kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের করণীয়

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ   

৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৪৬ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের করণীয়

বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির প্রকৃত হার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ দিন দিন উন্নতি করছে—এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কভিডের ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আদতে কতটুকু ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানো অব্যাহত আছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই ঘুরে দাঁড়ানো স্বস্তির বিষয়। এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কৌতূহল বা উদ্বেগের বিষয় হলো, কভিডের কারণে বাংলাদেশের উন্নয়ন যে গতি হারিয়েছে, তা আগের অবস্থায় ফিরে আসতে কত বেশি সময় লাগতে পারে। তাই আমাদের এগিয়ে যাওয়া যাতে নিষ্কণ্টক হয়, সে জন্য বাংলাদেশের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), সদ্য ঘোষিত পাঁচসালা পরিকল্পনা ও রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে নিবিড় পরিবীক্ষণ (মনিটরিং) এবং ধাপে ধাপে মূল্যায়ন ও সংশোধন দরকার। এতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং স্বল্পতম সময়ে ভুল সংশোধন করার সুযোগ থাকবে।

বিভিন্ন দেশে কভিড-উত্তর সময়ে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশ ভালো ও সন্তোষজনক। ভালো এই অর্থে, বেশির ভাগ দেশেই প্রবৃদ্ধি একদম থমকে গেছে, কারো শূন্যে নেমে গেছে, এমনকি কমে গেছে। বড় বড় দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় উন্নয়নকামী দেশগুলোর মধ্যে আমাদের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ যে উন্নয়ন করছিল, তাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ বা ৭ শতাংশের বেশি ছিল। কিন্তু করোনার ধাক্কায় সেখান থেকে আমরা অনেক নিচে নেমে গেছি। করোনাজর্জর গত অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.২৪ শতাংশ; যদিও তা আরো অনেক কম বলে বিতর্ক রয়েছে। সেটা যাই হোক, আমাদের এখন আবার প্রবৃদ্ধিতে ৭ শতাংশের ঊর্ধ্বে যেতে হবে। আগামী বছরের (২০২১-২২ অর্থবছর) বাজেটে প্রবৃদ্ধি ধরার পরিকল্পনা করা হচ্ছে ৭.৭ শতাংশ। এই লক্ষ্য নির্ধারণ ভালো। কিন্তু যেটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন। এখন আমাদের ১৮-১৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে ৯ শতাংশ লোক। সেটাও কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, আমাদের লক্ষ্য ইতিবাচক। কিন্তু সেটার জন্য আমাদের দরকার সুষ্ঠু নীতি, কৌশল, যথাযথ কর্মকাণ্ড ও সর্বোপরি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী গত ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের পোশাক খাতে রপ্তানি আয় অনেক কমে গেছে। অথচ সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পোশাক খাত অনেক ভালো করেছে। পোশাক খাতে আগের অর্থবছর তথা ২০১৯-২০ সালের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস প্রায় ১৭ শতাংশ রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। আর করোনা সংক্রমণের পুরোটা সময়জুড়েই আমাদের রেমিট্যান্স বাড়ছে। তবে রেমিট্যান্স নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা কিন্তু আছে। এটা বাড়বে কি না এবং যে হারে আসছে তা অব্যাহত থাকবে কি না। সমস্যা হচ্ছে, এই দুই খাতে যতটুকুই আমাদের অর্জন হচ্ছে, অন্যান্য খাত একেবারেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা বলার মতো অবস্থা এখনো হয়নি। পোশাক খাতেই ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি কমে গেছে। এখন আমাদের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারার ব্যর্থতা আমাদের পোড়াবে। অথচ পাট, চামড়া ও গৃহস্থালিসামগ্রী রপ্তানিতে আমরা আরো অনেক ভালো করতে পারতাম। এখনো সে সুযোগ রয়েছে। আর এখনই জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে কিছু বলতে পারছি না। কারণ করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বের জনশক্তির বাজারই অনিশ্চতায় পড়ে গেছে। এ ছাড়া জনশক্তি রপ্তানিতে দক্ষ জনশক্তির অভাব আমাদের বড় এক ঘাটতি।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রিজার্ভ ৪৩ মিলিয়ন ডলারে উঠে গেলেও তার উল্টোপিঠটাও দেখতে হবে। অর্থাৎ আমদানি কমে যাওয়া। আমাদের শিল্প-কারখানার জন্য যে মেশিনারিজ দরকার সেগুলো আসছে না। তার মানে পুরোমাত্রায় সচল হয়নি এবং দ্রুতই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এখন শিল্পায়নে আমাদের নিবিড় মনোযোগ দিতে হবে। আরেকটা দিক লক্ষণীয়। ব্যাংকে এফডিআরের পরিমাণ বাড়ছে। সঞ্চয়পত্র কেনার পরিমাণ বাড়ছে। এটার আরেকটা অর্থ হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত কেবল খাদ্যদ্রব্য ও অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যয় করছে না। অর্থাৎ মানুষের ভোগ কমে গেছে। ফলে উৎপাদনও কমে গেছে। এখন ব্যাংকে সঞ্চয় বাড়লেও ঋণ বিতরণ সেভাবে বাড়ছে না। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হচ্ছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না পাওয়া। এখন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি প্রায় শূন্যে অবস্থান করছে বলা যায়।

তৃতীয়ত, প্রয়োজনটা দীর্ঘদিন থেকে অনুভূত হলেও এ মুহূর্তে শ্রমের উৎপাদনশীলতা (লেবার প্রডাকটিভিটি) বা কর্মদক্ষতা বাড়ানোয় বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। এর সঙ্গে মজুরি ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। মজুরি ও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন না হলে প্রডাকটিভিটি বাড়বে না। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে কম প্রডাকটিভিটি রেটের একটি দেশ। চতুর্থত, আমাদের স্বাস্থ্য খাত পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। কভিড-১৯ টিকা কবে পাব না পাব সেটাই বড় কথা নয়, সামগ্রিকভাবে কভিড ছাড়াও সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে সম্পর্ক রয়েছে সেদিকে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। লক্ষ করা দরকার, মানবপুঁজির (হিউম্যান ক্যাপিটাল) দুটি উপকরণ রয়েছে। একটি হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং অন্যটি হলো সুস্বাস্থ্য। মানুষের যদি স্বাস্থ্য ভালো না থাকে, সুষম খাদ্য না পায়, তাহলে শুধু প্রশিক্ষিত হিউম্যান ক্যাপিটাল দিয়ে কোনো কাজ হবে না। এত দিন আমরা এ দিকটায় গুরুত্ব দিইনি। আমরা শুধু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে জোর দিয়েছি। কিন্তু স্বাস্থ্য যে মানবপুঁজির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, সেদিকে আমরা তেমন দৃষ্টি দিইনি। অতএব সেই অর্থে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাটা ঠিকঠাকমতো করতে হবে। প্রয়োজনে ঢেলে সাজাতে হবে। পঞ্চমত, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হতে হবে। এটা বড় বিষয়। এ ক্ষেত্রে আমরা খুব দুর্বল। এখানে আমাদের বিরাট ঘাটতি রয়েছে। আমাদের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ক্ষমতা কম। তাই রাজস্ব আয় বৃদ্ধির দিকে নজর দিতেই হবে। এখন রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য কিছু সংস্কার দরকার। করপোরেট ট্যাক্স ও ব্যক্তিগত খাতে ট্যাক্স না বাড়িয়ে যদি ব্যক্তির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের আয় বাড়ানো যায়, তাতে সরকারেরই লাভ। এতে সরকারের ট্যাক্সের আওতা বাড়বে, ট্যাক্সের হার বাড়ানো দরকার হবে না। তাতে সরকারের বাজেট ঘাটতিটা কমে আসবে।

আরেকটা বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটা এসেছে। এটা ২০২০-২৫ অর্থবছর থেকে প্রযোজ্য হলেও এর বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২১ সাল থেকে। এখানে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়ানো, দারিদ্র্যের হার নিচে নামিয়ে আনা, আয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশে জিডিপির হার অনেক বাড়বে। মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাবে। এমনকি উন্নয়নশীল অনেক দেশকে চলতি বছরেই পার কেপিটা ইনকামে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। এখন সেটা যদি আমরা টেকসই করতে চাই, আমাদের পরিকল্পনায় বেশ ভালো ভালো লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো অর্জন করতে হবে। তবে লক্ষ্যপূরণে যথাযথ কৌশল-নীতির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। এগুলো অর্জন করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দূর করতে হবে এবং সরকারের অর্থ অপচয় বন্ধ করতে হবে।

আরেকটা হলো প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, ২০২১ থেকে ২০৪১ সাল। সেটার নাম দেওয়া হয়েছে ‘Making Vision 2041 a Reality : Perspective Plan of Bangladesh 2021-2041’. মানে ২০৪১ সালের জন্য যে রূপরেখা প্রকল্পটা আছে, সেটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য এখানে চারটি (অষ্টম থেকে একাদশ) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা থাকছে। এখানে কতগুলো বিশেষ দিক আছে, সেসব দিকে নজর দিয়ে আমি শেষ করতে চাই। পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০৪১ সালে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৯.৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে। তার মানে ১০ শতাংশ। আর দারিদ্র্যসীমা নিচে আনার টার্গেটটি খুবই উচ্চাভিলাষী। দারিদ্র্যসীমা ১৮.৮ থেকে নামিয়ে ৩ শতাংশের নিচে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা আছে। অলমোস্ট ‘জিরো পোভার্টি’র দিকে যাবে। আর চরম দারিদ্র্য যা এখন ৯.২ শতাংশ আছে, সেটা নামিয়ে আনা হবে ১-এর নিচে। সেটা বিরাট একটা টার্গেট ও আশাজাগানিয়াও বটে। তবে এগুলো অর্জন করতে গেলে অনেক কর্মতৎপরতা দরকার। আমরা আগের পরিকল্পনাগুলো দেখেছি, সেগুলো তেমন বাস্তবায়িত হয়নি।

এখন আমাদের করণীয় হচ্ছে আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, বার্ষিক সরকারি বাজেট ও অন্যান্য পরিকল্পনায় থাকা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এবং লক্ষ্যগুলোর অর্জনের পথে তিন মাস, ছয় মাস ও বছরওয়ারি লক্ষ্যপূরণ, প্রেক্ষিত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পাঁচ বছর অন্তর লক্ষ্যপূরণ নিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং সে অনুযায়ী সংশোধন করা জরুরি। তা যদি না করি, তাহলে প্রথম বছরের ভুল দ্বিতীয় বছরে যাবে, দ্বিতীয় বছরের ভুল তৃতীয় বছরে যাবে, তৃতীয় বছরের ভুল চতুর্থ বছরে যাবে। কিন্তু চতুর্থ বছরে গিয়ে কিছু করতে চাইলে পারা যাবে না। অর্থাৎ আমার মূল বক্তব্য হলো, প্রতিবছর আমরা যে মূল্যায়নটা করি, তা শুধু মূল্যায়ন করলে হবে না। এ জন্য যথাযথভাবে পরিবীক্ষণ (মনিটরিং) এবং এর আলোকে সার্বিক মূল্যায়ন ও সংশোধন করতে হবে। পরিবীক্ষণটা করতে হবে অব্যাহতভাবে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্বর্তীকালীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলেও যথাযথভাবে পরিপালন করা হয় না। এটা যদি না করি, তাহলে পরিকল্পনা নিছক কাগজে-কলমে থেকে যাবে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা