kalerkantho

রবিবার। ২২ ফাল্গুন ১৪২৭। ৭ মার্চ ২০২১। ২২ রজব ১৪৪২

স্মরণ

আলোর পথের যাত্রী আয়শা খানম

কাজী সুফিয়া আখ্তার   

৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৪২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আলোর পথের যাত্রী আয়শা খানম

সম্মানিত অতিথিকে নিয়ে ডাইনিং হলে গিয়ে টেবিলে খেতে বসে দেখলাম হঠাৎ করে খাবারের মেন্যু বদলে গেছে। মাংসের পরিবর্তে নিরামিষ। আমার মাথায় হাত। এমন হওয়ার কথা নয়। এত রাতে ডিম ভেজে দেওয়াও সম্ভব নয়। কাঠের চুলার আগুন নিভে গেছে। কারণ জানতে রান্নাঘরে গেলাম। হোস্টেলের ফুড কমিটির আমি একজন সদস্য। শুনলাম বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের সিনিয়র এক আপা সন্ধ্যায় মেন্যু পরিবর্তন করে দিয়ে গেছেন। আমি বিকেলে মেন্যু জেনে চলে যাওয়ার পরে তিনি এসে রদবদল করে রাতের তরকারি সকালে, সকালের তরকারি রাতে দিতে বলে গেছেন। আমরা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। তাই আমাকে একটু বড় নেত্রীর সামনে অপ্রস্তুত করার প্রয়াস। লজ্জায় মাথা নত করে কথাটা শেফালি আপাকে জানাতেই পাশে বসা নেত্রী বলে উঠলেন, ‘ছাড়ো তো ওসব। একটা কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ এনে দাও।’ ফরিদা আপা রুম থেকে ডিম ভেজে আনতে চাইলেন। তিনি হাতে ধরে তাঁকেও থামিয়ে দিলেন। আমাকে বললেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে একেবারে কোনো কথা বলবে না। সামনে ছাত্রী সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন নিয়ে ভাবো।’ আমার তো অপমানে কেঁদে ফেলার উপক্রম। আমাকে অবাক করে দিয়ে ঢাকার নামকরা ছাত্রী নেত্রী গল্প করতে করতে পরিতৃপ্তিসহকারে নিরামিষ ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে নিলেন। এত সহজ সাধারণ আমাদের রাজনৈতিক আদর্শের নেত্রী! দেখে আমি মুগ্ধ, অভিভূত। এক জীবনে সে মুগ্ধতা আর কাটল না।

যে সময়ের কথা বলছিলাম, সেটা হলো ১৯৬৯ সাল। গণজাগরণের ঢেউ পুরো পূর্ব পাকিস্তানে। সামনে ১৯৭০ সালের নির্বাচন। কুমিল্লা উইমেন্স কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়াকালীন সেদিন ঢাকার যে ছাত্রী নেত্রীকে আমি প্রথম দেখি, তিনি ছিলেন সেই নিরামিষ ডাল তৃপ্তিতে খেয়ে নেওয়া আয়শা খানম। সে রাতে তিনি আমাদের হোস্টেলে ছিলেন। সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। লম্বা, দোহারা গড়ন, মিষ্টি চেহারার লাবণ্যময়ী মেয়ে। চোখে-মুখে তারুণ্যের উজ্জ্বলতা। দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয়ে দীপ্ত। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সহসভানেত্রী। সাংগঠনিক কাজেই কুমিল্লা যাওয়া। তাঁদের দলে সম্ভবত পঙ্কজ ভট্টাচার্য, তোফায়েল আহমেদসহ ঢাকার আরো নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ ছিলেন। বিকেলে কুমিল্লা টাউন হলে বড় মিটিং হলো। মতিয়া চৌধুরী, কবি জসীমউদ্দীনও বক্তৃতা মঞ্চে ছিলেন। তারিখ ও মাস মনে নেই।

আয়শা আপার কথায় ফিরে আসি। ১৯৬৯ সালে সুফিয়া কামাল সভানেত্রী ও মালেকা বেগমকে আহ্বায়ক করে পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হলো। ডা. মাখদুমা নার্গিস রত্না, ডা. ফওজিয়া মোসলেম, আয়শা খানম, মনিয়া আক্তার, নাসিমুন আরা হক, রাকা আপা, বেবী মওদুদসহ আরো অনেকে পাড়ায় পাড়ায় গৃহবধূদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে মহিলা সংগ্রাম পরিষদের কমিটি গঠন করতে লাগলেন। ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদ গঠিত হয়। কবি সুফিয়া কামাল সভানেত্রী, মালেকা বেগম সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. মাখদুমা নার্গিস রত্না এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আয়শা খানম। শুরু হয় জেলায় জেলায় কমিটি গঠন। একই বছরে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে উপদ্রুত উপকূলে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম এবং নৌকার অভূতপূর্ব বিজয়ে সহযোগিতা করা। সাংগঠনিকভাবে এসব কাজে আয়শা আপা ছিলেন আরো অনেকের সঙ্গে। এরপর শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। বাড়িতে খবর না দিয়েই তিনি চলে গেলেন সীমান্ত পার হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। ১৯৭১ সালে ছাত্রী নেত্রীরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন বহুমাত্রিকভাবে নিজ বাসভূমের ভেতরে ও বাইরে অর্থাৎ ভারতে গিয়ে হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-যত্ন, শরণার্থী শিবিরের কাজকর্মের দায়িত্ব নিয়ে। আয়শা আপা নিজেও ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক থাকাকালে বিভিন্ন জেলায় অনেক ট্যুর করেছেন। নিত্যনতুন মানুষের সঙ্গে মেশার তাঁর প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল এবং তাঁদের সংগঠনের আদর্শ, উদ্দেশ্য বুঝিয়ে সংগঠনের পতাকাতলে একত্র করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ঢাকা আসার পর আয়শা আপাকে আমার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। তাঁর মানুষকে ভালোবাসার ও আকৃষ্ট করার একটা অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি ছিল। একবার একটু দীর্ঘ সময় যিনি তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছেন, তিনি তাঁর আন্তরিকতা, আতিথেয়তা এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে তাঁকে আর ভুলতে পারবেন বলে আমার কখনো মনে হয়নি। তাঁর মুগ্ধতা কাটানো কঠিন। সমাজে আলো ছড়াতে ছড়াতে নির্ভেজাল এক জীবন কাটিয়ে দিলেন।

আয়শা আপা একটি সংস্থায় কিছুদিন চাকরি করেছিলেন। পরে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি দুই বছর মাত্র সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর সাধারণ সম্পাদক মালেকা বেগমের সঙ্গে ১৮ বছর সহসাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দুই টার্মে সাধারণ সম্পাদক এবং দুই টার্মের অধিক সময় সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদেই ছিলেন। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নারী আন্দোলনের বিষয় চিহ্নিত করতে তাঁর বিচক্ষণতা, একটি বিষয় অত্যন্ত সুন্দর ও প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরার অসাধারণ ক্ষমতা, নারীর বিষয়গুলো সম্যকভাবে বুঝতে পারার সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনের সঙ্গে কার্যকরভাবে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন যুক্ত করার দক্ষতা ও যোগ্যতা, তাঁর কণ্ঠস্বর, বক্তৃতা প্রদানের কাব্যিক ভাষা বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে তাঁকে উচ্চমাত্রায় পৌঁছতে সাহায্য করেছে। আয়শা আপা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাঁর সময় ও নারীসমাজের দাবি মেটাতে চেষ্টা করেছেন। তিনি চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। বেইজিং সম্মেলনের গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নে আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছেন কখনো এককভাবে, কখনো যৌথভাবে এবং অবশ্যই সফলভাবে। তাঁর ভেতরে আন্তর্জাতিক মানসিকতা ছিল। এসবই নারী আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছে।

আয়শা খানম ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তিনি বই পড়তেন, বই কিনতেন এবং নারী আন্দোলনের বিষয়ে সব সময় নিজেকে আপডেট রাখতে ভালোবাসতেন। বাংলাদেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি যেমন ছিলেন সম্মুখসারিতে, তেমনি সাংসারিক সব বিষয়ে তাঁর ছিল সমান নজর। সব সময় রুচিসম্মত পোশাক-পরিচ্ছদ পরতেন। অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ, কর্মনিষ্ঠ নেত্রী ছিলেন। একমাত্র সন্তান ঊর্মি খান-অন্তপ্রাণ আয়শা খানম মূলত মুক্তচিন্তার, মানবতাবাদী, সতত প্রগতিশীল, আধুনিক একজন মানুষ ছিলেন। লালন দর্শনের প্রভাব আমি তাঁর মধ্যে লক্ষ করেছি। তাঁর প্রিয় ছিল রবীন্দ্রসংগীত। তাঁর প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থা।

 লেখক : গবেষক ও নারী নেত্রী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা