kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা

বেহাত হয়ে যাচ্ছে এতিমের টাকা

জহিরুল ইসলাম   

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৩:২৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বেহাত হয়ে যাচ্ছে এতিমের টাকা

রাজধানীর আজিমপুরে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা। পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু সম্পদ। অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মে এসব সম্পদ রীতিমতো হাতছাড়া হতে বসেছে প্রতিষ্ঠানটির। আবার এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে অনেক দোকান। সেসব দোকান যাদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল, তারা ভাড়া পরিশোধ না করে উল্টো বেশি ভাড়ায় অন্যদের কাছে নতুন করে ভাড়া দিয়ে নিজেরাই আদায় করছিল ভাড়া। এসব কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে বর্তমানে আবার নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পুরান ঢাকার পুরান মোগলটুলীর ৯ নম্বর আবুল খায়রাত রোডে এই এতিমখানার ১৫ হাজার বর্গফুটের একটি স্থাপনা রয়েছে। এই স্থাপনার মধ্যে রয়েছে ৮৩০ বর্গফুটের একটি কক্ষ। ১৯৯৭ সালে কক্ষটি দোকান হিসেবে তিন বছরের জন্য ভাড়া নিয়ে এতিমখানার সঙ্গে চুক্তি করেন খালেদ জামিল আহমেদ আদিল নামে এক ব্যক্তি। কোনো ধরনের অগ্রিম না দিয়ে প্রতি মাসে বর্গফুটপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয় এক টাকা তিন পয়সা। কিন্তু থোক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৮০০ টাকা। ২০০০ সালে ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। তবে নতুন করে আর চুক্তি না করে আগের চুক্তিতেই সব কিছু চলতে থাকে। এভাবে চলে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। এরপর ১১ বছর ওই সামান্য ভাড়াও আর পরিশোধ করা হচ্ছে না। এতিমখানার নথিপত্রে দেখা গেছে, এই ১১ বছরে ভাড়া বাকি পড়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৮০০ টাকা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এভাবে এতিমখানার বিভিন্ন স্থাপনা যারা ভাড়া নিয়েছিল, তাদের প্রত্যেকেরই চুক্তির মেয়াদ বিভিন্ন সময়ে শেষ হয়ে গেছে। আবার প্রথমে যারা এতিমখানার কাছ থেকে ভাড়া নেয় পরে তারা অন্য ব্যক্তিদের কাছে বেশি ভাড়ায় তা ফের ভাড়া দেয়। এভাবে বর্তমানে যারা দোকান চালাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগ এতিমখানার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ নয়। এতিমখানার এসব সম্পদ হয় পরের ভাড়াটিয়াদের দখলে অথবা এতিমখানা থেকে বহিষ্কৃত সাবেক শিক্ষার্থী হারুন বাহিনীর দখলে।

২০১৭ সালে এক অফিস আদেশে ১৮ বছর পার করা এতিমখানার ৬১ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। তবে ওই আদেশের পরও হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে ১৫ জন থেকে যায়। এদের মধ্যে রয়েছে রুবেল হাওলাদার, জুয়েল আহমেদ, শামীম আহমেদ, আল-আমিন, ইউসুফ মোল্লা, নাইমুল ইসলাম শেখ, মোত্তাকিন খান, ইমদাদ, দেলোয়ার হোসেন, সেলামত খাঁ ও নজরুল ইসলাম প্রমুখ। এদের নিয়েই হারুন তার বাহিনী গড়ে তোলে। এরাই এতিমখানার কর্মচারীদের থাকার জায়গা দখল করে। এ ছাড়া ভুয়া রসিদে এতিমখানার দোকান ভাড়া আদায়, অবৈধ দোকান বরাদ্দ দিয়ে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ে হারুন বাহিনী। শিক্ষার্থীদের গোপন টর্চার সেলে নিয়ে মারধর করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই বাহিনীকে একসময় সহায়তা দিতেন এতিমখানার সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা। বর্তমানে এতিমখানার অফিস সহকারী ইমদাদুর রহমান এবং বহিষ্কৃৎত আবাসিক শিক্ষক ইউছুফ মোল্লা হারুন বাহিনীকে সহায়তা দেন। 

স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার নতুন তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এতিমখানা চলে কার্যনির্বাহী কমিটির মাধ্যমে। এতিমখানার এসব অনিয়ম নিয়ে বর্তমানে অনুসন্ধান করছে তদন্ত কমিটি। দুই মাস আগে আমি এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর দোকানগুলোর ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে এই সময়ে প্রায় এক কোটি টাকা আদায় করেছি। এখনো অনেক টাকা বকেয়া। আশা করছি, তদন্ত কমিটির সুপারিশ পেলে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আশা করছি, চলতি মাসেই আপনাদের ভালো একটি খবর দিতে পারব।’

তিনি আরো বলেন, ‘একসময় এতিমখানার সাবেক বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী হারুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, এটা কেউ ভাবতে পারতেন না। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর সবাই নিজেদের অভিযোগের কথা বলতে শুরু করেছেন। আগে যাঁরা এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন।’

জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ভুয়া রসিদে এতিমখানার ৬৫টি দোকানের ভাড়া আদায় করত হারুন বাহিনী। বার্ষিক হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে আজীবন সদস্যদের দেওয়া টাকা নিয়েও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। এই সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার রসিদও এতিমখানার অফিস থেকে উধাও করে দেওয়া হয়েছে।

এতিমখানার নতুন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নূসরাত আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগের অনিয়মের কারণে চলতি বছরের শুরু থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে দোকানগুলোর ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। অনেক ধরনের অনিয়ম হয়েছে এখানে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিল দেখিয়ে টাকা তুলে নিয়ে জমা দেওয়া হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আজিমপুরে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা ভবনে চারটি, একই জায়গায় হাজি রফিক ভবনের নিচতলায় ১০টি, একই এলাকার ৪৮/১ হোল্ডিংয়ে নিচতলায় ১৫টি, দোতলায় ১৩টি, পাশের মেডিসিন মার্কেটে ১০টি, তার পশ্চিম পাশে ছয়টি, পুরানা মোগলটুলীর ৯ নম্বর আবুল খায়রাত রোডে পাঁটি দোকান রয়েছে। এ ছাড়া ২৭ পুরানা মোগলটুলীতে একটি, ৯১, কেপি ঘোষ স্ট্রিটে (গোর-ই-শহীদ মসজিদের বাড়ি) দুটিসহ মোট ৬৫টি দোকান/বাড়ি/গুদাম রয়েছে এই এতিমখানার। এসব দোকানের বেশির ভাগের ভাড়া বাকি।  এভাবে বকেয়া পড়েছে অন্তত ৭০ লাখ টাকা। 

অনেক দোকানে গিয়েই মূল দোকানিকে পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করে এক ব্যক্তি জানান, দোকানটি তাঁর কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এর জন্য মোটা অঙ্কের অগ্রিমও নেওয়া হয়েছে।

৪৮/৫-এ হোল্ডিংয়ের ব্যবসায়ী শাহ আলম এতিমখানায় অভিযোগ করেন, দুই বছর আগে হারুন বাহিনী তাঁর কাছ থেকে জোর করে একটি কাগজে সই নেয়। পরে তারা অন্য এক ব্যক্তির কাছে ওই দোকান ভাড়া দিয়ে দেয়।

শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দোকান দখল নিয়া নিছে হারুন বাহিনী। কয়েক দিন আগে এতিমখানা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। এখনো কিছু জানায়নি তারা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা