kalerkantho

সোমবার । ১১ মাঘ ১৪২৭। ২৫ জানুয়ারি ২০২১। ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শেষবিদায়ে সহায় তারা

এস এম আজাদ   

৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:২৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শেষবিদায়ে সহায় তারা

রাজধানীর পল্টন এলাকার ব্যবসায়ী খলিলুর রহমানকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষায় করোনা শনাক্তের পর তাঁর মৃত্যু হয়। ৪ জুন খলিলুরের লাশ নিয়ে চরম বিপাকে পড়ে তাঁর স্বজনরা। তারা বুঝে উঠতে পারছিল না কোথায় যাবে, কিভাবে লাশ দাফন করবে। শেষে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায়  রায়েরবাজারের কবরস্থানে দাফন হয় খলিলুরের।

মৃতের ভাগ্নে মুহাম্মদ হাফিজুল হাকিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে তার কাছে যেতেও নিষেধ করা হতো। আমরা লাশ কোথায় নেব তা বুঝতেই পারছিলাম না। এমন অবস্থায় কোয়ান্টামের কর্মীরা এসে লাশ দাফনের সব দায়িত্ব নিয়ে নেন। তাঁরাই গোসল করান এবং জানাজার ব্যবস্থা করেন।’

এভাবেই ঝুঁকির কথা চিন্তা না করে করোনায় মৃতদের লাশ সমাহিত করার সব দায়িত্ব নিয়েছেন কিছু মানবদরদি স্বেচ্ছাসেবী। তাঁরা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ও আল-মারকাজুল ইসলামীর কর্মী। দেশে মার্চে প্রথম করোনা রোগী মৃত্যুর পর থেকে তিন-চার মাস লাশ দাফন নিয়ে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়। স্বজনরা লাশ ফেলে পালিয়ে যায়—এমন ঘটনাও ঘটে। শুরুতে কিছু এলাকায় পুলিশ এগিয়ে গিয়ে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে। পরে এপ্রিল মাস থেকে করোনায় মৃতদের লাশ দাফন ও সৎকারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সংগঠনটি গত সোমবার (৪ জানুয়ারি) পর্যন্ত করোনায় মৃত দুই হাজার ৭০০ জনের লাশ সমাহিত করেছে।

এই সময়ে তিন হাজার ১৩৫ লাশ সমাহিত করার সেবা দিয়েছে আল-মারকাজুল ইসলামী, যেখানে করোনায় মৃত কয়েক শ মানুষ ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, করোনাকালের এমন বীর প্রায় ৮০০ স্বেচ্ছাসেবী মৃতদের নিজ হাতে সমাহিত করলেও তাঁদের কেউই করোনায় আক্রান্ত হননি। তাঁরা সুরক্ষার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেই মানবতার সেবা দিয়েছেন। এই সেবার বিনিময়ে তাঁরা কোনো টাকাও নেননি। তবে স্বজনদের মধ্যে অনেকে সংগঠন দুটির আর্থিক সহায়তার ফান্ডে দান করেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে করোনায় মারা গেছে সাত হাজার ৬৫০ জন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত ৭ এপ্রিল থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই হাজার ৬৯৩ জনের লাশ সমাহিত করেছে তারা। এর মধ্যে দুই হাজার ২৮৩ জন মুসলিমকে দাফন, ৩৬৬ জনকে সৎকার, ২০ জনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং ২৪ জনকে সমাধিস্ত করা হয়।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের দাফন কার্যক্রমের সমন্বয়ক ছালেহ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ৭ এপ্রিল থেকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দেশের যেকোনো প্রান্তে করোনায় মৃতদের সমাহিত করছেন কোয়ান্টামের ৭৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক। প্রথম দিকে আতঙ্কে পরিবারের সদস্যরা যখন লাশের কাছে গিয়ে দাফনকাজে অংশ নিতে চাইছিল না তখন শেষবিদায়ের পুরো দায়িত্ব নিয়েছি আমরা। ধর্মীয় বিধান মেনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করে যাচ্ছি। করোনায় বিশেষ সেবা হিসেবে দাফনের কাজ করা হলেও এখন স্থায়ীভাবে এই সেবা কার্যক্রম চলছে।’ তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয় যে আমাদের কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমাদের নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বেচ্ছাসেবকরা অনেক ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন।’

আল-মারকাজুল ইসলামীর তথ্য মতে, করোনায় মৃত্যু শুরু হলে এপ্রিল মাস থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের তিন হাজার ১৩৫ জনকে সমাহিত করার বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়েছে সংগঠনটি। এর মধ্যে তিন হাজার ৬২ জন মুসলিম, ৬৩ জন হিন্দু, ছয়জন খ্রিস্টান, দুজন বুদ্ধিস্ট এবং দুজন বিদেশিকে সমাহিত করার দায়িত্ব পালন করে। 

সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হামযা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাকালে আমরা লাশ সমাহিত করার জন্য সহায়তা সেবার কার্যক্রম বন্ধ করিনি। এর মধ্যে কিছু করোনায় আক্রান্ত রোগীও ছিলেন। হয়তো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। আমরা তাই থেমে থাকিনি। আমরা এক মাস ২০ জন কর্মীর কঠোর সুরক্ষার ব্যবস্থা না নিয়েও দেখেছি, আল্লাহর রহমতে তাঁরা কেউ করোনায় আক্রান্ত হননি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা