kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ধারে চলছে ২১ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ

তৌফিক মারুফ   

৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৩:২৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ধারে চলছে ২১ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ

দেশে মেডিক্যাল শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সাধারণত প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজগুলোকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অনুমোদনের সময় দেওয়া সব শর্ত পূরণ না করায় এখনো কয়েকটি প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ কালো তালিকাভুক্ত হয়ে আছে; যারা নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারছে না। আর সরকারি বা বেসরকারি সব ক্ষেত্রে মেডিক্যাল কলেজের পূর্বশর্ত হচ্ছে—কলেজের সঙ্গে থাকতে হবে ছাত্র-ছাত্রীর আনুপাতিক হার অনুসারে রোগীসংবলিত হাসপাতাল। কিন্তু শুধু প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে নয়, নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় চলছে হাসপাতালের ঘাটতি। বিশেষ করে দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে ২১টি কলেজের নিজস্ব কোনো হাসপাতাল নেই। কোনোমতে ধার করা হাসপাতাল দিয়ে চলছে এই মেডিক্যাল কলেজগুলো।

এ ছাড়া অনেক মেডিক্যাল কলেজে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং অন্যান্য জনবল ও সার্বিক পরিবেশ। এর মধ্যেই সরকার নতুন আরো চারটি মেডিক্যাল কলেজ করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র। অন্যদিকে দেশে এখন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী, মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও মান রক্ষায় ভারসাম্য ধরে রাখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ শিক্ষার্থী অনুপাতে নেই মেডিক্যাল শিক্ষার পর্যাপ্ত শিক্ষক। এর মধ্যে অধ্যয়নের মূল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে অবস্থা বেশ করুণ।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, যে কলেজগুলোতে হাসপাতাল ছিল না বা নেই সেগুলোতে এখন হাসপাতাল স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। কয়েকটি কলেজে হাসপাতালের জন্য প্রকল্প প্রস্তুত হচ্ছে। তবে কক্সবাজার, পাবনা, যশোর ও নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে নানা ধরনের জটিলতায় এগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া সম্প্রতি আরো চারটি কলেজের হাসপাতালের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। কয়েকটি হাসপাতাল এখনো সদর হাসপাতালের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রাকটিক্যাল সামলাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘কলেজগুলোর ক্ষেত্রে মানগত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষকসংকট কাটাতে আমরা বিকল্প হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদেরই আবার চুক্তিতে কাজে লাগাচ্ছি। এ ছাড়া প্রমোশনও দেওয়া হচ্ছে। তবু ঘাটতি থাকছেই।’

দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন স্বাস্থ্যশিক্ষা খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, যদি দেশের মেডিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা ও মান বাঁচাতে হয় তবে এখনই আর একটিও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করা ঠিক হবে  না। তাঁদের ভাষায়, আশপাশের দেশের তুলনায় আমরা এমনিতেই অনেক বেশি মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করে ফেলেছি, যেখান থেকে মানহীন অসংখ্য ডাক্তার বের হচ্ছে আর মানহীন চিকিৎসা বাড়ছে বা প্রশ্ন উঠছে। এই বিশেষজ্ঞরা বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেখানে প্রতি ২৪ লাখ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একটি মেডিক্যাল কলেজ, পাকিস্তানে ১৮ লাখ জনসংখ্যায় জন্য একটি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে ১৩.৮ লাখ জনসংখ্যার জন্য একটি মেডিক্যাল কলেজ আছে। এরপর আরো চারটি করার কথা বলা হচ্ছে।

পড়াশোনার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে এত মেডিক্যাল কলেজ, এত হাসপাতাল, এত চিকিৎসক থাকতেও মানুষ বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘২০ বছর পুরনো মেডিক্যাল কলেজে আমরা ৭০ শতাংশ বিষয়ে শিক্ষক দিতে পারিনি, বেসিক সায়েন্সের ৭০ শতাংশ কলেজে ন্যূনতম শিক্ষক নেই।’

সম্প্রতি কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ পরিদর্শন করে আসা একজন কর্মকর্তা তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কালের কণ্ঠকে বলেন, কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজটিতে ফরেনসিক আর ফার্মাকোলজিতে একজন শিক্ষকও নেই। অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা ক্লাস নেন, কিন্তু তাঁরা পরীক্ষায় বসতে পারেন না। একটা বিষয়ের পরীক্ষায় ইন্টারন্যাল পরীক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীরা কেমন অসহায় বোধ করে তা যে কেউ বুঝতে পারে।

ওই পরিদর্শক বলেন, কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষে শুরু হয়েছে, ১১-১২ বছর কেটে গেছে, কিন্তু এখনো নিজস্ব হাসপাতাল নেই। দুই-তিন কিলোমিটার দূরের জেলা সদর হাসপাতালে তাদের রোগী দেখে হাতে-কলমে শিখতে হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, তীব্র যানজটের শহর কক্সবাজারে মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাস থেকে শহরের সদর হাসপাতালে আসা-যাওয়ার জন্য পাঁচ বছর ছাত্রজীবনের আট মাস ব্যয় হয়।

ওই কলেজের গাইনি বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপককে উদ্ধৃত করে তিনি, ‘কলেজে পড়িয়ে তারপর শিক্ষার্থীদের প্রাক্টিক্যাল ক্লাসের আওতায় রোগী দেখানোর জন্য সদর হাসপাতালে যেতে যেতে সময় চলে যায়,  রোগী দেখানোর প্রাকটিক্যাল সেশনের সময় পাওয়া যায় খুব কম।’

এদিকে নতুন মেডিক্যাল কলেজের জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তাব পাঠায়নি বলে জানা গেছে। তার পরও কোন বিবেচনায় আরো চারটি মেডিক্যাল কলেজ করতে চায় মন্ত্রণালয় তা ঠিক বুঝতে পারছেন না মন্ত্রণালয়েরই সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো কর্মকর্তা। তাঁদের প্রশ্ন—স্বাস্থ্যশিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কিভাবে নেওয়া হচ্ছে?

স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘নতুন কোনো মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ব্যাপারে আমরা কোনো প্রস্তাব পাঠাইনি। কিভাবে নতুন চারটি কলেজের প্রসঙ্গ এসেছে তা আমার জানা নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা