kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

রোগীর সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করলেন রুহুল

তৌফিক মারুফ   

৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:২১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোগীর সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করলেন রুহুল

মার্চে করোনা মহামারি যখন দেশে দেখা দিল, তখন হাসপাতালে রোগীদের সেবা দিতে অনেকেই ইতস্তত করছিলেন। ভয়ে অনেক চিকিৎসক, নার্স রোগীর কাছে যেতেন না, অনেকে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ইউনিটে দায়িত্ব পালন করতে চাইতেন না। যাঁরা দায়িত্ব পালন করতেন, তাঁদের অনেকে যতটা সম্ভব দূরে থেকে, দরজার বাইরে থেকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তবে কেউ কেউ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা করে গেছেন অবলীলায়। তাঁরা রোগীর হাতে হাত রেখে পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহস দিয়েছেন, পরম যত্নে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন; দিন-রাত সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন। এমনই একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স (ব্রাদার) মোহাম্মদ রুহুল আমিন; যিনি সিলেট হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে দিতে মে মাসে নিজেই আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

রুহুল আমিন সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহম্মেদ জেলা হাসপাতালের কভিড ইউনিটে দিন-রাত রোগীদের সেবা করেছেন। বিভিন্ন হাসপাতাল প্রথম দিকে যখন হিমশিম খাচ্ছিল, তখন থেকেই সিলেটের শামসুদ্দিন হাসপাতালে চলেছে করোনা রোগীদের সেবা। নার্স রুহুল আমিন একটানা ১০ দিন করোনা ইউনিটে দায়িত্ব পালনের পর নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন একই হাসপাতালে। তবে নিজে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। দেশে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যে ১৪ জন নার্স মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম মৃত্যু হয় তাঁর।  

রুহুল আমিনের স্ত্রী শাহিন আফরোজ বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার স্বামী সব সময় দায়িত্ব পালনে খুবই আন্তরিক ছিলেন। কোনো ধরনের ফাঁকিবাজি পছন্দ করতেন না। তাঁকে যেদিন থেকে করোনা ইউনিটের দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনি সানন্দে নির্ভয়ে ডিউটি শুরু করেন। টানা ১০ দিন দায়িত্ব পালনের পর হঠাৎ করেই তাঁর মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। তিনি বাসায় না থেকে হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন। পরীক্ষায় তাঁর ফল পজিটিভ আসে। আমি ও আমাদের একমাত্র ছেলেও টেস্ট করিয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। আমি আমার ছেলেকে বাসায় রেখে হাসপাতালে আমার স্বামীর সঙ্গেই ছিলাম তাঁর সেবা করার জন্য। কিন্তু গত ২৯ মে তিনি মারা যান। এরপর আমি ও আমার ছেলে আবারও টেস্ট করিয়েছি, কিন্তু আমাদের শরীরে করোনা পাওয়া যায়নি।’

শাহিন আফরোজ বলেন, ‘আমার স্বামীর ওপর শুধু আমি বা আমার সন্তানই নয়, তাঁর মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই নির্ভরশীল ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর এক মাস পর আমার শ্বশুরের মৃত্যু হয়। এখন আমি রীতিমতো দিশাহারা অবস্থায় আছি। একমাত্র সন্তান এখন ক্লাসে সেভেনে পড়ছে। আমরা সিলেট শহরের রাজারগলিতে এক ভাড়া বাসায় থাকি। এর মধ্যে আমি আমার স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের কিছু টাকা পেয়েছি। পেনশনের বাকি টাকার প্রক্রিয়া চলছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যে বিশেষ অনুদানের টাকা দেওয়ার কথা ছিল, তা এখনো পাইনি বা কবে পাব সেটাও জানি না। ভবিষ্যৎ কিভাবে চলবে তা-ও অনিশ্চিত।’

পারিবারিক সূত্র জানায়, রুহুল আমিনের বাড়ি গাজীপুরের মনোহরদীতে। তিনি ১৯৯৯ সালে নার্স হিসেবে ফেঞ্চুগঞ্জে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরে সেখান থেকে তাঁকে বদলি করা হয় সিলেট শহীদ সামসুদ্দিন হাসপাতালে। ২০০৩ সালে তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় নরসিংদীর শাহিন আফরোজের। তাঁদের একমাত্র সন্তানের নাম রাজীমন হাসান আলিফ।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা নার্সেস পরিষদের মহাসচিব ইকবাল হোসেন সবুজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নার্স হিসেবে আমাদের দায়িত্বই হচ্ছে রোগীর সবচেয়ে কাছে গিয়ে পাশে থেকে সেবা দেওয়া। দূর থেকে রোগীর সেবা দেওয়ার উপায় আমাদের নেই। ফলে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের রোগীর সবচেয়ে কাছে থাকতে হয়েছে। আমাদের বিপদ হতে পারে জেনেও আমরা নার্সরা দূরে থাকিনি। ফলে এ পর্যন্ত সারা দেশে আমাদের প্রায় দুই হাজার নার্স করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪ জন মারা গেছেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা