kalerkantho

সোমবার । ১১ মাঘ ১৪২৭। ২৫ জানুয়ারি ২০২১। ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ডিজিটাল বাংলাদেশের এক যুগ ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব

অজিত কুমার সরকার   

৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৪০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডিজিটাল বাংলাদেশের এক যুগ ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব

ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবায়ন ১২ বছর পূর্ণ হয়ে ১৩ বছরে পা রেখেছে। এ বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বছরের এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন পূর্ণতা পাচ্ছে। সংগত কারণেই রূপকল্প-২০২১-এর লক্ষ্য অনুযায়ী ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আমরা দাঁড়িয়ে আছি—এমন প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া মোটেই অমূলক নয়। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমে প্রায়ই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের থেকে সৃষ্ট পরিবর্তনের স্রোতের সঙ্গে বাংলাদেশ কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পারবে? আর নীতিনির্ধারকরাই বা এ নিয়ে কী ভাবছেন? এর যৌক্তিক কারণও রয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ক্ষমতা ও প্রভাব দুই-ই আগের তিনটি শিল্প বিপ্লব থেকে বেশি। এই বিপ্লবে সব কিছুই ঘটছে দ্রুত। ১৭৬০ সালে প্রথম শিল্প বিপ্লবের সূচনা হলেও তা ইউরোপের বাইরে ছড়িয়ে যেতে সময় লেগেছিল ১২০ বছর। অথচ ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর তা উন্নত দেশের বাইরের দেশগুলোতে প্রবেশে এক যুগেরও কম সময় লেগেছে।

প্রথম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি আমি বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন পড়ে। ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে সৃষ্ট নিউ নরমাল (নতুন স্বাভাবিক) পরিস্থিতিতে গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে সাফল্যের কাহিনি।

End Poverty in South Asia গ্রন্থের  ‘Digital technology ensures food supply in rural Bangladesh during COVID-19’  শীর্ষক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে উত্তরবঙ্গের একটি কৃষি সমবায়ের সদস্য সালমা আক্তারের কভিড-১৯ মহামারির সময়ে একটি ভার্চুয়াল কল সেন্টার খুলে কৃষক ও ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে পণ্য ক্রয় ও বিক্রয়ের সাফল্যের কথা। এতে বলা হয়, কভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর চার মাসে (আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত) ভার্চুয়াল কল সেন্টারের উপকারভোগী প্রায় ৩০ হাজার ক্ষুদ্র কৃষক, যাদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ নারী। এই সময়ে প্রাণ, রংপুর ডেইরিসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কৃষকের পণ্য বিক্রি করা হয় ৩৪.৪ মিলিয়ন টাকা মূল্যের এবং সরবরাহকারীর কাছ থেকে ক্রয় করে ৫.৯ মিলিয়ন টাকা মূল্যের পণ্য। করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে গ্রাম এলাকায় সালমার এই ভার্চুয়াল কল সেন্টার খুলে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় বিচ্ছিন্ন কোনো সফলতার গল্প নয়। তাঁর এই সাফল্য এসেছে বিগত ১২ বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভিযাত্রায় গ্রাম এলাকায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্ময়কর সম্প্রসারণের পথ ধরে। দেশে একটি শক্তিশালী আইসিটি ব্যাকবোন তৈরি হয়েছে, যা গ্রাম পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতায় মানুষের তথ্য-প্রযুক্তিতে অভিযোজন ও সক্ষমতা দুই-ই বেড়েছে। বিশ্বের মাত্র ১২টি দেশে ১০০ মিলিয়ন সক্রিয় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী রয়েছে। বাংলাদেশ অনেক আগেই তা অতিক্রম করেছে। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত দেশে মোবাইল সিম ব্যবহারকারী প্রায় ১৬ কোটি ২৯ লাখ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বর্তমানে ১১ কোটিরও বেশি। ডাব্লিউইএফের প্রতিবেদনে যথার্থভাবেই মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় আর্থ-সামাজিক ব্যবধান কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে মূলত অন্যান্য খাতের মতো তথ্য-প্রযুক্তি খাতেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দর্শনের বাস্তবায়নের কারণে। তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার করে আর্থিক সেবায় মানুষের অন্তর্ভুক্তি রীতিমতো বিস্ময়কর। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং খাত ব্যাংকিং সেবাবহির্ভূত বেশির ভাগ (প্রায় ৬০ শতাংশ) মানুষকে (যাদের আবার বেশির ভাগই গ্রামের মানুষ) ব্যাংকিং সেবার অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১০ বছর আগে চালু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিং খাতে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ৯ কোটি ৬৪ লাখ এবং ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে লেনদেন ৫৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। অনলাইন ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, এটিএম কার্ড ব্যবহার শুধু ক্যাশলেস সোসাইটি গড়াসহ ই-গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে তা নয়, ই-কমার্সেরও ব্যাপক প্রসার ঘটাচ্ছে। ৩৯টি হাইটেক/আইটি পার্কের মধ্যে এরই মধ্যে নির্মিত পাঁচটিতে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ এলে তা ডিজিটাল অর্থনীতির বর্তমান আকার আরো বৃদ্ধি করবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে এই যখন বাস্তবতা তখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। আর তাই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাব এতটাই বেশি যে তা আমাদের চারপাশের প্রায় সব কিছুকেই বদলে দেবে। অন্তত ১০টি প্রযুক্তি এই পরিবর্তনে মূল ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ এ নিয়ে কী ভাবছে তা জানার কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক। প্রযুক্তিতে মানুষের অভিযোজন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে দ্রুত পরিবর্তনের স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার শক্তি জোগাচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক Gerschenkron-এর তিনটি শর্তের বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের এই আত্মবিশ্বাসী মনোভাবের যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।

Gerschenkron Hzpothesis-এ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে বিজয়ী হতে তিনটি শর্ত পূরণের কথা বলেছেন : ১. যে জাতির একটা অভিজাত শ্রেণি আছে, যাঁরা নতুন প্রযুক্তি বোঝেন; ২. যে জাতির মধ্যে নতুন প্রযুক্তির বিরোধিতাকারী কোনো দল নেই; এবং ৩. যে জাতির দৃঢ়চেতা একজন নেতা আছেন, যিনি নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে চান। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভিযাত্রায় এ তিনটি শর্তই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণি এখন নতুন নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব ও তাঁর প্রয়োগ নিয়ে ভাবছেন। দ্বিতীয়ত, বিগত ১২ বছরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং প্রান্তিক জনগণও এর সুফল ভোগ করায় বর্তমানে দেশে কোনো প্রযুক্তির বিরোধিতাকারী কোনো দল বা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই। ১৯৯২ সালে যারা বিনা অর্থে আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল তাদের জীবন চলার পথের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন দৃঢ়চেতা, আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক যিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধ। 

আশার কথা হলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুযোগ ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এবং অভিঘাত মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ব্লক চেইন ও রোবটিকস স্ট্র্যাটেজি দ্রুত প্রণয়নের উদ্যোগ নেন এবং খসড়া প্রণয়নের পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনও পেয়েছে। যে ১০টি প্রযুক্তি আমাদের চারপাশের প্রায় কিছুতেই দ্রুত পরিবর্তন আনবে তা ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠকে তুলে ধরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। ওই সভায়ই প্রধানমন্ত্রী চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০১৯ সালে এটুআই প্রগ্রাম ও ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত যৌথ সমীক্ষায় ছয়টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হচ্ছে : ১. সনাতনী শিক্ষা পদ্ধতির রূপান্তর, ২. অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনী, ৩. গবেষণা ও উন্নয়ন বিকশিত করা, ৪. সরকারি নীতিমালা সহজ করা, ৫. প্রবাসী বাংলাদেশিদের দক্ষতা কাজে লাগানো এবং ৬. উদ্ভাবনী জাতি হিসেবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করা। এই সমীক্ষার আলোকে স্কুল পর্যায়ে উদ্ভাবনে সহযোগিতা, প্রগ্রামিং শেখানোসহ নানা উদ্যোগের বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রায় এক বছর আগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের এলআইসিটি প্রকল্প ১০টি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর দক্ষ মানুষ তৈরির প্রশিক্ষণ শুরু করে। এসব উদ্যোগ আমাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ঝুঁকিকে সম্ভাবনায় পরিণত করার জন্য আশাবাদী করছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক এবং বাসসের
সাবেক সিটি এডিটর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা