kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

করোনাযোদ্ধাদের ক্ষতিপূরণ: টাকা ছাড়ে কচ্ছপগতি

বাহরাম খান ও সজীব হোম রায়   

৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০২:২২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনাযোদ্ধাদের ক্ষতিপূরণ: টাকা ছাড়ে কচ্ছপগতি

দায়িত্ব পালনের সময় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। প্রতিশ্রুত সেই ক্ষতিপূরণের টাকা আক্রান্ত একজনের হাতেও ওঠেনি। যাঁরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভালো হয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন, তাঁরা আর ক্ষতিপূরণ পাবেন কি না তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। তবে যাঁরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, তাঁদের কিছু পরিবার ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছে। যেসব পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, তাদের মধ্যে প্রথম সারির করোনাযোদ্ধা চিকিৎসক মাত্র একজন। মারা যাওয়া সরকারি কর্মচারীদের পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণও চলছে কচ্ছপগতিতে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনায় মারা যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৪২ জনকে ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত চিকিৎসক, সেবিকা, পুলিশ ও প্রশাসনের ৩০ হাজারের মতো সরকারি কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে করোনার দায়িত্ব পালনের সময় মারা গেছেন আনুমানিক ১৪০ জন।

করোনায় সরকারি কর্মচারীদের ক্ষতিপূরণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম দিকে যে ভীতিকর পরিস্থিতি ছিল, সেই সময় ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে রিজেন্ট কেলেঙ্কারির হোতা শাহেদচক্রের মাধ্যমে ভুয়া করোনা সনদ বানানোর খবর চাউর হওয়ার পর বিষয়টিতে পেছনে হাঁটে অর্থ মন্ত্রণালয়। বর্তমানে করোনা সংক্রমণের ব্যবস্থাপনায় ভীতিকর পরিস্থিতি অনেকটাই কেটে গেছে। তাই প্রথম দিককার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি আপাতত বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।

করোনার সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাঁরা সামনের সারিতে কাজ করে করোনা আক্রান্ত এবং মারা গেছেন, তাঁদের জন্য গত ৭ এপ্রিল ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ পরিপত্র জারি করে। করোনার শুরুর দিকে আতঙ্কের মধ্যে চিকিৎসক, সেবিকা, পুলিশের অনেক সদস্য আক্রান্ত হয়ে কেউ কেউ মারাও যান। তখন জরুরি সেবা কার্যক্রম চালানোর জন্য সরকারি কর্মচারীদের অনেকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্মুখ সারিতে কাজ করা অবস্থায় করোনা আক্রান্ত হয়ে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কাজ চলবে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাগজপত্র কয়েক দফা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর টাকা ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

গত এপ্রিলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মচারীদের ক্ষতিপূরণের কথা নির্দিষ্টভাবে জানানো হয়। এতে চিকিৎসক, সেবিকা, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ মহামারির সময়ে কাজ করা সরকারি কর্মীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। এতে ১৫ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের কেউ আক্রান্ত হলে পাঁচ লাখ টাকা এবং মৃত্যুতে ২৫ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। ১০ থেকে ১৪ গ্রেডের কর্মচারীদের কেউ আক্রান্ত হলে সাড়ে সাত লাখ টাকা, মৃত্যুতে সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা এবং ১ থেকে ৯ গ্রেডের কর্মচারীদের কেউ আক্রান্ত হলে ১০ লাখ টাকা এবং মৃত্যুতে ৫০ লাখ টাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ রাখে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ কোটি টাকার মতো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।

এই ঘোষণায় কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের কথা উল্লেখ করা হলেও আদতে মহামারিকালে সব সরকারি কর্মীর ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে। এই কারণে প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু সরকারি কর্মচারীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করায় সে বিষয়ে অনেকটা অস্পষ্টতা ছিল। পুলিশের মধ্যে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ হাজার ১০৩ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৮০ জন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সেক্রেটারি জেনারেল এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও টাকা অনুমোদনের পরও এখন পর্যন্ত একজনমাত্র চিকিৎসককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে এ পর্যন্ত দুজন সচিব এবং ২৯ জন পুলিশ সদস্য মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। অথচ করোনার সম্মুখযুদ্ধে সবচেয়ে সামনের সারিতে থেকে উপেক্ষিত চিকিৎসকরা। এর কারণ কী তা আমরা জানি না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি স্থগিত আছে। আর আমাদের চিকিৎসকদের মধ্যে যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের তালিকা মন্ত্রণালয় থেকে চেয়ে নিয়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) ডা. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১৫ জন ডাক্তার মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।

এদিকে সরকারি কর্মচারীদের ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করা হলেও সরকারে থাকা রাজনীতিবিদদের কী হবে তা নিয়ে ঘোষণা নেই। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তাঁর ছেলে শেখ মোহাম্মদউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে কেউ মারা গেলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছে কি না জানি না।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, যাঁরা করোনাসংক্রান্ত কোনো দায়িত্ব পালনকালে মারা গেছেন, শুধু তাঁদেরই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। করোনাসংক্রান্ত সনদের বিষয়ে বিভন্ন ধরনের প্রশ্ন ওঠার ফলে এই বিষয়ে বেশি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। এই কারণে হয়তো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা