kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সরকারি কলকারখানা বন্ধ করা সমাধান নয়

এম হাফিজউদ্দিন খান   

৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৩:১১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সরকারি কলকারখানা বন্ধ করা সমাধান নয়

দেশে সরকারি মালিকানাধীন পাটকলগুলো বন্ধ হতে হতে সর্বশেষ ২৬টিতে এসে ঠেকেছিল। চলতি বছরের জুলাই মাসে মহামারি আক্রান্ত অর্থনীতির এই সময়ে অবশিষ্ট সব পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এর পাঁচ মাসের মাথায় এবার রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকলের ছয়টি বন্ধ ঘোষণা করা হলো। সরকারি চিনিকল কমতে কমতে এখন ৯টিতে এসে ঠেকল। রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো নিয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করছে, তাতে অবশিষ্ট ৯টি চিনিকলের পরিণতি কী হবে, তা অনুমান করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বন্ধ করে দেওয়াই কি সমাধান? উপায় না থাকলে বন্ধ করে দেওয়া অবশ্যই সমাধান; কিন্তু উপায় যখন আছে, তখন তা কেন কাজে লাগানো হবে না? সমস্যার সমাধান হিসেবে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে আরো কিছু সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, সেদিকটাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাই ছয়টি চিনিকল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত খুবই দুঃখজনক।

ছয়টি চিনিকল এমন সময় বন্ধ করা হলো যখন আখ মাড়াইয়ের মৌসুম চলছে। প্রথম এই এলাকাগুলোর বহু মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য আখ চাষের ওপর নির্ভরশীল। আর এখানে কাজ করছে হাজার হাজার শ্রমিক। সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, বন্ধ ঘোষণা করা চিনিকল এলাকার উৎপাদিত আখ অন্যান্য চিনিকলে নিয়ে মাড়াই করা হবে। কিন্তু উৎপাদিত আখ কতটা চালু থাকা চিনিকলগুলোতে পৌঁছবে তাতে সংশয় থাকাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে অনেক মানুষ এখনো বেকার রয়ে গেছে। বন্ধ হওয়া চিনিকলগুলোর শ্রমিকদের বেতন আপাতত চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেটা কত দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এবং এরপর শ্রমিকরা কী করবেন, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে একটা উদ্বেগ থেকেই যাবে।

সমস্যার সমাধান হিসেবে চিনিকলগুলো বন্ধ করায় নতুন করে বড় যে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা হলো উত্তরবঙ্গে শিল্প-কারখানা কমে যাওয়া। আমাদের মনে রাখা দরকার, এমনিতেই উত্তরবঙ্গ দেশের একটি পশ্চাদপদ এলাকা। সেখানে কলকারখানা বলতে গেলে নেই। এখন একসঙ্গে এতগুলো মিল বন্ধ করে দেওয়ায় আর্থ-সামাজিকভাবে গোটা উত্তরবঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় চিনিকলগুলো বন্ধের আগে আরো চিন্তা-ভাবনা করা দরকার ছিল।

দুই মাস ধরেই ছয়টি চিনিকল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে রূপ নিল; কিন্তু এই চিনিকলগুলো বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো গবেষণা বা সমীক্ষার কথা জানা গেল না। শুধু লোকসান হচ্ছে এই কারণ দেখিয়ে কারখানাগুলো বন্ধ করা হলো। কিন্তু লোকসানের পেছনে যথাযথ কারণ কেউ জানতে পারল না। এখন সংশ্লিষ্ট চিনিকলের শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছেন এবং সেটাই স্বাভাবিক।

কয়েক বছর ধরে এই চিনিকলগুলোর লোকসান বেড়ে যাচ্ছিল। লোকসানের পরিমাণটাও অনেক। ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে এই কারখানাগুলো। তারা শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না; কিন্তু লোকসানের কারণ চিহ্নিত করে এর প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা কেন করা হয়নি? সুগার মিল বলেন, পাটকল বলেন—সরকারি কলকারখানাগুলো সম্পর্কে আমরা সাধারণভাবে জানি, রাষ্ট্রায়ত্ত মিল কারখানাগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়ম আছে। লোকসানের প্রধান কারণই দুর্নীতি ও অনিয়ম। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় আমি নিজেও দেখেছি, পাটকলের পাট কেনার সময় কম দামে কিনে বেশি দামে দেখাতেন কর্মকর্তারা। বিজেএমসির যাঁরা পারচেজার ছিলেন, তাঁদের এ কাজ করতে আমি নিজে দেখেছি। আমার চোখের সামনে এমনটা হয়েছে, আমি প্রতিবাদও করেছিলাম; কিন্তু কারখানাগুলোতে দুর্নীতি বন্ধের কোনো উদ্যোগ কখনো দেখা যায়নি।

দুর্নীতিকে আড়াল করে কারখানার উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত লোকবল ও কাঁচামালের অভাবকে লোকসানের কারণ বলা হচ্ছে। কথা হলো, আমাদের মেশিনারিজ যদি পুরনো হয়ে থাকে, যদি উৎপাদনক্ষমতা কমে যায়, তাহলে তার আধুনিকায়নে সমস্যা কোথায়? অর্থের সমস্যা থাকলে সরকার পর্যায়ক্রমে চিনিকলগুলো আধুনিকায়ন করতে পারত।

সরকারি কলকারখানার লোকসানের পেছনে আরেকটি কারণ হলো ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার অভাব। তাহলে সরকারি চিনিকল কেরু অ্যান্ড কম্পানিতে কেন লোকসান হয় না? এই চিনিকলের বাইপ্রডাক্ট কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি লাভবান হয়েছে। তার মানে এখানে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কম। করোনাকালে কেরু অ্যান্ড কম্পানি বাইপ্রডাক্ট হিসেবে হ্যান্ড সেনিটাইজার উৎপাদন করে সাড়া ফেলেছে। তাহলে আমরা কেরুর অভিজ্ঞতা কেন অন্যান্য সরকারি কারখানায় কাজে লাগাতে পারলাম না?

চিনিকলগুলোর কাঁচামালের অভাবের কথা বলা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে একরপ্রতি আখ উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না কেন? বাংলার চিনির মান একসময় ভালো ছিল বলে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি এখানকার চিনি রপ্তানি করে আমাদের ঘাটতি পোষাত আমদানি করা চিনি দিয়ে। বাংলাপিডিয়া সূত্রে জানা গেল, একরপ্রতি উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। এখানে প্রতি একরে আখ উৎপাদন হয় মাত্র ১৫ টন। অথচ কিউবায় প্রতি একরে ৩৬ টন, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৫ টন, অস্ট্রেলিয়ায় ৫৫ টন এবং হাওয়াইয়ে ৭০ টন আখ উৎপাদিত হয়। বলা হয়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সাফল্যের জায়গা হচ্ছে কৃষি গবেষণা। তাহলে কৃষি গবেষণার মনোযোগটা আখে দেওয়া হলো না কেন? তার মানে আমাদের কাঁচামালের ঘাটতি পূরণের কোনো পূর্ব প্রস্তুতি আমরা নিইনি। বিপরীতে অতিরিক্ত লোকবলের কারণে চিনির উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। অথচ দেশেই বেসরকারি চিনিকলগুলো ভালো মুনাফা করছে। তারা বিদেশ থেকে মণ্ড এনে চিনি উৎপাদন করছে। তাহলে বেসরকারি চিনিকল পারলে সরকারি চিনিকলগুলো পারবে না কেন? আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একটা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হলো, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুবিধার্থে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লোকসানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। বাস্তবতা যা-ই হোক, এই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণ করার দায়টাও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর।

এসব পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে চিনিকলসহ সরকারি কলকারখানাগুলোকে লাভজনক করতে হলে প্রথমেই অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রায়ত্ত বাকি কারখানাগুলোও টিকিয়ে রাখা যাবে না। এ ছাড়া কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ও উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করা, অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের কারণ নির্ণয় ও সমস্যার সমাধান করা, ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী জনবলকাঠামো তৈরি, কাঁচামাল সংগ্রহে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা এবং কারখানাগুলোর মূল পণ্যের পাশাপাশি এর উপজাত বা বাইডাক্ট কিভাবে বাড়ানো যায় সেদিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বাস্তব কারণগুলো বিবেচনা করে ছয়টি চিনিকল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা