kalerkantho

সোমবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭। ১ মার্চ ২০২১। ১৬ রজব ১৪৪২

মহিলা পরিষদের স্মরণসভা

‘রাখী দাশ পুরকায়স্থের মতো একজন সংগঠককে হারানো অপূরণীয় ক্ষতি’

অনলাইন ডেস্ক   

১৯ ডিসেম্বর, ২০২০ ২১:০৪ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘রাখী দাশ পুরকায়স্থের মতো একজন সংগঠককে হারানো অপূরণীয় ক্ষতি’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রয়াত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, নারীনেত্রী এবং নারী আন্দোলনের নিবেদিত সংগঠক অ্যাড. রাখী দাশ পুরকায়স্থের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনলাইনে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।

আজ শনিবার (১৯ ডিসেম্বর ২০২০) বিকাল ৩:৩০ মিনিটে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে এ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার শুরুতে সংগীত পরিবেশন করেন সংগীত শিল্পী ডা. সুস্মিতা আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রয়াত নারীনেত্রী রাখী দাশ পুরকায়স্থের কর্মময় জীবনের উপর নির্মিত পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

সংগঠনের পক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আয়শা খানম রেকর্ডকৃত বক্তব্যে বলেন ১৯৭০ সালে কিছুটা এবং ১৯৭২ থেকে নারী আন্দোলনের কাজ করতে যেয়ে একটা প্রজন্মের সাথে যুক্ত হই। প্রত্যেকের সাথে ছিল একটা আত্মিক সম্পর্ক। রাখী দাশ নারী আন্দোলনের এক বিশাল শক্তি। আমরা নারী আন্দোলনের সাথে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করতে তীব্র প্রচেষ্টা চালাই। তখন রাখী দাশ দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসেন। সে নেতা হিসেবে, সংগঠক হিসেবে অলরাউন্ডার ছিল। সারাদেশে সংগঠনের নেটওয়ার্ক সূচারুরুপে গড়ে তুলতে তার অবদান ছিল অপরিসীম। মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে দুঃসময়ে কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছে। সংগঠনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের ক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজের ক্ষেত্রে সে ছিল এক বড় শক্তি। ২০২০ এ প্রকৃতি পরিবেশ ভয়াবহ রূপ নিয়ে মানুষের সামনে উপস্থিত হয়েছে। অনেক মানুষকে হারিয়েছি, এসময়ে রাখী দাশের মত একজন সংগঠককে হারানো আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

প্রোগ্রাম অফিসার মোছাঃ ফজিলা খাতুন লতা বলেন প্রয়াত নেত্রী রাখী দাশের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন তিনি আমাদের কাছে ছিলেন এক বটবৃক্ষের মত, সকলকে ভালবাসতেন। তিনি বলতেন আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। তিনি সকলের সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। কাজ শিখতে এবং কাজ এগিয়ে নিতে তিনি সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। নিজের শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে তিনি সংগঠনের কাজকে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। সংগঠনের ৫০ তম প্রতিষ্ঠাবাষির্কীর কাজ সম্পাদন করতেও তিনি প্রচন্ড শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও সবসময় ছিলেন আন্তরিক এবং তৎপর।

ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক রেহানা ইউনূস বলেন তিনি সর্বক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন। এখনো কাজ করার সময় প্রতিমুহূর্তে তিনি সঙ্গে আছেন এমন অনুভব করি। সংগঠনের ৫০ বছরের পূর্তি হয়েছে। সংগঠনের জন্মলগ্ন থেকে আধুনিক সময়ে কাজ করতে তার দূরদর্শীসম্পন্ন দিক নির্দেশনা সবসময়ই সহযোগিতা করেছে আমাদের। তিনি ছিলেন এক তুখোড় সংগঠক। ঢাকা মহানগরকে গড়ে তুলতে তার অবদান ছিল অপরিসীম। মানুষ গড়ার কারিগর রাখী দাশ কেবল একটি নাম নয় বরং একটি প্রতিষ্ঠানের নাম।

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক-এর সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা বলেন ২০০৮ সাল থেকে রাখী দির সাথে আমার খুব ভালো যোগাযোগ গড়ে ওঠে। আমাকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। আদিবাসীদের অধিকার আন্দোলনে সবসময়ই যুক্ত ছিলেন। মহিলা পরিষদের আমাদের নিবিড় সম্পর্ক তৈরির পিছনে তার অবদান অপরিসীম আমরা কোনোদিন তার আদর্শ ভুলব না, তিনি আমাদের অন্তরে থাকবেন সব সময়।

আবৃতিকার লায়লা আফরোজ বলেন রাখী দাশ সারাজীবন দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেলেন অথচ মৃত্যুর পর তাকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্যদেশে দাহ করা হয়, সমাধিস্ত করা হলো এটা অত্যন্ত বেদনার। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ২দিন পর তিনি আমাদের বাসায় আসেন। তাকে নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়। তখন থেকে আমাদের যোগাযোগ হয়। অনেক যুদ্ধশিশু ছিলো। তাদের নিয়ে একটি লেখা তিনি রাখী দাশের উদ্দেশ্যে স্মৃতিচারণ করেন।

প্রয়াত রাখী দাশের পারিবারিক সদস্য এবং রগ্রেস বইকি কোঃ লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার মৌসুমি দাশ পুরকায়স্থ সংগঠনের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন মহিলা পরিষদের কাজের বাইরে ছোট দিদির মৃত্যু আমাদের পঙ্গু করে দিয়েছে। আমাদের পরিবারের অন্যতম অভিভাবক ছিল সে, যেকোনো সমস্যায় বড় আশ্রয় ছিলো সে। পড়াশোনা করার সময়ে সে ছাত্র আন্দোলনের সাথে এবং সাংগঠনিক কাজে যুক্ত হয়। ১৯৮১ সালে বাবার মৃত্যুর পর সে মায়ের পাশে শক্ত হয়ে দাড়িয়েছিলো বেঁচে থাকার সাহস যুগিয়েছিলো। চাকরি করে আমাদের দেখাশোনা করেছে। তিনি নতুন সংগঠক তৈরি করার জন্য রাখী দাশের লেখা গুলো একত্র করে প্রকাশ করার জন্য এবং কেস হিসেবে তার জীবনী সংকলনের জন্য সংগঠনের প্রতি অনুরোধ জানান।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন রাখী দাশ এবছরের গত ৬ এপ্রিল সকলকে একলা করে বড় দুঃসময়ে চলে যান। সংগঠনের এক অক্লান্ত পরিশ্রমী নিবেদিত প্রাণ ছিলেন তিনি। তাকে হারিয়ে আমরা বাকরুদ্ধ। সংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। সকল পর্যায়ের সাংগঠনিক নেত্রীদের সাথে সাংগঠনিক সম্পর্ক তৈরিতে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তার পেশাগত জীবনে অর্জিত প্রশাশনিক দক্ষতাকে আমরা কাজে লাগিয়েছি, সংগঠনের আর্থিক কর্মপরিচালনায়, নীতি নির্ধারণে তার মতামত গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্ভাবনীমূলক কাজে তার আগ্রহ ছিল অনেক। তিনি অসময়ে চলে যাবেন ভাবেননি। তার প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তিনি সবসময় আমাদের হৃদয়ে থাকবেন।

সংগঠনের সহ-সাধারণ সম্পাদক মাসুদা রেহানা বেগম বলেন আমাদের প্রায় ৫০ বছরের বন্ধুত্ব। তাকে নিয়ে স্মরণসভায় বলতে হবে এটি কখনো ভাবিনি। ইডেন কলেজে পড়ার সময় আমাদের যোগাযোগ। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে যেমন আমরা যুক্ত ছিলাম তেমনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য নিজ চেতনা কে নিয়ে এগিয়ে গেছি, প্রশিক্ষণ নিয়েছি। নারী প্রতি বৈমষ্য দূর করে সমতার নীতিতে সে আপোষহীন ছিল। পরিবারকে যেমন আগলে রেখেছিল তেমনি সংগঠনের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলো। সে চলে গেছে, তার রেখে যাওয়া কাজগুলো নারী-পুরুষের সমতার লক্ষ্যে আমাদের শেষ করার দায়িত্ব নিতে হবে, বাস্তবে পরিণত করতে হবে, তাহলেই আমাদের সার্থকতা।

বিশিষ্ট সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত বলেন রাখী জাতীয় পর্যায়ের এক পরিচিত মুখ ছিলো। সে ছাত্র রাজনীতি করার সময় সকল দায়িত্ব আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে পালন করেছে। সে প্রাণোচ্ছলভাবে চলত,মনের দিক থেকে তরুণ ছিলো সবসময়। একটা প্রতিকূল সময়ে পরিচিত মুখ হয়ে সে ছাত্রীদের নিয়ে আন্দোলন করে গেছে। পেশাগত জীবনেও সে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছে।

বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ রণেশ মৈত্র বলেন ৮০ এর দশকে আমাদের পরিচয় হয়। যত নারীকর্মী দেখেছি তারমত এমন দায়িত্বশীল, কর্তব্যনিষ্ঠ এবং একনিষ্ঠ মানুষ কমই দেখেছি। তার মহিলা পরিষদের কাজে কোন ত্রুটি দেখিনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে এবং চেতনায় অনেক পরিবর্তন দেখা যায়। বঙ্গবন্ধুর গড়া দল ক্ষমতায় থাকার পরও তার প্রতিকৃতি ভাঙা হচ্ছে। এমন অবস্থায় তিনি বেঁচে থাকলে সকলকে এক করে আন্দোলন করতেন। করোনাকালের বিপর্যয়ে তাকে দেশে আনা সম্ভব হলো না। এটা অনেক দুঃসহ বেদনা। মহিলা পরিষদের জেলাব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি সকল সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন।

প্রয়াত রাখী দাশের পারিবারিক সদস্য বহ্নি দাশ পুরকায়স্থ বলেন তিনি আমার মায়ের মত ছিলেন। কাছ থেকে তাকে দেখেছি কিভাবে মানুষ হয়ে উঠতে হয়, সাহসী হতে হয় সর্বোপরি সৎ হতে হয়। সততার ব্যাপারে কখনো আপস করেনি। আজ রাখী দি অনেক দূরে চলে গেছে, এই বিশাল পৃথিবীতে এখন নিজেকে অনেক একা মনে হয়।

সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন যতদিন মহিলা পরিষদ থাকবে ততদিন রাখী দাশকে আমরা স্মরণ করব। রাখীর মানুষের প্রতি বিশেষ করে মাতৃস্থানীয় মানুষের শ্রদ্ধাবোধ ছিল প্রবল। এটা তাকে বিনয়ী হতে সাহায্য করেছে। কাজে তার সৃজনশীলতা লক্ষ্যণীয় ছিলো। কাজের গুরুত্ব তার কাছে ছিলো সবচেয়ে বেশি। শারীরিক অসুস্থতাকে আমলে নেয়নি, তাই আজ বড় ক্ষতি হয়ে গেল। তার দেখানো সেই স্বপ্নগুলো আমাদের বাস্তবে পরিণত করতে হবে। সে ছিলো একটা দীপ যে সকলকে আলোকিত করে গেছে। তিনি রাখী দাশের লেখাগুলো নিয়ে কাজ করার আহবান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

সভায় আলোচনার পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি করা হয় এবং সংগীত পরিবেশিত হয়। কবিতা আবৃতি করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার লায়লা আফরোজ এবং অ্যাড. রাখী দাশ পুরকায়স্থের ভাগ্নি নম্রতা মনস্বী বসু।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা