিসেম্বর নোটিশ দিয়ে এসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের প্রতিনিধিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। চলতি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দুইবার জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। এর পরই পণ্য ভেজাল করার অপরাধে বর্তমানে দেশে প্রথম মানি লন্ডারিং মামলার প্রস্তুতি চলছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, স্যাভলনের মতো সুনাম কুড়ানো ব্র্যান্ডের আড়ালে ভেজাল সুরক্ষা পণ্য তৈরির ঘটনা সবাইকে বিস্মিত করেছে। এ কারণে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। একইভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা ভিন্ন মামলায় ভেজালের বড় অভিযোগ পাওয়া গেলে সেখানেও মানি লন্ডারিং মামলা হবে।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দুর্নীতি ও চোরাকারবারির মাধ্যমে অর্থপাচার ছাড়াও কিছু অপরাধে অবৈধ অর্থপাচারের অভিযোগে মামলার বিধান রয়েছে। প্রতারণা-জালজালিয়াতি করে অর্থপাচার, সোনাপাচার, মানবপাচারের অভিযোগে এরই মধ্যে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে। গত বছর মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধেও এই আইনে মামলা হয়েছে।

জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানি লন্ডারিং আইনে ভেজাল পণ্য উৎপাদনের কারণে মামলা করার বিধান থাকলেও আমাদের প্রচলিত জাল-জালিয়াতির মামলার চাপে এত দিন ওই আইনে মামলা করা হয়নি। এখন হবে। একটি মোবাইল কোর্টে এসিআইয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আসার পর মানি লন্ডারিং আইনে মামলার জন্য আমরা অনুসন্ধান শুরু করেছি। প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা হবে।’

সিআইডি সূত্র জানায়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের (২০১২) ২-এর (শ)-এর (২২) ধারায় ‘সম্পৃক্ত অপরাধের’ ভেতরে ‘ভেজাল বা স্বত্ব লঙ্ঘন করে পণ্য উৎপাদন’ করে অর্জিত অর্থ বা সম্পদের ব্যাপারে এই আইনে মামলা করার বিধান রাখা হয়েছে। তবে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করতে হলে আগে অপরাধের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আলামত বা প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়। এসিআইয়ের গুদামে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে মেয়াদ উত্তীর্ণ রাসায়নিকসহ স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজার জব্দ হওয়ার পর এই অনুসন্ধানে নামে সিআইডি।

সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আল আমিন হোসেন বলেন, ‘একটি মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ যেভাবে অনুসন্ধান করা হয় আমরা সে প্রক্রিয়ায় কাজ করছি। আপাতত এর বেশি কিছু বলা যাবে না।’

গত ৪ অক্টোবর দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাজীপুরে এসিআইয়ের গুদামে অভিযান চালিয়ে সেটি সিলগালা করে দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরপর ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে বিষাক্ত মিথানল পাওয়ায় ১১ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরের ডিপোতে অভিযান চালিয়ে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মিথানল দিয়ে বানানো তিনটি ব্যাচের হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

ওই সময় র‌্যাব জানায়, এসিআই কম্পানির ‘স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজার’ বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে তাতে বিষাক্ত মিথানলের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা হ্যান্ড স্যানিটাইজারে থাকার কথা নয়। স্যাভলনের স্যানিটাইজারের গায়ে ‘আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল’ দিয়ে তৈরি লেখা থাকলেও তাতে আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের উপাদান পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে জীবাণুনাশক হিসেবে মানুষ যে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করে, তাতে জীবাণুমুক্ত হওয়ার পরিবর্তে মানুষের শরীরে নানা রকম রোগ সৃষ্টি করে। এ ছাড়া দেশে মিথানল ব্যবহার সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। এসিআইয়ের কারখানায় বিষাক্ত মিথানল দিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি হচ্ছিল, এমন খবরেই র‌্যাব অভিযান চালিয়েছিল।

সিআইডি সূত্র জানায়, স্যাভলন জীবাণুমুক্তকরণ সামগ্রী হিসেবে দেশের মানুষের কাছে বিপুল আস্থা অর্জন করে। এই সুনামের আড়ালে ভেজাল ও নকল পণ্য উৎপাদন করে দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছিল। করোনা মহামারির মধ্যে এসিআইয়ের স্যানিটাইজার দিয়ে হাত স্যানিটাইজ করেও চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে অনেক মানুষ। পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য হয়েছে। হয়েছে অবৈধ টাকার লেনদেন।

‘ভেজাল বা স্বত্ব লঙ্ঘন করে পণ্য উৎপাদন’ করে ব্যবসায় অর্জিত অর্থ লেনদেন অর্থপাচারের ধারায় পড়ে। একইভাবে বড় ধরনের ভেজাল পণ্য তৈরির সিন্ডিকেট বা চিহ্নিত কারবারির বিরুদ্ধে সিআইডি মানি লন্ডারিংয়ের অনুসন্ধান করে মামলা করবে। এসিআইয়ের ব্যাপারে তদন্ত শেষ পর্যায়ে বলে জানায় সূত্র। শিগগিরই এ ব্যাপারে মামলা দায়ের করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা