kalerkantho

রবিবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৫ রজব ১৪৪২

সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের শিক্ষা

ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও, সিএসসি   

২৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৪:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের শিক্ষা

এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টিকর্তার অপার রহস্যময়তার মধ্যে অন্যতম রহস্যময় ঘটনা হলো যিশুখ্রিস্টের জন্মলাভের ঘটনা। সৃষ্টিকর্তার মহিমা ও ভালোবাসা প্রচারের জন্যই যিশুখ্রিস্ট ঈশ্বর হয়েও পরিত্রাণকর্তা হিসেবে এই ধরাধামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন মর্ত্যের সঙ্গে স্বর্গের এবং মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের ভালোবাসার অপূর্ব মিলন সাধনের জন্য। ঈশ্বর যে আমাদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, তিনি যে সব সময় আমাদের সঙ্গে আছেন এবং আমাদের সব সময় ক্ষমা করেন—সেই সত্যটিই যিশু আমাদের কাছে প্রচার করেছেন। পৃথিবীতে এই মুক্তিদাতার আবির্ভাব ঘটেছিল আমাদের অন্তরাত্মার সঙ্গে ঈশ্বরের মিলন ঘটাতে, আত্মার সঙ্গে আত্মার এবং আত্মার সঙ্গে বিশ্বের মিলন ঘটাতে। পৃথিবীতে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে।

যিশু এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন মানুষের পরিত্রাণের জন্য। মানুষ যখন অন্যায়, জুলুম, নির্যাতন আর পাপাচারের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল—মানুষকে যখন দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়ে পশুর মতো জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হয়েছিল তখন নির্যাতিত, নিপীড়িত আর মুক্তিকামী মানুষের ত্রাতা হয়ে, আলোর দিশারি হয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিস্ট। শাসকগোষ্ঠী আর উত্পীড়নকারীর অত্যাচার, সামাজিক অন্যায্যতা, মানুষের পাপ আর অসত্যের অন্ধকারে নিমজ্জিতদের বিপরীতে যিশুখ্রিস্টের সত্যনিষ্ঠ মানবতার বাণী সমাজে খেটে খাওয়া ক্রীতদাস, নিঃস্ব মজুর, কৃষক ও হতদরিদ্রদের নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছিল। মানুষ যখন পাপের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল, মুক্তিলাভের সব পথ যখন রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন যিশুর জন্মের মধ্য দিয়ে মানুষ পরিত্রাণের পথ খুঁজে পেল। যিশু আমাদের পাপের শাস্তি নিজের কাঁধে নিয়ে ক্রুশীয় মৃত্যুকে বরণ করলেন। কবরপ্রাপ্ত হলেন, তিন দিন পর মৃত্যুকে জয় করে কবর থেকে পুনরুত্থিত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত সাধনের মধ্য দিয়ে আমাদের জন্য পরিত্রাণের সুযোগ করে দিলেন।

খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী অত্যাচারী শাসক হেরোদ রাজার শাসনাধীন জেরুজালেমের বেথেলহেমে মাতা মেরির গর্ভে যিশুর জন্ম হয়। মুক্তিদাতা হিসেবে যিশুর জন্মলাভের কথা বাইবেলের পুরনো নিয়মে ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে বর্ণিত ছিল। আর যিশুর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপলাভ করে। তাই যিশুর জন্মের অনেক আগে থেকেই ইসরায়েল জাতি এমন এক ভাববাদীর আগমনের জন্য অপেক্ষা করত, যিনি তাদের রাজনৈতিকভাবে মুক্ত করবেন। তারা ভেবেছিল যিশু হয়তো বা কোনো রাজপরিবার কিংবা সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যিশু জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক দরিদ্র পরিবারে এবং একটি গোশালায়। অন্যদিকে ঈশ্বরপুত্র হিসেবে যিশুকে প্রথম চিনতে পেরেছিল প্রান্তিক শ্রেণির দরিদ্র মানুষই। কোনো জ্ঞানী শিক্ষিত মানুষ নয়। এর মধ্য দিয়ে আমরা দুটি বিষয়ে শিক্ষালাভ করতে পারি—প্রথমত, সৃষ্টিকর্তার কাছে ধনী-দরিদ্র সবাই সমান। তিনি নির্যাতিত, নিপীড়িত, অসহায় মানুষের পক্ষ নিয়ে থাকেন। তাই যিশু প্রথম যখন নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন তখন তাঁর প্রথম বাণীটিই ছিল—‘প্রভুর আত্মা আমার ওপর আছেন। কারণ তিনিই আমাকে নিযুক্ত করেছেন যেন আমি গরিবদের কাছে সুখবর প্রচার করি। তিনি আমাকে বন্দিদের কাছে স্বাধীনতার কথা, অন্ধদের কাছে দেখতে পাবার কথা ঘোষণা করতে পাঠিয়েছেন। যাদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে তিনি আমাদের তাদের মুক্ত করতে পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া প্রভু আমাকে ঘোষণা করতে পাঠিয়েছেন যে এখন তার দয়া দেখাবার সময় হয়েছে’ (লুক : ১৮-১৯)। প্রকৃতপক্ষে এই পৃথিবীতে অন্যায়-অবিচারহীন, শোষণ-বঞ্চনামুক্ত এক শ্রেণিহীন-বৈষম্যহীন সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যই যিশুখ্রিস্ট এই ধরাধামে আগমন করেছেন। দ্বিতীয়ত, যখন আমরা দেখি জন্মের পর যিশুকে প্রথম চিনতে পেরেছিলেন মূর্খ অশিক্ষিত মানুষরাই, জ্ঞানী শিক্ষিতরা নয়; তখন আমরা বুঝতে পারি সৃষ্টিকর্তাকে উপলব্ধি করতে হয় বিশ্বাস দ্বারা, শুধু জ্ঞান বা যুক্তি দ্বারা নয়।

যিশু আমাদের প্রেমের শিক্ষা দেন। মানুষের উচিত ঈশ্বরের প্রেমের প্রতি সাড়া দেওয়া। প্রকৃত প্রেম স্বর্গ থেকে আসে’ (১ করিন্থীয় ১৩ অধ্যায়)। ঈশ্বর আমাদের কাছে যিশুখ্রিস্টকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাই বড়দিনের মধ্য দিয়ে আমরা একে অন্যের জীবনে উপহার হয়ে উঠি। একে অন্যের শান্তির কারণ হয়ে উঠি। বড়দিন আমাদের শান্তি ও আনন্দ দান করে। যখনই আমরা পাপের জীবন ত্যাগ করে খ্রিস্টকে মুক্তিদাতা ত্রাণকর্তা বলে গ্রহণ করি, তখনই আমরা পরিত্রাণের আনন্দ উপলব্ধি করি।

যিশু আমাদের বিশ্বভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেন। ঈশ্বর ঈশ্বর হয়েও মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন। আর ঈশ্বরের ভাষা যে ভালোবাসার ভাষা তা যিশু তাঁর সমগ্র জীবনে প্রচার করেছেন। যাঁরা যিশুর এই ভালোবাসার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঈশ্বরের ভালোবাসায় সিক্ত হন তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ হন—তাই তাঁরা পরস্পরের ভাই-বোন হয়ে ওঠেন। কেননা ঈশ্বর হলেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি আমাদের পিতাস্বরূপ। যখন আমরা ঈশ্বরকে পিতা বলে সম্বোধন করি তখন সমগ্র বিশ্ব একটা মানব পরিবার হয়ে ওঠে আর আমরা সেই পরিবারে একে অপরের ভাই-বোন হয়ে উঠি। এই বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ আমাদের সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ, জুলুম-নির্যাতন, সংঘাত, হানাহানি পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে পরস্পর মিলেমিশে বাস করার অনুপ্রেরণা জোগায়। আজ আমরা যখন বড়দিন উদযাপন করছি তখন করোনাভাইরাসের মহামারিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পৃথিবীর সব মানুষ। এ অবস্থায় আমরা যদি যিশুর শিক্ষা ও আদর্শকে ধারণ করে একটি সর্বজনীন বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে পারি, অসহায়, দরিদ্র ও করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি, মানুষের মধ্যে প্রেম ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তুলতে পারি তাহলে বড়দিন উদযাপনের উদ্দেশ্য সার্থক হবে।

লেখক : অধ্যক্ষ
নটর ডেম কলেজ, ঢাকা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা