kalerkantho

সোমবার । ১১ মাঘ ১৪২৭। ২৫ জানুয়ারি ২০২১। ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কেরানীগঞ্জ আ. লীগে ৩২ মামলার আসামি

কমিটিতে যুবদল নেতা ও ধর্ষণ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি; ত্যাগীরা বঞ্চিত

হায়দার আলী   

৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০২:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কেরানীগঞ্জ আ. লীগে ৩২ মামলার আসামি

একে একে ৩২ মামলার আসামি আবু সিদ্দিক ওরফে গাল কাটা সিদ্দিক। সন্ত্রাস, মাদকের কারবার, চাঁদাবাজি, মন্দিরের জমি দখলের মতো নানা অভিযোগে ভুক্তভোগীরা কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় এসব মামলা করেছেন। এই সন্ত্রাসী মাদক কারবারির সন্ত্রাস-জুলুম থেকে রেহাই পাননি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। সেই গাল কাটা সিদ্দিক এখন কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির ৩ নম্বর সদস্য। একইভাবে কমিটিতে ঢুকে পড়েছেন উপজেলার হযরতপুর ইউনিয়ন যুবদলের সহসভাপতি আরিফুল ইসলাম সেলিমও। এই সেলিম আবার বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি মেজর শরিফুল হক ডালিমের ফুফাতো ভাই। জোট আমলে এই সেলিমের ক্যাডার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন একই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আয়নালসহ বহু নেতাকর্মী। একইভাবে কমিটিতে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন ধর্ষণ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি নাজমুল জাহান রিপন।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রভাবশালী এক নেতার প্রত্যক্ষ মদদে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ইউসুফ চৌধুরী সেলিম মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে কমিটিতে অপরাধীদের জায়গা করে দিয়েছেন। সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি, ধর্ষক এমনকি বঙ্গবন্ধুর খুনির ভাই যুবদলের নেতাকেও আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হয়েছে। অথচ দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এবং জোট সরকার আমলে হামলা-মামলার শিকার ত্যাগীদের কমিটিতে জায়গা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে পল্টিবাজ সেলিম নামে পরিচিত ইউসুফ চৌধুরী সেলিমকে। তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে মোস্তফা মহসিন মন্টুর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন গণফোরামে। গণফোরামে যোগ দিয়েই তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ নানা বক্তব্য দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে জাতীয় পার্টির সাইফুর রহমানের লাঙল প্রতীকে ভোট কেনার জন্য তাঁকে ছুটতে দেখা গেছে। এরপর ২০০১ সালে তিনি বিএনপিতেও যোগদান করেছিলেন। এবার সেই ইউসুফ চৌধুরী সেলিমের হাত ধরেই কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটিতে একের পর এক জায়গা করে নিয়েছেন ভয়ংকর সন্ত্রাসী, একাধিক মামলার আসামিসহ বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা ক্যাডাররা।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাল কাটা সিদ্দিকের ভয়ংকর হামলার শিকার হন তারানগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি দুলাল খান ওরফে দুলাল মেম্বার। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘কেরানীগঞ্জ ও আশপাশের প্রতিটি থানায় গাল কাটা সিদ্দিকের নামে মামলা আছে। একাধিকবার এই সন্ত্রাসীর হামলার শিকার হয়েছি। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। আমার বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে, গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই আবু সিদ্দিক থানা আওয়ামী লীগের পদ বাগিয়ে নিয়েছে।’

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, জোট সরকারের আমলে সাবেক এমপি আমান উল্লাহ আমানের ভাই উসমান গণির সঙ্গে মিলে মেজর ডালিমের ফুফাতো ভাই আরিফুল ইসলাম সেলিম এবং তাঁর ক্যাডাররা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম করত। বিশেষ করে সেলিম ইউনিয়ন যুবদলের সহসভাপতি থেকেই উসমান গণির সঙ্গে মিলে ত্রাসের রাজত্ব চালিয়েছিলেন। ওই সময় ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার হন হযরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আয়নাল।

ক্ষোভ মেশানো কণ্ঠে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘উসমান গণি ও সেলিমের লোকজন আমার বাড়িঘর ভাঙচুরসহ লুটপাট করেছিল। ১৪ বার জেল খেটেছি। আমাকে না পেয়ে ৮০ বছরের বৃদ্ধ বাবাকে মারধর এবং বোনের চুল কেটে দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। ওরা আমার ১৪টি অস্ট্রেলিয়ান গাভি লুট করে নিয়ে যায়। আর সেই হামলাকারী সন্ত্রাসীরাই এখন আওয়ামী লীগের পদপদবি পায়, রাজার হালে থাকে। এটা দেখে খুবই কষ্ট পাই; বুক ফেটে কান্না আসে।’

এদিকে বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা বিতর্কিত নেতা এবং সন্ত্রাসী-মাদক কারবারিরা আওয়ামী লীগের কমিটিতে ঠাঁই পেলেও কঠিন সময়ে নির্যাতন আর জেল-জুলুমের শিকার ত্যাগী নেতারা বঞ্চিত। জোটের সময় তারানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন ডা. জয়নাল আবেদীন। বিএনপির শাসনামলে ভুয়া অস্ত্র মামলায় ১১ মাস জেল খাটেন। হামলা মামলার শিকার হয়ে এলাকাছাড়া ছিলেন বছরের পর বছর। ২৩ বছর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলেও এখন থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটিতে তাঁর ঠাঁই হয়নি।

ডা. জয়নাল আবেদীন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘দলের জন্য জেল খাটছি, বাড়িছাড়া ছিলাম। স্বাধীনতার পর থেকে নৌকা আর আওয়ামী লীগ ছাড়া কিছুই বুঝিনি। আর এখন কমিটিতে ঠাঁই পাই না। বিএনপি-জামায়াতের লোকজন কমিটিতে জায়গা পায়। অপরাধীরা দাপটে দল নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি, কিছুই বলার নাই।’

বিএনপি-জামায়াতের আমলে ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন রফিকুল ইসলাম হিলটন। বর্তমানে তিনি হযরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। হিলটন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আরিফুল ইসলাম সেলিম করত যুবদল। সে এখন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। আমরা দলের দুঃসময়ে হামলা-মামলার শিকার হয়েছি, কিন্তু আমরা ভালো পদে যাওয়ার সুযোগ পাই না।’

একইভাবে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত উপজেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাবেক সভাপতি হাজি আজাহার বাঙ্গালী, উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি হাজি মোশতাক হোসেন, জিনজিরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন নোভেল, কালিন্দি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হাজি মোজাম্মেল হোসেনসহ অর্ধশত ত্যাগী নেতাকে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে রাখা হয়নি।

নবগঠিত কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক ইউসুফ চৌধুরী সেলিমের বক্তব্য জানতে গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকে কয়েক দফা মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা