kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

মাদক সন্ত্রাসে জিম্মি তারানগরের মানুষ

রেজোয়ান বিশ্বাস    

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০৩:৩০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাদক সন্ত্রাসে জিম্মি তারানগরের মানুষ

‘এখানে ওরে বাঁচাতে যে আসবি, তারেই জানে শেষ করে ফেলব। আর কেউ যদি প্রশাসনের কাছে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার দুঃসাহস করিস, তাহলে তাকে ঘর থেকে এনে জবাই করব।’

রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নে এক আওয়ামী লীগ নেতা ও জনপ্রতিনিধিকে প্রকাশ্যে মারধর শেষে এই ভাষায় হুমকি দিয়েছে এক মাদক সন্ত্রাসী। আবু সিদ্দিক ওরফে গালকাটা সিদ্দিক নামে পরিচিত এই সন্ত্রাসী ১৮টি মামলার আসামি হয়েও অধরা। তার অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে অনেকেই এলাকাছাড়া। পুলিশকে হুমকি দিতেও দ্বিধা করে না এই সন্ত্রাসী।

আবু সিদ্দিকের বর্বর হামলার শিকার হয়েছেন তারানগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর দুলাল খান। এ ঘটনায় মামলা করায় এবার তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়েছে সিদ্দিক ও তার বাহিনী।

দুলাল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকের কারবার, দখল ও চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়ায় সিদ্দিক ও তার মাদক বাহিনীর সদস্যদের মারধরের শিকার হয়েছি। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে আমি এলাকাছাড়া। আমার মতো আরো অনেকে এই বাহিনীর সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে ঘরছাড়া।’

সম্প্রতি সরেজমিনে তারানগর ইউনিয়নে গিয়ে জানা গেল, সংঘবদ্ধ মাদক কারবারিদের অবৈধ কর্মকাণ্ড পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বাধা দিতে গেলে তাকে টর্চার সেলে ধরে নিয়ে সন্ত্রাসীরা নির্যাতন চালাচ্ছে। বাড়িতেও হামলা চালাচ্ছে।

হামলার শিকারদের একজন ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী মো. শামীম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সিদ্দিক ও তার মাদক কারবারি বাহিনী আমার বাড়িতে হামলা চালায় এবং চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আমাকে গুরুতর জখম করে। ওই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা করায় আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা এখন হুমকির মুখে। ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারছি না।’ শামীমের বাবা মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘সিদ্দিক ও তার বাহিনী এলাকার ত্রাস। ভয়ে এদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না।’

জানা গেছে, সিদ্দিক ও তার সহযোগী মাদক সন্ত্রাসীরা পুলিশকেও ধমকের ওপর রাখার দুঃসাহস দেখায়। কালের কণ্ঠ’র হাতে আসা এমন একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ‘এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে কোরানীগঞ্জ থানা পুলিশের একটি টিম ওই এলাকায় গিয়ে দেখতে পায়, সিদ্দিক ও তার লোকজন এলাকার অনেককে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। এ সময় মিজানুর রহমান নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা ওয়াকিটকি হাতে পিকআপ থেকে নামতেই সিদ্দিক হুংকার ছাড়ে, ‘আপনে আইছেন ক্যান মিজানুর, যান যান; ওসিরে কন ফোন দিবার।’

গত ৭ নভেম্বর সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে তারানগর ইউনিয়নের আরো অন্তত ২০ জন মুরব্বির সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, সিদ্দিক ও তার ক্যাডার বাহিনীর মাদকের কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেরানীগঞ্জ ছাড়িয়ে ঢাকার হাজারীবাগসহ আরো কয়েকটি থানায় বিস্তৃত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিদ্দিক একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু মাদকের কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কেরানীগঞ্জে নিজ বাড়ির পাশে একটি গরুর খামারে তার একটি ‘টর্চার সেল’ রয়েছে। এলাকার লোকজন বিশেষ করে যারা তার অপকর্মের প্রতিবাদ করে তাদেরকে এখানে ধরে এনে মারধর করে সিদ্দিক ও তার বাহিনীর ক্যাডাররা।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে সিদ্দিক ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জসহ অন্যান্য থানায় সন্ত্রাস ও মাদকসংশ্লিষ্ট ১৮টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এসব সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়নি। তাতে করে এলাকায় মাদকের কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। কেরানীগঞ্জের তারানগরসহ আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েক শ মানুষ এই মাদক সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি।

সিদ্দিকের এই সন্ত্রাস ও মাদক কারবারে সরাসরি জড়িত এমন ১৭ জনের নাম জানা গেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো—সাব্বির, সিফাত, শাওন, লিটন, মাসুদ, শুক্কুর, দেলোয়ার, শাহীন ও রুবেল। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার সিদ্দিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর এজাহারভুক্ত আসমি।

তারানগর ইউপির চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিদ্দিক ও তার বাহিনীর মাদকের কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই হামলার মুখে পড়তে হয়।’

কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই সিদ্দিক পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা খারাপ লোক।’

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সে মাদকের কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সব অভিযোগ অস্বীকার করে। তার দাবি, এলাকাবাসীর সব অভিযোগ অসত্য। আর প্রতিপক্ষ তাদের লোকজন দিয়ে তার বিরুদ্ধে এসব মামলা দিয়েছে।’

সিদ্দিকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘আবু সিদ্দিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে।’

ঢাকার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন সর্দার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকের কারবার, চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যেই জড়িত থাকুক না কেন অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা