kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কালের কণ্ঠ’র জন্মদিনে ভালোবাসাসিক্ত শুভেচ্ছা

মো. জাকির হোসেন   

১০ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৩৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কালের কণ্ঠ’র জন্মদিনে ভালোবাসাসিক্ত শুভেচ্ছা

আজ ১০ই জানুয়ারি। কালের কণ্ঠ’র শুভ জন্মদিন আজ। স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন ১০ই জানুয়ারি। ১৯৭২ সালের এই দিনে বাঙালি জাতির প্রাণভোমরা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত বিজয় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে। বাঙালি জাতির ইতিহাসের এমন অবিস্মরণীয় দিনে কালের কণ্ঠ’র জন্ম বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বস্তুনিষ্ঠতা ও সততার সঙ্গে কাজ করে কৈশোরেই কালের কণ্ঠ পাঠকের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে সমর্থ হয়েছে। কালের কণ্ঠ শুধু একটি দৈনিক পত্রিকা নয়, একটি ভালোবাসার নাম। রাত পোহালে ক্ষুৎপিপাসা মেটাতে জল-খাবার চাই, আর সংবাদ-তথ্যের তৃষ্ণা মেটাতে কালের কণ্ঠ চাই। সুখে-দুঃখে সব সময় বাঙালির অকৃত্রিম সঙ্গী হয়ে পাশে থেকে এটি এখন ‘বাংলার কণ্ঠ’, ‘বাঙালির কণ্ঠ’। ‘আংশিক নয়, পুরো সত্য’ প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ ‘সত্যভাষী কণ্ঠ’। কালের কণ্ঠ’র জাদুকরী পাঠক বশীকরণ মন্ত্রগুলোর অন্যতম হলো—এক. স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনের শুরু থেকেই একটি পক্ষ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা পাকিস্তানের দোসর হিসেবে বাঙালিদের হত্যা, ধর্ষণ, তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালায়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রণীত যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের সংবিধান তথা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ জিয়ার মৃত্যুর দুই দশক পর বিএনপি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করছে। এটি আদালত অবধি গড়িয়েছে। আমাদের উচ্চ আদালতও বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে রায় দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও উচ্চ আদালতের রায়কে অবমাননা করে বিএনপি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেই চলেছে। এটি মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করার শামিল। বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সমান্তরালে জিয়াকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের জনক হিসেবে উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বিএনপি। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রসম জয় বাংলা স্লোগান শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের মতো মুক্তিযোদ্ধা বই লিখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছেন। জিয়াকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি দাবি করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তথা বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টার এমন বাস্তবতায় সংবাদপত্রের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের ভান-ভণিতা করার সুযোগ নেই। সংবাদপত্রকে মুক্তিযুদ্ধের সত্যিটা সাহসের সঙ্গে বলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে গোয়েবলসীয় কায়দায় ভয়ংকর মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে প্রকৃত সত্যিটা বারবার উচ্চারণ করতে হবে। কোনো ভণিতা, লুকোছাপা কিংবা লুকোচুরি না করে কালের কণ্ঠ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, স্বাধীনতার কথা বলে, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের কথা বলে, সোনার বাংলার কথা বলে। কালের কণ্ঠ তাই মুক্তিযোদ্ধাদের ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের ‘সাহসী কণ্ঠ’। দুই. কালের কণ্ঠ সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠ আদর্শ ও দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্ভাসিত। অন্যদিকে এ দেশের মাটি ও মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও মত প্রকাশের আলোয় আলোকিত হয়ে পাঠকদের আলোড়িত করে তাদের মন কাড়তে সক্ষম হয়েছে। তিন. এ কথা অনস্বীকার্য যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো বিত্তশালীর সাহায্য ও সহযোগিতায় গড়ে ওঠে সংবাদপত্র। কালের কণ্ঠও তার ব্যতিক্রম নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিত্তশালী মালিকের অবস্থান ও সমাজের সাধারণ পাঠকদের চাওয়া—এই দুয়ের অবস্থান একেবারে মুখোমুখি। এই দ্বন্দ্বে বেশির ভাগ সময় বিত্তশালী পত্রিকা মালিক প্রবল হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। ফলে সংবাদপত্রের বস্তুনিষ্ঠতাকে আপস করে চলতে হয়। কিন্তু কালের কণ্ঠ সংবাদ প্রকাশের বস্তুনিষ্ঠতাকে মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাঙালি জাতির শুদ্ধ মনন গঠনের আদর্শকে বুকে ধারণ করেছে। সংবাদপত্রের আধুনিক কলাকৌশলকে বিবেচনায় নিয়ে নিজস্ব ধারা অর্জনে সক্ষম ও সফল হয়েছে কালের কণ্ঠ। চার. কালের কণ্ঠ রুচিশীল সংবাদপত্র পাঠকের মনে আসন করে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো খবর নির্বাচন, খবর পরিবেশনা ও বিন্যাসে পত্রিকাটির সৃজনশীল মেধা ও আবেগের মিশ্রণ। পাঁচ. কালের কণ্ঠকে মানুষ আপন মনে করে, ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, চিন্তা-চেতনায় ধারণ করে—কারণ এটি মানুষের কল্যাণের কথা বলে। পরমতসহিষ্ণুতা, এ দেশীয় চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির লালন আর মুক্তবুদ্ধির ধারক-বাহক হিসেবে কালের কণ্ঠ পাঠকের মনোজগৎকে আলোড়িত করতে পেরেছে। ছয়. কালের কণ্ঠ’র ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ হলো—এটি সবার সঙ্গে, সবার পাশে। শহুরে আধুনিক জীবনধারা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের কথা বলে শিকড়সন্ধানী কালের কণ্ঠ। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সংগ্রামী জীবন ও তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার মুখপত্র হিসেবে নিরন্তর কাজ করে চলেছে কালের কণ্ঠ। শহর-নগর ছাড়িয়ে কালের কণ্ঠ পৌঁছে গেছে গ্রামগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কালের কণ্ঠ দেশ ও দশের কথা বলে, মাটি ও মানুষের কথা বলে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর খবরের সঙ্গে সঙ্গে একজন সাধারণ শ্রমিক ও প্রান্তিক কৃষকের খবরও পরিবেশন করে কালের কণ্ঠ তাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে। শিশুদের কথা, নারীদের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরে কালের কণ্ঠ। আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, কলাম, বিজনেস, বিনোদন, খেলা, টেকলাইফসহ নানা বিষয়ে সংবাদ প্রতিবেদন, ফিচার ইত্যাদি পরিবেশন করে থাকে কালের কণ্ঠ। সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য আছে বিশেষ আয়োজন। প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটগল্প, ধারাবাহিক গল্প, কবিতা, বিশেষ সংখ্যা, নতুন বইয়ের খবর, সাক্ষাৎকার, রিভিউ কালের কণ্ঠ’র আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেছে। কালের কণ্ঠ সবার কথা বলে, সব পেশার মানুষের কথা বলে। ছয়. সেই সব প্রতিষ্ঠানকেই মানুষ মনে রাখে এবং নিজের বলে ভাবে, যে প্রতিষ্ঠান তার সব অংশীজনের কথা বলার ও মত প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। যেকোনো সংবাদপত্রের প্রাণ তার পাঠকসমাজ। কালের কণ্ঠ তার প্রধান অংশীজন পাঠকদের মতামত প্রকাশের জন্য মতামত পাতা প্রবর্তন করেছে। এ পাতা গণতন্ত্রচর্চার ক্ষেত্রে সরকার ও জনসাধারণের সেতুবন্ধ রচনায় এক অনন্য উদ্যোগ। পাঠক বশীকরণে কালের কণ্ঠ এদিক থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। সাত. দেশের উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি সরকারের ব্যর্থতার কথা সাহসিকতার সঙ্গে পাঠকের সামনে প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না কালের কণ্ঠ। দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক, সামাজিক অবিচার ও শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থানের জন্যও কালের কণ্ঠ নন্দিত পাঠকসমাজের কাছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মুখপত্র হয়েও কালের কণ্ঠ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলের অন্যায়-অপরাধের কথা তুলে ধরতে আপসহীন। আট. যেকোনো সংবাদপত্রের শক্তির উৎস নিবেদিতপ্রাণ, সৃজনশীল, মেধাবী ও প্রগতিশীল আদর্শের ধারক সাংবাদিক। কালের কণ্ঠ’র রয়েছে একঝাঁক পেশাদার, মেধাবী ও প্রগতিশীল সাংবাদিক। অনেক গুণীজন, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব কালের কণ্ঠে নিয়মিত কলাম লিখেন, যা কালের কণ্ঠ পাঠে পাঠকের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

সংবাদপত্রকে সময়ের সঙ্গে আধুনিকতাকে নিত্যসঙ্গী করে ও পরিবর্তনকে ধারণ করে পথ চলতে হয়। কালের কণ্ঠ’র পাঠকপ্রীতি আরো বাড়াতে দুটি বিষয়ের দিকে কালের কণ্ঠকে মনোযোগ দিতে নিবেদন করছি—এক. তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে পাঠকরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী তথা ভাইরাল বিষয়ের তাৎক্ষণিক ভার্চুয়াল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনতে চায়। কালের কণ্ঠ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ভার্চুয়াল আলোচনার আয়োজন করতে পারে। দুই. বাংলাদেশ সমাজের রক্ষণশীলতা বিবেচনায় যৌনতার উপাদানসংশ্লিষ্ট সংবাদ চয়ন ও পরিবেশনায় আরো সতর্ক হওয়া দরকার।

শুধু সংবাদ আর তথ্য নয়, সংবাদপত্র স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে মানুষকে স্বপ্ন দেখাক—এটাও চায় পাঠকসমাজ। বাঙালির সুখে-দুঃখে কালের কণ্ঠ স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে আশা দেবে, ভরসা জোগাবে—জন্মদিনে এ প্রত্যাশা কালের কণ্ঠ’র কাছে। কালের কণ্ঠ সুন্দর পৃথিবী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্নের কিংবদন্তি পথিকৃৎ হয়ে উঠুক। ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা আর ইতিহাস বিকৃতির অন্ধকার পাড়ি দিয়ে আলোকিত দিনের নির্ভরযোগ্য স্বপ্ন সারথি হয়ে উঠুক। কালের কণ্ঠ’র একাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রত্যাশা—বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যসন্ধ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হয়ে কালের কণ্ঠ তত দিন বেঁচে থাকুক, যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে, বাংলা ভাষা থাকবে। জয়তু কালের কণ্ঠ।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা