kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

এইডস দিবস ও সামাজিক সচেতনতা

ডা. মো. আশরাফুল হক   

১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৩:৫৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এইডস দিবস ও সামাজিক সচেতনতা

এইচআইভি নিয়ে সচেতনতার কাজ হচ্ছে অনেক বছর ধরেই। বছরে একটি দিবস পালিত হয় মানুষকে জানান দেওয়ার জন্য। সংবাদপত্রে ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়, বাণী প্রচারিত হয়, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো দিবসটি নিয়ে নানা কাজে ব্যস্ত থাকে, বিশেষ করে ব্যানার-ফেস্টুন নির্মাণের কাজে। ব্যানার নিয়ে, বিশেষ রঙের জামা পরে রাস্তায় কর্মসূচি পালন করলেই কি আমরা সবাইকে সচেতন করতে পারছি? হয়তো কাগজ-কলমের হিসাবে সেদিক দিয়ে সফল।

২০২০ সাল নাগাদ যে লক্ষ্য ছিল ৯০-৯০-৯০; মানে ৯০ শতাংশ মানুষ তাদের এইচআইভি অবস্থা জানবে, ৯০ শতাংশ মানুষ তাদের চিকিৎসার অবস্থা জানবে, ৯০ শতাংশ আক্রান্ত রোগী ভাইরাল লোডের চিকিৎসা পাবে। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৯৫-৯৫-৯৫। এসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় সফলতা অর্জনের জন্য।

বর্তমানে দেখা যায়, এইচআইভি আছে কি না তা জানা যায় রক্ত দান করতে গেলে। কিন্তু সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এই পরীক্ষা শুধু রোগের আলামত ধরতে পারে, নিশ্চিত করতে পারে না। এর সঙ্গে রয়েছে নিম্নমানের টেস্টিং ডিভাইসের সহজপ্রাপ্যতা। যেহেতু নিম্নমানের ডিভাইসের দাম কম, তাই ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানগুলো এসবের দিকে আকৃষ্ট হয়, যা দিয়ে রোগের আলামত ধরা পড়ে না।

যদি ধরা পড়ে কারো এইচআইভি জীবাণু রয়েছে, তাহলে তিনি সেটি নিশ্চিত হতে কোথায় যাবেন? সরকারিভাবে কোনো কোনো জায়গায় পরীক্ষা হয়। হতাশার বিষয় হলো, নানা কারণে সুনির্দিষ্টভাবে সারা বছর টেস্ট করার মতো সেন্টার চালু রাখা যাচ্ছে না। একবার কেউ পরীক্ষা করতে গিয়ে যদি জানতে পারে পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না, অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে পরবর্তী সময়ে টেস্ট করার জন্য। চিকিৎসা করার জন্য সুনির্দিষ্ট স্থান থাকলেও পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে, সঙ্গে সেগুলো সারা বছর চালু রাখার রাস্তাও বের করে রাখা প্রয়োজন।

লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রয়োজন এ কারণেই যে শুধু অনিরাপদ যৌনমিলনের কারণেই যে এটি ছড়ায়, তা নয়। অনেকভাবে ছড়াতে পারে। সারা দেশে অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে, যাতে প্রতিদিন অনেক কাজ হয় সিরিঞ্জ দিয়ে। সেগুলো কিভাবে ধ্বংস করা দরকার, তা অনেকের জানা থাকলেও সেটি কি হচ্ছে? হলে কিন্তু নেশাগ্রস্তদের হাতে এত সিরিঞ্জ আসে না। ঢাকার মাতুয়াইলে মেডিক্যাল বর্জ্য শোধনাগার রয়েছে; কিন্তু দুঃখের বিষয় ঢাকার অনেক প্রতিষ্ঠানই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকছে না। অলিগলিতে যেসব প্যাথলজি ও ব্লাড ব্যাংক রয়েছে তারা তো হিসাবের বাইরে। 

এইচআইভি টেস্ট করে যদি কারো পজিটিভ আসে, তাহলে তাকে সুনির্দিষ্ট ডাটাবেইসের অধীনে নিয়ে আসা হয়, নিয়মিত পরিসরে তার সঙ্গে যোগাযোগ সাপেক্ষে পরবর্তী কার্যাবলি নির্ধারিত হয়। প্রশ্ন থেকে যায় যার নেগেটিভ হয়েছে তার ক্ষেত্রে। তাকে মনিটর করা হয় কি না বা কত দিন পর আবার টেস্ট করানো হয় সেসব নিয়ে। কোনো কাজে সফলতার জন্য পূর্বনির্ধারিত দুটি বিষয় হলো জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা। কে কার কাছে জবাবদিহি করবে আর স্বচ্ছতা প্রদর্শনের স্থান কোনটি—এগুলো নির্ধারণ খুবই প্রয়োজন। আমার কাজ যিনি পর্যবেক্ষণ বা মূল্যায়ন করছেন তিনি বিষয় সংশ্লিষ্ট কি না তার ওপরও নির্ভর করে অনেক কিছু।

আবার স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে আমি যদি দেখি আমি পারফরম্যান্স না করেও কোনো পদ আঁকড়ে রাখতে পারছি ভিন্ন কোনো উপায়ে, তাহলে স্বচ্ছতা প্রদর্শনের দাবি কমে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সুনির্দিষ্ট সময় অন্তর পারফরম্যান্স হিসাব করে চাকরি বা অন্য সুবিধা মূল্যায়ন করে। তেমন কোনো কিছু এসব কাজের জন্য নিয়োজিতদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় কি না তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য আমাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা লাগে, যেখানে অনেক কিছু থাকে। আমাদের দেশে প্রবেশের জন্য কি কঠোর কোনো নিয়ম রয়েছে? কর্মসংস্থানের তাগিদে অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করে পরিবার-পরিজন ছেড়ে। তাদের মধ্যে সবাই যে নিরাপদ জীবন যাপন করে তা কিন্তু নয়। তাহলে তাদের মধ্যে কেউ আক্রান্ত হলে দেশে রোগের আমদানির রাস্তা কিন্তু উন্মুক্ত হয়ে যায়। এটি বন্ধ করা খুবই জরুরি।

জন্মনিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞাপনের অংশ হিসেবে দেখা যায়, ইদানীং অনিরাপদ মিলনের পর সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওষুধ খেলে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানধারণ থেকে নিরাপদ থাকা যাবে। প্রশ্ন হলো, একটি ওষুধ কি এইচআইভি থেকে আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারে? পারে না। তাই এসব বিজ্ঞাপন ব্যাপকভাবে প্রচারের আগে যাচাই করা প্রয়োজন, প্রচারিত হলেও বলা প্রয়োজন রোগের হাত থেকে নিস্তারের রাস্তা সঠিক কোনটি। শুধু কম্পানির মুনাফার কথা ভাবলেই হবে না। ধূমপানে বিষপান লিখেও আমরা ধূমপান কমাতে পারছি না। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এই অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ছে। সেখানে এ ধরনের বিজ্ঞাপনের ক্ষতিকারক দিক এখনই হিসাব করা দরকার।

একটি দিবস পালনের মাধ্যমে এই ভয়ংকর ব্যাধিকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তবে দিবসটির মাধ্যমে যদি উত্তরণের রাস্তা উন্মুক্ত হয়, তাহলে আমরা আশা করতেই পারি এ বছরই হয়তো আমাদের ভবিষ্যতের দুয়ার খুলে দেবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ব্লাড ট্রান্সফিউশন, শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা