kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী   

৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৪:০৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন

বিদ্যাসাগরের কাজের দিকে তাকানো যাক। তাকানোটা দরকারও। ওই কাজ আমাদের ঐতিহ্যের অন্তর্গত। বিধবা বিবাহ বৈধকরণ তাঁর একটা বড় কাজ। আর একটা কাজ বাংলা গদ্যকে শিল্প-সৌন্দর্যসম্পন্ন করা। কাজ দুটি আসলে অভিন্ন। কারণ দুটিই সামাজিক। মেয়েদের দুঃখ নিরসন করে যেমন, বাংলা গদ্যের আড়ষ্টতা ঘুচানোর মধ্য দিয়েও তেমনি সমাজে তিনি চলমানতা আনতে চেয়েছেন। বিদ্যাসাগরকে সমাজসংস্কারক বলা হয়। সে উপাধি কিন্তু তাঁর জন্য পর্যাপ্ত নয়। তিনি সমাজে সংস্কার আনাটাকে যথেষ্ট মনে করেননি, চেয়েছিলেন সমাজ রূপান্তর। তাঁকে বরঞ্চ সামাজিক বিপ্লবের অগ্রপথিক বলাটা সংগত। তিনি ছিলেন পুরোপুরি ইহজাগতিক। বলা যায় ধর্মনিরপেক্ষ।

বিদ্যাসাগরের জন্ম, শিক্ষা ও অবস্থান—সবই ছিল একটি সামন্তবাদী পরিবেশে। ইংরেজের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি ও ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন সমাজে এক ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিও গড়ে উঠছিল। তিনি মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিতে গভীরভাবে প্রোথিত ছিলেন। স্তম্ভের মতো নয়, বৃক্ষের মতো। ভালো বেতনের সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন অল্প বয়সেই। কারণ চাকরি তাঁর কাছে অসম্মানজনক বোধ হচ্ছিল। আত্মসম্মানবোধের ক্ষেত্রে তিনি পেটি বুর্জোয়া নন, বুর্জোয়াই ছিলেন। সামন্তবাদী সংস্কার ও শিক্ষার বন্ধন যেমন ছিন্ন করেছিলেন, তেমনি অসম্মত ছিলেন অবনত হতে। এই গুণ সমাজে তখন বিরল ছিল। সরকারি চাকরি যখন ছেড়ে দেন তখন তিনি কী করে খাবেন—গুঞ্জন উঠেছিল এই প্রশ্নে। ওঠাটাই স্বাভাবিক। তিনি দরিদ্র ছিলেন। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘বলে দিও বিদ্যাসাগর আলু-পটল বেচে খাবে, তবু অসম্মানের চাকরি সে করবে না।’ আলু-পটোল না বেচলেও বই বেচেছেন যে সেটা তো ঠিক। নিজে বই লিখেছেন, সে বই নিজে ছাপিয়েছেন, ছাপানোর জন্য ছাপাখানা খুলেছেন, বই বিক্রিও নিজেই করেছেন, বিক্রির জন্য নিজস্ব দোকান খুলেছিলেন। বইগুলো পাঠ্যপুস্তক; ভালো বিক্রি হয়েছে। অর্থাগম কম ঘটেনি। কিন্তু বড়লোক হননি। উপার্জিত অর্থ ব্যয় করেছেন শিক্ষাবিস্তারে, বিধবা বিবাহ উৎসাহিতকরণে এবং ব্যক্তিগত বদান্যতায়।

পুঁজিবাদের আধিপত্যের কালে ব্যক্তিগতভাবে মুনাফামনস্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। আবার এটাও সত্য যে অবস্থাপন্ন ঘরের মানুষের ভেতর থেকেই বড় মাপের সমাজবিপ্লবীরা বের হয়ে এসেছেন। বিদ্যাসাগর তো দরিদ্র অবস্থা থেকে নিজের উদ্যোগ ও কর্মের মধ্য দিয়ে অর্থ উপার্জন করেছিলেন; কিন্তু তিনি মোটেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির লালসায় আবদ্ধ ছিলেন না; তাঁর ঝোঁক সামাজিক পরিবর্তনের দিকেই, সে অর্থে তিনি শ্রেণিতে আটক থাকেননি, স্বেচ্ছায় ও স্বীয় উদ্যমে শ্রেণি অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। সদ্য উদ্ভিন্ন তখনকার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের ভেতর স্বদেশচেতনা তৈরি হয়েছিল, কেউ কেউ ইংরেজ শাসন নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন; কিন্তু বিদ্যাসাগর যেভাবে এগিয়ে গেছেন সেভাবে ও সেই মাত্রায় কেউই এগোতে পারেননি। কিছু সহযাত্রী অবশ্যই পেয়েছিলেন। কিন্তু একসময় দেখলেন, তিনি একেবারেই একা। সঙ্গের বন্ধুরা অনেকেই পিছিয়ে পড়েছেন, দু-একজন বিশ্বাসঘাতকতা পর্যন্ত করে বসেছেন। বিদ্যাসাগর বুঝলেন এই শ্রেণিকে দিয়ে কাজ হবে না। সমাজ রূপান্তরের কাজের জন্য দরকার ছিল কৃষকের কাছে যাওয়া। কিন্তু যাওয়া সম্ভব ছিল না। বাধা ছিল পরিবেশ ও পরিস্থিতির; জমিদারি ব্যবস্থার আবেষ্টন মোটেই অকার্যকর ছিল না। কিন্তু তিনি তাঁর কালের মধ্যবিত্তদের কাছ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এদের সহায়তা পাবেন না, সেটা বুঝে ফেলেছিলেন। কিন্তু হতাশ হয়ে তিনি ধর্মের কাছে চলে যাননি। আবেদন-নিবেদনওয়ালাদের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসেও যোগ দেননি, যার কার্যক্রম তত দিনে শুরু হয়ে গিয়েছিল, অথবা কলকাতায় বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করেননি। তিনি চলে গেছেন সাঁওতালদের কাছে, তাদের পল্লীতে।

বিদ্যাসাগর সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, প্রশ্নই ওঠেনি। তাঁকে বলা চলে একজন খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী। তিনি ভারতবর্ষের কথা অবশ্যই বলেছেন। না বলে উপায় ছিল না। ভারতবর্ষ ছিল একটি রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা। কিন্তু মনেপ্রাণে তিনি বাঙালি ছিলেন। সে জন্যই নিজে তিনি মাতৃভাষার চর্চা করেছেন। মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে জ্ঞানের চর্চা চলুক—এমনটা চেয়েছেন। সেই লক্ষ্যে কাজ করেছেন। এই যে ইংরেজি ভাষাকে সরিয়ে রেখে বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ, এটি কিন্তু উপনিবেশের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করারই নামান্তর। একে নীরব রাষ্ট্রদ্রোহিতাও বলা চলে। ইংরেজ শাসকরা চাইছিলেন শিক্ষিতরা সবাই একেকজন নকল সাহেব হোক। তাদের নিজেদের ভাষা চলে যাক ইংরেজি ভাষার অধীনে। বেশির ভাগই সেটা মেনেও নিয়েছেন। বিদ্যাসাগর মেনে নেননি। তাঁর ধ্বনিটা ছিল, চর্চা চাই মাতৃভাষার। জ্ঞানার্জন হবে মাতৃভাষার মাধ্যমে। এর জন্য বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে। তাইতো তিনি মনোযোগ দিয়েছিলেন সাহিত্যসৃষ্টিতে এবং সফলও হয়েছেন। তিনি যে গদ্যরীতি তৈরি করে রেখে গেছেন আমরা তা-ই ব্যবহার করছি, নতুন নতুন সংযোজন যুক্ত করে, আরো বিকশিত করে নিয়ে।

সেকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক ছিল তিন দিক থেকে। লৈঙ্গিক, শ্রেণিগত ও সাম্প্রদায়িক। তাঁর নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগর নারী-পুরুষের ভেদাভেদটা খুব পরিষ্কারভাবে এবং গভীর মর্মবেদনার সঙ্গে দেখতে পেয়েছেন। নারীকে তিনি মুক্ত করতে চেয়েছেন; তারা পুরুষের সমান হবে, এই আশা থেকে নয়, তারা মানুষের মানমর্যাদা পাবে এই কল্পনা থেকে। ঔপনিবেশিকতার ও সামন্তবাদিতার শক্তিকে দুই শৃঙ্খলে আবদ্ধ বঙ্গভূমিতে পুরুষরাও তো পরিপূর্ণ মানুষের মতো ছিল না, তাদের মতো হওয়াটা আর কত বড় অর্জন! তবে নারী যদি পুরুষের সঙ্গে এসে যোগ দেয়, তাহলে সমাজ তো অবশ্যই এগিয়ে যাবে। বিদ্যাসাগরের চিন্তা ছিল সে রকমের। সবচেয়ে বড় বিভাজনটা অবশ্য ছিল শ্রেণির। বিদ্যাসাগর সেটা জানতেন, ততটা পরিষ্কারভাবে নিশ্চয়ই নয় যেমনভাবে তাঁরই ইউরোপীয় সমসাময়িক কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-৮৩) জানতেন। তাঁর আশা ছিল, মধ্যবিত্তকে শিক্ষিত করতে পারলে সে শিক্ষা মেহনতিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে। বাস্তবে অবশ্য সেটা ঘটেনি। ঘটা সম্ভবও ছিল না। কেননা বিদ্যা যে পেয়েছে সে অন্যকে সেটা দিয়ে দিতে চায়নি, ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে কাছে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। বিদ্যার্জন শ্রেণিদূরত্বকে মোটেই কমায়নি, উল্টো বাড়িয়েই দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী অনৈক্যের তৃতীয় কারণটি ছিল সাম্প্রদায়িক। হিন্দু-মুসলিমের ধর্মপরিচয়গত পার্থক্যটা তো ছিলই, অর্থনৈতিক বৈষম্যও ছিল। কিন্তু ধূর্ত ইংরেজ সেই বৈষম্যকে কাজে লাগিয়েছে বিরোধ বাধানোর লক্ষ্যে। কখনো এপক্ষের দিকে কখনো অপর পক্ষের দিকে ঝুঁকে দুই সম্প্রদায়ের ভেতর বিদ্বেষ বৃদ্ধি করাতে চেষ্টার কোনো কার্পণ্য করেনি। বিদ্যাসাগরের সময়ে অবশ্য বিরোধটা তেমন জমে ওঠেনি। কারণ তখনকার বাংলাদেশে শিক্ষিত বাংলাভাষী মুসলমানরা দৃশ্যমান ছিল না। বাংলার মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিশিষ্ট ছিলেন নবাব আবদুল লতীফ (১৮২৬-৯৩), নিজে তিনি উর্দুভাষী ছিলেন এবং তাঁরা যে ‘মহামেডান লিটারারি সোসাইটি’ গঠন করেছিলেন সেখানে সাহিত্যচর্চা বাংলা ভাষায় হতো না, হতো উর্দু ভাষায়। এর মধ্যেই বাঙালি মুসলমানরা যখন গুটি গুটি এগিয়ে এসেছে তখনই শুরু হয়েছে বিরোধ। উসকানি ছিল ইংরেজের; কিন্তু সহনশীলতার অভাব ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদীদের, যারা নিজেদের সমাজেই তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষকে মর্যাদার অযোগ্য জ্ঞান করত, যে জন্য বিদ্যাসাগর তাঁর সংস্কৃত কলেজে শূদ্রদের জন্য দরজা খুলে দিতে পারলেন না। অগ্রসর অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত বর্ণবাদী হিন্দুরা মুসলমানদের কোনো প্রকার ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল না, পরবর্তী সময়ে সীমিত ভোটাধিকারের মধ্যে হলেও মুসলমানরা ভোটের শক্তি অর্জন করায় রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে তারা যখন কিছুটা আত্মসচেতন হয়ে উঠল এবং দাবি তুলল স্বতন্ত্র আবাসভূমির, তখন দেখা গেল ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণহিন্দুরা ভয় পাচ্ছে। পাছে বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়—এই ভীতিতে এমনকি দ্বিখণ্ডিত করে হলেও বাংলার একাংশ নিজেদের জন্য ধরে রাখার অভিপ্রায়ে দেশভাগের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেল। বঙ্গভূমিকে দখল করার জন্য ১৭৫৭-তে বণিকবেশে যে ইংরেজ ঢুকেছিল এবং দখল করে সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচার চালিয়ে এবং পাশাপাশি শিল্পোদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে দেশটিকে নিঃস্ব করে ফেলছিল, ১৯৪৭-এ তারাই বাংলার মানুষের ওপর সর্বনাশা দ্বিখণ্ডিতকরণ চাপিয়ে দিয়ে গেল। বাঙালির জাতীয়তাবাদ শ্রেণি ও লৈঙ্গিক বৈষম্যে দুর্বল হয়েই ছিল, সাম্প্রদায়িক বিভাজনে সেটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল; এক ভাগের পরিচয় হলো ভারতীয়, অপর ভাগের পরিচয় দাঁড়াল পাকিস্তানি। এপার-ওপার দুই পারই দীর্ঘশ্বাস ফেলল পরস্পরের দুর্দশা দেখে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা