kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সাদাকালো

বাংলাদেশি সমাজ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

আহমদ রফিক   

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০৪:০৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশি সমাজ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় সামাজিক উৎসব (শারদোৎসব=দুর্গোৎসব) উপলক্ষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন : ‘বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দুর্বল হয়েছে; কিন্তু এখনো নির্মূল হয়নি। এই নেতার স্বভাব-বৈশিষ্ট্য তিনি মাঝে মাঝে অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করে থাকেন। হোক তা সমাজ বা রাজনীতিবিষয়ক, যেমন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সাহেব বলে থাকেন।

পাকিস্তানি শাসনামলে পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশক হয়ে একাত্তরে পৌঁছে তৎকালীন রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোতে জাতীয়তাবাদ ও প্রগতিবাদের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িকতার ছিল সুস্পষ্ট প্রকাশ, যা একাত্তরের সহমর্মিতায় দীপ্যমান। এরই তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ ১৯৭২-এ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানটিতে, যা নানাভাবে দুই জেনারেলের হাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। সমাজে সাম্প্রদায়িক চেতনার পুনঃপ্রকাশ ঘটেছে। তার প্রভাব দেখা গেছে রাজনীতিতেও।

কিন্তু এর সামাজিক প্রভাব ছিল অধিক তাৎপর্যপূর্ণ, যা জনমানসের অংশবিশেষে স্থান করে নিয়েছে। একাত্তরের আদর্শিক চেতনা সে ক্ষেত্রে বিপর্যস্ত। তাই থেকে থেকে মানসিকভাবে দুর্বল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশবিশেষের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলা, মূলত নিম্নবিত্ত ও নিম্নবর্গীয়দের ওপর।

অনুপুঙ্খ বিচারে এজাতীয় সন্ত্রাসী হামলা প্রধানত শ্রেণিনির্ভর। বিত্তবান বা উচ্চ শ্রেণিতে প্রায় চোখে পড়ে না বললেই চলে। হামলার শিকার মালোপাড়া, জেলেপাড়ার মতো দরিদ্র শ্রেণি, তাদের স্বল্প জমিজমা বা বাস্তুভিটা দখলের লোভে। কিছুকাল আগে সংঘটিত হামলা—যেমন নাসিরনগর, অভয়নগরের ঘটনাগুলো তার প্রমাণ। রাজনৈতিক অঙ্গন এদিক থেকে দূষণমুক্ত নয়।

দুই.

দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো, এসব ক্ষেত্রে কখনো কখনো জনপ্রতিনিধি তো বটেই, প্রশাসনের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা লক্ষ করা যায়। রক্ষক তখন ভক্ষকের ভূমিকা নেয়, যেমন দেখা গেছে নাসিরনগরে। এই প্রবণতা রুখতে দরকার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি ও প্রশাসনের সচেতন উদ্যোগ ও তৎপরতা। এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা বা শিথিলতা মোটেই কাম্য নয়।

সম্প্রতি সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও অসহায়দের ওপর হামলা নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় গোটা দুই প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার পড়ে হতাশ হয়েছি। যেমন অন্য পত্রিকা থেকে উদ্ধৃত করে ভাষাসংগ্রামী রাজনীতিক রণেশ মৈত্র উল্লিখিত বিষয়ে যে চালচিত্রটি এঁকেছেন তা সত্যই সামাজিক-রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্ভাগ্যজনক। শিরোনাম : ‘হিন্দু নির্যাতন আর কতকাল দেখব?’

ঘটনার বিবরণ ও তথ্যাদি তুলে ধরে আঁকা চালচিত্রটির মর্মার্থ হলো : ‘শত বছরের বেশি যে পরিবারগুলো কষ্টেসৃষ্টে ওখানে বাস করছে, কার্যত ও আইনত এই জমির মালিক তারাই। সরকারের উচিত অবিলম্বে ওই জমি ওই পরিবারগুলোর কাছে বিনা মূল্যে স্থায়ী বন্দোবস্ত দিয়ে দেওয়া, যাতে তাদের মালিকানা বৈধতা পায়। এবং তারা মালিক হিসেবে বংশপরম্পরায় নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারে। অবশ্য যদি সরকার ইতিমধ্যে তেমন কিছু করে থাকে, তাহলে তো কথাই নেই।’

ঘটনাটি হলো রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ইদুলপুর এলাকার ১২টি গরিব হিন্দু পরিবারকে তাদের ভিটাবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টায় হামলা ও নির্যাতন। উদ্দেশ্য তাদের ভিটাবাড়ি জমি দখল (১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০)। খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৫ সেপ্টেম্বর একটি দৈনিকে। শিরোনামটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য : ‘রংপুরের মিঠাপুকুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ চেষ্টা : আওয়ামী লীগ নেতার নেতৃত্বে হামলা : নারীসহ আহত ১০ : থানায় মামলা : পুলিশ নিষ্ক্রিয়।’

কাগজের প্রায় অর্ধেক পৃষ্ঠায় রণেশ মৈত্র ক্ষুব্ধ ভাষায় ঘটনার বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন এমন ধরনের মন্তব্যসহ যে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় এজাতীয় ঘটনা প্রত্যাশিত নয়। নয় আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষকদের কাছ থেকে। প্রসঙ্গত, তিনি আদিবাসী পীড়নের ক্ষেত্রেও অনুরূপ আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। এজাতীয় ঘটনার বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন।

এর আগে আমরা সংখ্যালঘু সমস্যার ক্ষেত্রে শ্রেণিগত বৈষম্যের কথা উল্লেখ করেছিলাম। বর্তমান ঘটনা তেমন আরেকটি উদাহরণ। এই যে মহাসমারোহে করোনাকালেও বিশেষ করে রাজধানীতে শারদোৎসব পালিত হলো, সেখানে বড় একটা সমস্যা নেই। সমস্যা প্রধানত নিম্নবিত্ত থেকে বিত্তহীন শ্রেণিতে এবং প্রান্তিক অঞ্চলে তৃণমূল স্তরে, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার শক্তিটি একাধিক মাত্রায় একদেশদর্শী ও সুবিচার দূর-অস্ত্। তাই যত অঘটন, ততই সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট।

দ্বিতীয় অনুরূপ বক্তব্যের শিরোনামটি ‘ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা ভালো নেই’ আরেকটি জাতীয় দৈনিকে। এটি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তর সঙ্গে সাক্ষাৎকার। সংগঠনটি উল্লিখিত সম্প্রদায়গুলোর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। তাই কেউ কেউ এদের পরিবেশিত অভিযোগ/মতামত নিয়ে কিয়ৎ পরিমাণে সংশয়বাদী।

কিন্তু একটি বাস্তবতা তো স্বীকার্য যে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলো তো অস্বীকার করা চলে না। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ঘটনাস্থল থেকে দেখেশুনেই প্রতিবেদন তৈরি করে পাঠিয়ে থাকেন, যা যথাসময়ে দৈনিকের পাতায় প্রকাশিত হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে মনগড়া বা ভুল ঘটনার প্রবল প্রতিবাদ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

এ ছাড়া পরিসংখ্যান বলে যে কথাটি আছে তার তথ্য ও সংখ্যা জরিপের ফলাফল থেকে তুলে ধরা হয়। সেখানে আমরা দেখি, বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য সংখ্যার ক্রমবর্ধমান হ্রাস, যা এখন প্রায় ৮ শতাংশে পরিণত। শ্রেণিভিত্তিক এই হ্রাসের বাস্তব কারণটি বর্তমান আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রবণতা বন্ধ করার জন্য যেমন দরকার প্রান্তিক প্রশাসনের নিরপেক্ষ, আইনসম্মত শ্রেণি-নির্বিশেষ আচরণ, কেন্দ্রের তাতে নজরদারি, তেমনি সার্বিক বিচারে একটি অপরিহার্য শর্ত সুশাসন, যা সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সব নাগরিকের যুক্তিসংগত অধিকার নিশ্চিত করবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে আমরা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে গর্ব ও অহংকার বোধ করি। এই দাবির বাস্তবতা প্রমাণে উল্লিখিত ধরনের অঘটন বন্ধ করতে হবে সমদর্শী শাসনের মাধ্যমে। নিম্নবর্গীয় সংখ্যালঘুদের জন্য যুক্তিবাদী সুবিচার নিশ্চিত করে। সেই সঙ্গে দরকার হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনার গরিষ্ঠ শক্তির বিকাশ ঘটানো—রাজনীতি ও সংস্কৃতির উভয়বিধ চর্চায়।

রানা দাশগুপ্ত তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সরকারের কিছু সংখ্যালঘুবিষয়ক ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন, যে কারণে এই মুহূর্তে দেশত্যাগের প্রবণতা খুবই কম। তবে তাঁর একটি কথা ‘সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রীয় হামলার অবসান হলেও সামাজিক রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার অবসান হয়নি’ অস্বীকার করা কঠিন। একাধিক ঘটনায় তার প্রমাণ মেলে, রামুতে বৌদ্ধ বিহার-মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা বাদ দিলেও।

যে কথা একটু আগে বলেছি, সেটা এখনো সত্য। এখনো রাজধানীতে শারদোৎসব যেমনই হোক, প্রান্তিক এলাকা ও দূর শহরে এখনো ওই উৎসবে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা সচরাচর, যা রানাও বলেছেন, এসব ঘটনা কী প্রমাণ করে? প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তথা মানসিক সাম্প্রদায়িকতা পরিসংখ্যানে যত কমই হোক।

আমার বিবেচনায় এককথায় এই মানসিকতা বিদেশি শাসনামলে সূচিত ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দ্বিভাজিত রাজনীতির অবধারিত পরিণাম। বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনার, তাই আপাতত বিরতি। তবু লেখা শেষ করেও কথা শেষ করি এই বলে যে প্রাজ্ঞ রাজনীতিক ওবায়দুল কাদের প্রাসঙ্গিক মন্তব্যে ভুল বলেননি কিছু। এ ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা দরকার। দরকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগত তৎপরতা।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা