kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

যাচাইয়ের মুখে ৪০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা

হয়রানির শঙ্কা, বিব্রত আসল মুক্তিযোদ্ধারা

তালিকায় নাম রাখার আশ্বাসে টাকা লেনদেনের অভিযোগ

আজিজুল পারভেজ    

২২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০২:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হয়রানির শঙ্কা, বিব্রত আসল মুক্তিযোদ্ধারা

মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটভুক্ত হয়ে গেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করার জন্য যে যাচাই-বাছাই শুরু হচ্ছে, তাতে হয়রানির শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আসল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এই যাচাই-বাছাইকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে সারা দেশে হয়রানির কিছু ফাঁদ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তালিকায় নাম রাখার আশ্বাস দিয়ে অনেক জায়গায় আর্থিক লেনদেন শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয় তালিকা বা লাল মুক্তিবার্তায় নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধার নামও রয়েছে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকায়। এ নিয়ে বিব্রত বোধ করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। 

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) গত ৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৭১তম সভায় ২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ‘বেসামরিক গেজেট’ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা বা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রণীত লাল মুক্তিবার্তায় নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকা সত্ত্বেও এবং জামুকার সুপারিশ ছাড়া যাঁদের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ‘বেসামরিক গেজেটে’ প্রকাশিত হয়েছে, তাঁরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কি না যাচাই-বাছাই করা হবে।

২০১৪ সালে জামুকা মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নির্ধারণের পর এ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়  মুক্তিযোদ্ধাদের ৩৩ ধরনের গেজেট প্রকাশ করেছে। ‘বেসামরিক গেজেট’ ছাড়া বাকি ৩২টি গেজেটকেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রমাণক হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছেন, ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিপুলসংখ্যক অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুসারে, একই দিনে সারা দেশে উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করার তারিখ ঘোষণা করা হয়। প্রথমে ১৯ ডিসেম্বর তারিখ ঘোষণা করা হলেও পরে এই তারিখ পিছিয়ে ৯ জানুয়ারি নির্ধারিত হয়েছে। গত ৮ ডিসেম্বর যাচাই-বাছাইয়ের আওতাভুক্ত ৩৯ হাজার ৯৬১ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। এই তালিকায় দেখা যায়, ভারতীয় তালিকা বা লাল মুক্তিবার্তায় নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—এমন মুক্তিযোদ্ধাদের নামও প্রকাশ করা হয়েছে।

যাচাই-বাছাইয়ের এই উদ্যোগ নিয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম ভারতীয় তালিকা বা লাল মুক্তিবার্তা বা মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃত ৩৩ ধরনের প্রমাণকে অন্তর্ভুক্ত থাকলে, তিনি যাচাই-বাছাইয়ের আওতার বাইরে থাকবেন। কিন্তু এ ঘোষণা দেওয়ার পরও মুক্তিযোদ্ধারা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। আর যাচাই-বাছাইয়ের তালিকায় নাম থাকায় ভারতীয় তালিকা বা লাল মুক্তিবার্তায় যাঁদের নাম রয়েছে, সেসব মুক্তিযোদ্ধা বিব্রত বোধ করছেন।

যাচাই-বাছাইয়ের আয়োজন সম্পর্কে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব হারুন হাবীব কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল থেকে নতুন করে প্রায় ৪০ হাজার কিংবা তারও বেশি সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাকে নিজ নিজ উপজেলায় উপস্থিত হয়ে যাচাই-বাছাইয়ের সম্মুখীন হতে বলা হয়েছে। যখন-তখন যাচাই-বাছাইয়ের নামে যেভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের হয়রানির সম্মুখীন করা হচ্ছে, তা মোটেও কাম্য নয়। এতে একদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে নানা স্তরে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৪৯তম বার্ষিকীতে এসে এমন পদক্ষেপ অতীব দুঃখজনক ও একান্ত অনভিপ্রেত।’

তিনি বলেন, জাতীয় বীরদের তালিকা অবশ্যই চূড়ান্ত হতে হবে। কোনো অমুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে তাঁকে অবশ্যই বাদ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে অভিযুক্ত কিংবা সন্দেহভাজনদের ব্যাপারে তদন্ত হতেই পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে সবার নাম প্রকাশ করা খুবই বিব্রতকর, অবমাননাকরও। তা ছাড়া গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এতে ত্রুটি থাকলে সেটা সরকারি কর্মকর্তাদের ত্রুটি। এই দায় অন্যদের ওপর বর্তায় না।

নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা শাহ মোহাম্মদ আব্দুল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের তালিকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নামও এসেছে। সবাই বয়স্ক। দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে তাঁদের বারবার যাচাই-বাছাই কমিটির সামনে হাজির হতে হচ্ছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কেন দুর্ভোগের শিকার হবেন? কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও জামুকাকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।

এদিকে উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাইকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কতিপয় ব্যক্তি আর্থিক লেনদেন শুরু করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার একজন মুক্তিযোদ্ধা নাম না প্রকাশ করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধার যাচাই-বাছাই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। তাঁর যাতে কোনো সমস্যা না হয় এর জন্য যাচাই-বাছাই কমিটির একজন সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিছু টাকাও দিয়েছেন।

যাচাই-বাছাইয়ের ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষ কালের কণ্ঠকে  বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা যাতে হয়রানির শিকার না হন তার জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেসব মুক্তিযোদ্ধার নাম ভারতীয় তালিকা বা লাল মুক্তিবার্তায় রয়েছে, তাঁদের যাচাই-বাছাইয়ের বাইরে রাখতে এরই মধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটে যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তা থেকেও তাঁদের নাম বাদ দিয়ে নতুন করে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা