kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

স্বৈরাচার পতন দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

বাহালুল মজনুন চুন্নু   

৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৩:০৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বৈরাচার পতন দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে দেশে মানুষ সংগ্রাম করছে, ঝরাচ্ছে তাজা প্রাণ। কারণ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত জনকল্যাণ। সাম্রাজ্যবাদের বিলুপ্তি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ফ্যাসিবাদ, নািসবাদ, রাজতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে গতিশীল করে তুলেছে। স্যামুয়েল হান্টিংটনের মতে, গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে বিশ্বময় গণতন্ত্রের ঢেউ শুরু হয়েছে। দেশে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক সরকার। এর মূল কারণ শুধু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাতেই রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের সরাসরি সুযোগ এবং জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের কাছে জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা। আব্র্রাহাম লিংকন বলেছেন, গণতন্ত্র হলো জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের শাসন। অর্থাৎ জনগণকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় গণতন্ত্র। বাংলাদেশে গণতন্ত্র এসেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের হাত ধরে। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্রের হাতে পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে ঘৃণ্য কালো অধ্যায় রচিত হয়েছিল, তার মাধ্যমে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ও এরশাদ বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সামরিক স্বৈরতন্ত্র জারি বাঙালিকে নিষ্পেষিত করে নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে কেড়ে নিয়েছিল বাঙালির সব অধিকার। কিন্তু বাঙালির মানসে বিরাজমান প্রতিবাদী চেতনা স্বৈরতন্ত্রকে মেনে নিতে পারেনি। তাইতো দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রাণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন ঘটিয়েছিল বাঙালি ১৯৯০ সালে। আজ ৬ ডিসেম্বর, স্বৈরাচার পতন দিবস। এই দিনেই এরশাদ গণ-আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে। দিবসটি তাই বাঙালির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সরকারকে উৎখাত করে সামরিক শাসন জারির মাধ্যেমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। বাংলাদেশের সংবিধান রহিত করে সামরিক আইনে জারীকৃত সব বিধি-বিধান ও আদেশকে দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর দেশের রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে একের পর এক গণবিরোধী ধারা প্রবর্তন করতে থাকেন। তাঁর অন্যায়, স্বেচ্ছাচারিতা বাংলার মানুষ মেনে নিতে পারেনি। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য রাজপথ কাঁপিয়েছিল বাঙালি। এরশাদ তাঁর ৯ বছরের শাসনামলে আন্দোলন-সংগ্রাম প্রতিহত করতে কত মানুষকে যে হত্যা করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর হরতালের সময় নূর হোসেনকে স্বৈরাচার এরশাদের বাহিনী গুলি করে। নূর হোসেনের বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক—গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা ছিল। নূর হোসেন নিজের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়ে এ দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রামকে বেগবান করেছিলেন। তাঁর আত্মদান বাঙালিকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শক্তি জুগিয়েছিল, অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। এরশাদবিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যেই ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর জেহাদ নামে একজন ছাত্র পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এর প্রতিবাদী আন্দোলনে ২৪টি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের উপস্থিতিতে গড়ে উঠেছিল সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য, যাদের তীব্র আন্দোলন এরশাদের গদিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এরশাদকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।

নব্বইয়ের নভেম্বর মাসটি ছিল উত্তাল এক মাস। ২৭ নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যা ছিল আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে দখল করার জন্য বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ডা. মিলনকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে দ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। ডা. মিলনের মৃত্যুর প্রতিবাদে স্বৈরাচার সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ডাক্তার ও আইনজীবীরা ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ওই দিন বিকেলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। আন্দোলন দমনের জন্য এরশাদ সরকার ওই দিন রাত ৯টা থেকে জরুরি অবস্থা জারি করে। ১ ডিসেম্বর দেশে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে হরতালে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু লোক হতাহত হন। একমাত্র মিরপুরেই বিডিআরের গুলিতে ছাত্র, গার্মেন্ট শ্রমিক ও ইটভাঙা শ্রমিকসহ নিহত হন আটজন। সারা দেশে আরো অনেকেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। পরদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিক্ষোভ সমাবেশে উত্তাল ছিল সারা দেশ। লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে শুধু এরশাদের পদত্যাগেরই স্লোগান দেয়নি, এরশাদকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানায়। আন্দোলন এত তীব্র আকার ধারণ করে যে সেনাবাহিনী জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এরশাদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করে।

এরশাদের বিরুদ্ধে চলমান গণ-আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা সেনানিবাসে ১৯৯০ সালের ১ ডিসেম্বর এক জরুরি বৈঠক করেন শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তারা। আন্দোলন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত—এটাই ছিল ওই বৈঠকের মূল এজেন্ডা। ওই বৈঠকের পর ডিসেম্বরের ৩ তারিখে তখনকার সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূরউদ্দীন প্রেসিডেন্ট এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেনা কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন যে সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূরউদ্দীন যেন প্রেসিডেন্ট এরশাদকে পদত্যাগের জন্য সরাসরি বলেন। একদিকে তীব্র গণ-আন্দোলন আর অন্যদিকে সেনাবাহিনী থেকে সমর্থন প্রত্যাহারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এরশাদের। মূলত সেনাবাহিনীর মনোভাব বোঝার পরই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি এরশাদ। ডিসেম্বরের ৪ তারিখ রাতেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন জেনারেল এরশাদ। এই ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারফিউ এবং জরুরি অবস্থার বিধি-নিষেধ অমান্য করে জনতা রাস্তায় রাস্তায় বিজয় মিছিল, উল্লাস আর নৃত্য শুরু করে। দীর্ঘ ৯ বছরের তীব্র শোষণ-নিপীড়ন ও যন্ত্রণার অবসানে মানুষ আবার নতুন করে সুন্দরভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখা শুরু করে। ৫ তারিখে বিরোধী দলগুলো প্রস্তাব করে যে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপরাষ্ট্রপতি বানিয়ে এরশাদ পদত্যাগ করবেন এবং তারপর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নির্দলীয় সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন। ৬ ডিসেম্বর দুপুর ২টার দিকে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এরশাদ নবনিযুক্ত উপরাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। গণতন্ত্র অভিমুখে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। গণতন্ত্রের সেই অভিযাত্রার কারণেই আজ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। স্বপ্ন দেখছে উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছার।

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা