kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

পদ্মাপার থেকে পদ্মা সেতু

মোস্তফা মামুন   

১১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৪:১১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পদ্মাপার থেকে পদ্মা সেতু

পদ্মা যে আমাদের জাতীয়তার একটা পরিচয় সেটা প্রথম টের পাই কলকাতায় গিয়ে। সেখানকার পত্রিকায় বাংলাদেশের প্রতিশব্দ হিসেবে দ্বিতীয় বা তৃতীয় লাইনেই চলে আসে পদ্মা, বাংলাদেশ মানে ওদের কাছে পদ্মাপার। শুধু পত্রিকায় নয়, লৌকিক-মৌখিক আলোচনায়ও পদ্মার সরব উপস্থিতি। একজন আমাকে আরেকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এ হচ্ছে অমুক। বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।’

‘বাংলাদেশ! পদ্মাপার!’ শ্রোতা মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকলেন। বাংলাদেশ না পদ্মা—কোনটা ওর কাছে বেশি গুরুত্বের ঠিক বোঝা গেল না। পরে বোঝা গেল, পদ্মা। দেখা হলেই চিৎকার, ‘কী হে! পদ্মাপার।’ ‘পদ্মাপার আছ কেমন?’ কখনো কখনো পদ্মা নদীর মাঝির সঙ্গে মিলে পদ্মাপারের সাংবাদিকও হয়ে গেলাম। কালকের পর সেই পদ্মামুখী মানুষটির মুখ খুব মনে পড়ছে। আচ্ছা, এখন কি আমি বা আমরা পদ্মাপার থেকে পদ্মা সেতুর দেশের মানুষ হয়ে গেলাম! হয়ে গেলাম বোধ হয়।

সভ্যতার ইতিহাস নদীরই ইতিহাস। নদীতীরেই গড়ে উঠেছে বাজার, গঞ্জ, শহর। এই যোগাযোগের বিস্তৃতিতেই আজকের পৃথিবী। আমাদের জীবন অন্যদের চেয়ে আরো বেশি নদীভিত্তিক। ‘বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ’ ‘জালের মতো ছড়িয়ে আছে নদীরা’ পাঠ্যবইয়ের এই বাক্যগুলো পড়তে পড়তেই আমাদের বেড়ে ওঠা। পড়েছি কিন্তু খুব ধারণ করিনি বোধ হয়। অন্য দেশে নদী নিয়ে যে আবেগ, সেটার কোথায় যেন অভাব আমাদের জীবনে। কারণও আছে। কলকাতায় যখন গঙ্গার ধারে বসে প্রেম করা নিয়ে কাব্য হয়, আমরা তখন বুড়িগঙ্গার নোংরা ঘেঁটে আর দখলদারদের মামদোবাজি দেখে ক্লান্ত। ‘এই পদ্মা’ দিয়ে ফরিদা পারভীন যতই সুর ওঠান, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্মা নদীর মাঝিকে যতই মহীয়ান করুন, ঘন কুয়াশায় ফেরিতে ১০ ঘণ্টা আটকে থাকলে রোমান্টিকতা জানালা দিয়ে দৌড়ে পালায়। আর তখন অন্যরা মেতে থাকে নৌবিহারের উল্লাসে। আমরা থাকি নৌ দুর্ঘটনার ভীতিতে। পদ্মার ইলিশ বিদেশি মেহমানদের খাবারের পাতকে লোভনীয় করে, আর ওদিকে আমরা বিষণ্ন। মনে পড়ে, গত ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় কী ভোগান্তিই না হয়েছিল! ৮-১০ ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হলো। বাড়ি পৌঁছার আগেই ঈদের নামাজ শেষ। সেতু, সেতুটার অভাবেই নদী যত না আবেগ, তার চেয়ে বেশি আশঙ্কা। পদ্মার এই সেতু সব খচখচানি ঘুচিয়ে নদী আর পানির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কও ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই সেতু তাই যেমন প্রয়োজনের তেমনি মায়ারও।

প্রথমবার টেমস দেখে এমন অবাক হয়েছিলাম! এই সামান্য নদী নিয়ে অত কথা। ডিকেন্সদের কাব্য-সাহিত্যকে লন্ডনের সেই বিকেলে ফোলানো গালগল্প মনে হতে থাকল। মেলবোর্নের ইয়ারা নদী বিখ্যাত। কারণ, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে একে পটভূমিতে রেখে পোজ দেন বিজয়ীরা। জিম কুরিয়ার ১৯৯২ সালে শিরোপা জেতার পর আত্মহারা হয়ে ইয়ারাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, যা মিথ হয়ে আছে আজও।  কিন্তু  দেখে সেই মন খারাপের গল্প। খুব জোরে দৌড়ে এসে লাফ দিলেই মনে হয় পার হয়ে যাওয়া যাবে। অথচ এই নদী নিয়েই ওদের কী আদিখ্যেতা। একদিন এক ট্যাক্সি ড্রাইভার খুব ইয়ারাপ্রেম দেখাচ্ছিল। বিরক্ত হয়ে শেষে সঙ্গী বন্ধু বললেন,  ‘আরে রাখো তোমাদের এসব নদী! আমাদের নদী এত বড় যে এক প্রান্তে দাঁড়ালে আরেক প্রান্ত দেখা যায় না।’

ড্রাইভারটি একটু চিন্তায় পড়ে গেল যেন। তারপর ভেবে-টেবে বলল, ‘নো ম্যান, দ্যাট ইজ কল্ড সি।’

সে ভেবেছে আমরা সাগরকেই ভুল করে নদী ভেবে এসেছি। ওদের কাছে নদী মানে তো আমাদের খাল বা এর চেয়ে সামান্য প্রশস্ত কিছু। কিন্তু খালের মতো ছোট ছোট সব নদী নিয়ে গর্বে বুক ফোলানোর কারণ বোধ হয় সেতু। চারদিকে সেতু। নদীজনিত কোনো বিঘ্নতাই নেই জীবনে। আর এসব সময় আমরা ম্রিয়মাণ হয়ে থাকতাম এই একটা ঘাটতির জন্য। সেই বকেয়া গৌরব এবার কড়ায় গণ্ডায় পুষিয়ে দেবে প্রমত্ত পদ্মার বুকে অকৃত্রিম বাংলাদেশি সাহসিকতার এই ছবি। যে ছবিতে একই সঙ্গে সোচ্চার হয়ে আছে দানবের শক্তিকে হারানোর শৌর্য। বিশ্বব্যাংক তো আমাদের চুষে চুষে বেড়ে ওঠা দানবই। এই সেতু আসলে মানবীয় বিশ্বাসের কাছে দানবীয়তার হারের স্থিরচিত্রও।

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ আর্থিকভাবে পিছিয়ে। প্রথমবার সেখানে গিয়ে মনে মনে কারণ অনুসন্ধানে গেলাম। খেয়াল করে দেখলাম, দারিদ্র্যের প্রধানতম কারণ ঢাকা বা মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব। এই অঞ্চল একসময় ভারতের সঙ্গে খুবই সংযুক্ত ছিল। পাকিস্তান বা বাংলাদেশ হওয়ার পর সেই যোগাযোগ আর সম্ভব নয়। এখন যোগাযোগ হতে হবে ঢাকার সঙ্গে। কিন্তু হবে কিভাবে! মাঝখানে যে যমুনা। সেই বাধা তাদের কাছে এমন দুর্লঙ্ঘ্য যে সেই অঞ্চলের মানুষ আর ঢাকামুখী নয়। নিজেদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। তাই শিল্পায়ন নেই। কাজকর্ম নেই। সবার মধ্যে হাহাকার, যদি যমুনা সেতু হয়ে যায় তাহলে নতুন জীবন। হয়ে গেল। এবং তারপর উত্তরবঙ্গও এখন মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে নতুন অর্থনৈতিক প্রবাহের পথে। দক্ষিণাঞ্চল তখনও খুব আশা করেনি। যমুনা সেতু করতেই প্রায় জীবন বেরিয়ে গিয়েছিল। সিনেমা দেখতে সারচার্জ। ট্রেনে উঠলে সারচার্জ। আর পদ্মা সেতু যমুনার তুলনায়ও এলাহী কারবার। এ সম্ভব নয়। শুধু এক চিলতে আশা, বিশ্বব্যাংক এবং বিদেশি বন্ধুরা যদি এগিয়ে আসে। যদি ওরা ঋণ দেয়...। নামে ঋণ এলে ভিক্ষা। সেই ঋণরূপী ভিক্ষা নিতে গিয়ে যে মেরুকরণ আর সমীকরণ, কূটনীতি আর রাজনীতির মারপ্যাঁচ তাতে একটা সময় সব ভেস্তে যেতে বসেছিল। কিন্তু কিছু কিছু অন্ধকার যেমন আলোর মশালের দিকে ঠেলে নিয়ে চলে, এখানেও সেই ঘটনা। এই দুর্ঘটনাতেই আমরা দুর্জয়।

পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছিল কি হয়নি, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেতুর খরচ বারবার বাড়ানোটা পরিকল্পনার ভুল না উদ্দেশ্যমূলক অপব্যয়—সেসব  অনেক প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গেছে। যেগুলোর হয়নি সেসবের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু প্রশ্নগুলো সেদিনই আলোচনায় পেছনের কাতারে চলে গেছে, যেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন, নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করবেন। রাজনৈতিক নেত্রীর উচ্চাভিলাষ, বিরোধীরা বিদ্রুপের সুযোগ পেল। আমরাও ঠিক অতটা ভরসা করতে পারলাম না। মনে পড়ে, যমুনা সেতুর জন্য মুঠো পেতে টাকা জোগাড়ের গল্প। অর্থনীতিবিদরাও খুব অনুকূল মত দিলেন না। কিন্তু নেতা বা প্রধানমন্ত্রী তখনই রাষ্ট্রনেতা হয়ে ওঠেন যখন সবাই যা ভাবে না তাই করে দেখান। লক্ষ্যে অবিচল, পরিকল্পনায় অটল, বিশ্বাসে স্থির থেকে যা যা হলো তাতে সেই আকাশচুম্বী আশা আজ বাতিঘর হয়ে পদ্মার বুকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হতবুদ্ধি ইংরেজ জাতিকে বাগ্মিতা আর বিচক্ষণতায় একীভূত করে চার্চিল হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক, কাস্ত্রোরা নায়ক হয়েছেন প্রাণ হাতে নিয়ে করা দীর্ঘ যুদ্ধে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী গোলা-বারুদের যুদ্ধ করেননি। কিন্তু যুদ্ধ জিতেছেন। নিজের টাকায়, নিজের শক্তিতে করা এই স্থাপনায় দাসত্বের বাঁধনটাও আলগা হলো। এতকাল বিদেশিরা আমাদের দিত। সঙ্গে দাসও বানাত। রাজনৈতিক দাসত্ব ১৯৭১ সালে গেছে। অর্থনৈতিক দাসত্বের মুক্তি বোধ হয় কাল ঘটল। এর পরও নানা আয়োজনে-প্রয়োজনে বিদেশি বন্ধুদের সহায়তা লাগবে। পৃথিবীর আর্থিক নিয়মেই। কিন্তু পদ্মার এই সাহসী আয়োজনটা আমাদের সমতায় নিয়ে গেল। এখন সব হবে সমানে সমানে। ঋণ হবে। ভিক্ষা নয়। সহযোগিতা নেব। শাসন নয়। এই যুগে অর্থনীতির সক্ষমতাই কূটনীতিতেও শক্তি নির্ধারণ করে। কালকের পর খুব সম্ভব কূটনীতির টেবিলের পায়াগুলো আরো শক্ত। সবাই জানল, যোগ্য মর্যাদা না দিলে এরা বিগড়ে যেতে পারে। পদ্মা সেতুতুল্য কাণ্ড করে পাল্টা জবাব দিয়ে দেবে। অতএব সমঝে চল।

যতই এসব ভাবি ততই মনে হয়, এই সেতুতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যে অর্থনৈতিক প্রবাহ বাড়বে, দেশ যে একীভূত হলো—এগুলো আসলে গৌণ বিষয়। সাধারণের খালি চোখে দেখার জিনিস।

আসল বিষয় অন্য। এই সেতু দেশকে নিয়ে গেল অনন্য উচ্চতায়। এমন উচ্চতায়—যেখানে সহযোগিতা চলবে। শাসন নয়। দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক হতে পারে। দাসত্ব নয়।

আর তখন সেতুটাকে আরো মায়াময় লাগে। এটাকে মোটেও আর রড-সিমেন্ট-কংক্রিটের স্থাপনা দেখায় না। এটা হয়ে ওঠে আমাদের মুক্তির মিনার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা