kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

পাপুলের এমপি পদ বাতিল সময়সাপেক্ষ

নিখিল ভদ্র   

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০২:২১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাপুলের এমপি পদ বাতিল সময়সাপেক্ষ

মানবপাচার ও অর্থপাচারের অভিযোগে কুয়েতের আদালতে বিচার চলছে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলের। ওই দেশে তিনি এখন কারাগারে রয়েছেন। কুয়েতে গ্রেপ্তারের পর পাপুলের সংসদ সদস্য পদ থাকা-নাথাকা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। সংসদ অধিবেশনে টানা অনুপস্থিতি বা কুয়েতের আদালতে সাজা হওয়াসাপেক্ষে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়টি সামনে আসে। এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল সময়সাপেক্ষ বিষয়।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, কুয়েতের অপরাধ আদালতের বিচারক আবদুল্লাহ আল-ওসমান আগামী সপ্তাহে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করার আদেশ দিয়েছেন। এরপর মামলার রায়ের দিন ধার্য হবে। জনশক্তি রপ্তানিকারক এই সংসদ সদস্যকে গত ৬ জুন গ্রেপ্তার করে ওই দেশের পুলিশ। মানবপাচার ও অর্থপাচার, ঘুষ বিনিময়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গ এবং ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর কুয়েতের আদালতে তাঁর বিচার শুরু হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে দেশের আইনে তাঁর পাঁচ থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। পাপুল একজন সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কুয়েতে গিয়ে বর্তমানে সেখানকার একটি কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা মো. হারুনুর রশীদ সংসদ সদস্য পাপুলের বিষয়টি নিয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি ফৌজদারি মামলায় বিদেশের মাটিতে গ্রেপ্তার পাপুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। তখন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী জানান, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে ‘সংসদে নির্বাচিত হইবার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা’ সম্পর্কে বলা আছে। সেখানে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে—কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি—‘(ক) কোনো উপযুক্ত আদালত তাঁকে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করেন। (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় হতে অব্যাহতি না পেয়ে থাকেন। (গ) তিনি যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন। (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে।’

একাদশ জাতীয় সংসদের ১০টি অধিবেশনের মধ্যে চলতি বছর পাঁচটি অধিবেশনের মেয়াদ ছিল ৫৩ কার্যদিবস। জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রথম অধিবেশন ২৮ দিন, দ্বিতীয় অধিবেশন এক দিন, তৃতীয় (বাজেট) অধিবেশন ৯ দিন, চতুর্থ অধিবেশন পাঁচ দিন এবং সর্বশেষ পঞ্চম অধিবেশন (বিশেষ) ১০ দিন চলেছে। এর আগের বছরের পাঁচটি অধিবেশন ১০৪ কার্যদিবস চলে। পাপুলের সংসদ অধিবেশনে অনুপস্থিতি গত এক বছরে মাত্র ২৮ দিন। টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিধান রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী বছরেও তাঁর টানা অনুপস্থিতি ৯০ কার্যদিবস হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

একইভাবে ফৌজদারি অপরাধে আদালতের রায়ে দুই বছরের বেশি শাস্তির বিষয়টিও স্পিকারের দৃষ্টিতে আনতে হবে। তার পরও কুয়েতের আদালতে দণ্ডিত হলে সেটি বাংলাদেশের সংবিধানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

কোনো কোনো আইনজ্ঞ মনে করেন, পাপুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

তবে এ ক্ষেত্রে বিতর্কের সুযোগ নেই বলে একাধিক আইনজীবী দাবি করেছেন। তাঁরা বলছেন, সংবিধানে বলা আছে, দুই বছর বা এর বেশি কারাদণ্ড হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না। সেখানে তো কোনো সুনির্দিষ্ট দেশের আদালতের কথা বলা নেই। সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদের মূল উদ্দেশ্যই হলো, কোনো দণ্ডিত বা অপরাধী ব্যক্তি যেন সংসদে থাকতে না পারেন। আর পাপুল যদি কুয়েতের আদালতে দুই বছর বা এর বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তাহলে তো তিনি দেশে ফিরে সংসদকে কিংবা আদালতকে বলতে পারবেন না যে, তিনি দণ্ডিত হননি। ফলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।

এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টানা অনুপস্থিতির কারণে পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল নিয়ে আলোচনার সময় এখনো আসেনি। তাঁর সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে তখন, যখন তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কারণে কুয়েতের আদালতে কমপক্ষে দুই বছর সাজাপ্রাপ্ত হবেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘সংসদ তখনই পাপুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে, যখন তাঁর বিরুদ্ধে একটা বিচারের রায়ের কপি সংসদের কাছে পৌঁছবে। তবে সেটা ওই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সরকারের কাছে পাঠাতে হবে। অবশ্য আদালতের রায়ের সার্টিফায়েড কপিসহ স্পিকারের কাছে কেউ আবেদন করলে তা স্পিকার বিবেচনা করতে পারেন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা