kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

টিকা সংগ্রহে হঠাৎ নতুন মোড়

তৌফিক মারুফ    

২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০২:৩৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টিকা সংগ্রহে হঠাৎ নতুন মোড়

দেশে হঠাৎ করেই করোনাভাইরাসের টিকা সংগ্রহ নিয়ে তৎপরতায় গতি ফিরতে শুরু করেছে। অক্সফোর্ড কিংবা কোভ্যাক্স থেকে টিকা পেতে দেরি হওয়ার আশঙ্কায় জনস্বাস্থ্যবিদরা বারবার সরকারকে বিকল্প উৎস হাতে রাখার পরামর্শ নিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি মডার্না ও ফাইজার টিকা চালুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) কাছে আবেদন করার পর এবং ভারত বায়োটেকের টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর তৎপরতা বাড়ে। এ ছাড়া দেশের গ্লোব বায়োটেকের টিকার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় আছে। গ্লোব বায়োটেকসহ পাঁচটি টিকার ট্রায়ালের প্রক্রিয়া অনেক দিন ধরে ঝুলে আছে, যা নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন রয়েছে সরকারের ভেতরে ও বাইরে।

এরই মধ্যে রাশিয়া, মডার্না, ভারত বায়োটেক, এমনকি ফাইজারের সঙ্গে সরকার ও বেসরকারি পর্যায় থেকে আবার যোগাযোগ শুরু হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সেই সঙ্গে অন্যগুলোর পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে ভারত বায়োটেকের টিকা।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভারত বায়োটেকের টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে ওই টিকার দিকে নজর বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় তরফ থেকেই ভারতের এই টিকা দেশে আনার ব্যাপারে আগাম প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভারত বায়োটেকের টিকার পরীক্ষাপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) ধীরগতি নিয়েও এক ধরনের অসন্তোষ শুরু হয়েছে সরকারের দায়িত্বশীলদের ভেতরে।

অক্সফোর্ডের টিকার সঙ্গে কাজ করা ভারতীয় একটি সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, ভারতে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া টিকার জন্য এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। যুক্তরাজ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এফডিএ কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেকোনো একটি থেকে অনুমোদন পেলেই দু-এক দিনের মধ্যে ভারতের মানুষ যাতে টিকা দিতে পারে, তেমন প্রস্তুতি সাজানো আছে।

ওই সূত্র জানায়, ভারতে যেদিন অক্সফোর্ডের টিকা সরবরাহ হবে সেদিন কিংবা দু-এক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশেও অক্সফোর্ডের টিকা ঢুকে যাবে—এমন প্রস্তুতিও আছে। যদিও বাংলাদেশ সরকারের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদনের ওপর সব কিছু নির্ভর করবে।

উল্লেখ্য, অক্সফোর্ডের টিকা পেতে সরকার একটি সমঝোতা চুক্তি এরই মধ্যে করে রেখেছে।

মডার্নার টিকা ৯৪.১ শতাংশ কার্যকর বলে ঘোষণা এবং এফডিএর কাছে আবেদন করার পর থেকে এই টিকার ব্যাপারে দেশে বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আগ্রহ বেড়েছে। ফাইজারের টিকা সংরক্ষণ তাপমাত্রা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিয়ে দুর্ভাবনা রয়েছে। মডার্নার টিকার সংরক্ষণ তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি হওয়ায় তুলনামূলক সুবিধাজনক বলে সরকার এখন সেদিকে নজর দিতে শুরু করেছে।

এত দিন দেশীয় টিকা উদ্ভাবনে এগিয়ে আসা প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না মিললেও গতকাল মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষাগার পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যসচিব মো. আব্দুল মান্নান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম, ঔষধ প্রশান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

গ্লোব বায়োটেক, চীনের সিনোভ্যাক্সসহ দুটি, ভারতের বায়োটেক ও সানোফি পাস্তুরের সম্ভাব্য টিকা পরীক্ষার বিষয়টি আইসিডিডিআরবিতে ঝুলে আছে। এর মধ্যে সিনোভ্যাক্স ও গ্লোব বায়োটেকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তি হয়েছে। অন্যদের বিষয়টি আবেদনপ্রক্রিয়ায় আছে।

স্বাস্থ্যসচিব মো. আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের মানুষকে কিভাবে দ্রুত করোনাভাইরাসের টিকার আওতায় আনতে পারি, সে জন্য তৎপর আছি। গ্লোব বায়োটেক পরিদর্শন করাও একটি অগ্রগতি। তারা আমাদের দেশের একটি প্রতিষ্ঠান। তারা একটি উদ্যোগ নিয়েছে, উদ্যোগটি যদি ভালো হয়, তবে আমাদেরই সবচেয়ে ভালো হবে। অনেক দিন ধরেই তারা আবেদন-নিবেদন করছিল আমাদের কাছে। আমরা সে জন্য দেখতে গেলাম তারা কী করছে, কিভাবে কাজ করছে। আমরা তাদেরকে সহায়তা করতে চাই। আমরা বলেছি, সব প্রক্রিয়া ঠিকঠাকভাবে এগিয়ে যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে তাদের টিকার অনুমোদন মেলে, অবশ্যই সরকার তাদের টিকা নেবে।’

গ্লোবের টিকাসহ মোট পাঁচটির পরীক্ষা ঝুলে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘আইসিডিডিআরবি একটি আলাদা ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলে। আমরা তাদের সঙ্গে প্রয়োজনমতো সহযোগিতা দিচ্ছি, যোগাযোগ রাখছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘গ্লোবের ব্যানকভিড নাম নিয়ে আমার ব্যক্তিগত একটি মতামত তুলে ধরেছি। ওই নামের পরিবর্তে আমি বঙ্গভ্যাক্স রাখার পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু সিদ্ধান্ত তাদের।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘আমাদেরকে গ্লোবের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাদের টিকাকেন্দ্রিক কার্যক্রম দেখতে, তাই আমরা গিয়েছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি) ডা. সামসুল হক বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। যেটা আগে আসবে সেটাই আমরা আগে শুরু করব। পাশাপাশি কোভ্যাক্স ও অক্সফোর্ডের টিকা ছাড়াও আরো কার্যকর টিকা সংগ্রহে আমাদের যোগাযোগ চলছে।’

গ্লোব বায়োটেকের গবেষণা সমন্বয়কারী ড. আসিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইসিডিডিআরবি প্রায় দেড় মাস আমাদের সময় নষ্ট করেছে। তারা আমাদের সঙ্গে চুক্তি করেও কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। আমাদের কিছু জানায়ওনি। ফলে তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হয়েছে বলে আমাদের চেয়ারম্যান আমাদেরকে জানিয়েছেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা