kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আগুনে ছোট হয় বস্তি পাল্টে যায় দখল

এস এম আজাদ   

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০২:৫৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আগুনে ছোট হয় বস্তি পাল্টে যায় দখল

চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে রাজধানীর ভাসানটেকের সিআরপির পাশের বস্তিতে। এতে শতাধিক ঘর পুড়ে যায় এবং খালের পানিতে পড়ে দুই শিশু মারা যায়। সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা বস্তিটি ‘জাহাঙ্গীর’ ও ‘আবুলের বস্তি’ নামে পরিচিত। ৯ মাস পরে গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, বস্তি এখন নিশ্চিহ্নপ্রায়। পুড়ে যাওয়া অংশসহ অনেকটা জায়গায় দেয়াল দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।

আগুনে উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দারা বলেন, ছয় বিঘা জমি বরাদ্দ নিয়ে এবং ২০ বিঘা জমি দখলে নিয়ে ‘আগুন দিয়ে’ বস্তি উচ্ছেদ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অগ্নিকাণ্ডের পরও নিরুপায় হয়ে ঘর তুলে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের তিন দিনের নোটিশে উচ্ছেদ করা হয় মাস দুই আগে।

রাজধানীতে বারবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার বস্তি এলাকাগুলো ঘুরে এমন বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়। শুষ্ক তথা শীত মৌসুমে প্রতিবছরই বস্তিতে আগুন লাগে। এবার মৌসুমের শুরুতেই সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তি, মোহাম্মদপুর বাবর রোডের বিহারিপট্টি ও মিরপুরের কালশী বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন বাউনিয়া বাঁধের বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর দেখা যায়, ঘর কমে বড় বস্তিগুলোর আকার ছোট হয়ে আসে। এরপর চালানো হয় উচ্ছেদ কার্যক্রমও। বস্তিবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখল, বিরোধ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কারণে কৌশলে বস্তিতে আগুন লাগানো হয়। আবার সরকারি কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ অভিযানও চলে। আগুনে হতদরিদ্র মানুষের জীবনে মহাদুর্যোগ নেমে আসে। ঘটে প্রাণহানিও। ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগ বারবার উঠলেও তদন্তে প্রমাণ মেলে না।

পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা প্রতিটি ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার কথা জানায়। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরে বস্তিতে ৯৫৩টি অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও একটিতেও অভিযোগপত্র দাখিল করেনি পুলিশ। তাই কাউকে দায়ীও করা যায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্ছেদ ও দখল নিতে এসব বস্তিতে বারবার আগুন লাগানোর অভিযোগ করা হলেও কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। এসব অগ্নিকাণ্ডে দেশের অর্থনীতির যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি অমানবিক একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণত বস্তিগুলো সরকার বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পরিত্যক্ত জমিতে গড়ে ওঠে। অনেক সময় ভূমি মালিক জমি খালি করার জন্য বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দেন। এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। তাই সিটি করপোরেশন, থানা-পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের তদন্ত করে অগ্নিকাণ্ডের কারণ বের করতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের সহায়তায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ সিটি করপোরেশনকে এগিয়ে আসতে হবে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শফিউল্লাহ বলেন, ‘নানা কারণেই বস্তিতে আগুন লাগে। এর আগে তদন্তে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ও গ্যাসের পাইপের লিকেজ থেকে আগুনের কারণ উঠে এসেছে। তবে দুই পক্ষের শত্রুতা ও দখল-পুনর্দখলের বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘শীতের মৌসুমে বস্তিগুলো অনেক শুষ্ক (বাঁশ, কাঠ) থাকে। ফলে কোথাও আগুন লাগলে মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বস্তিতে আগুন লাগলেই এর পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের গুঞ্জন ওঠে। এটি দেখভালের দায়িত্ব ফায়ার সার্ভিসের নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।’

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ৯৩টি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ২৭ এবং চট্টগ্রামে ২৯টি বস্তিতে আগুন লাগে।

২০১৯ সালে সারা দেশে ১৭৪টি, ২০১৮ সালে ৫২৫টি এবং ২০১৭ সালে ২৫৪টি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এই তিন বছরে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে চট্টগ্রামের বস্তিতে—৬০২টি। ঢাকায় ঘটেছে ৯৬টি বস্তিতে।

গত সোমবার রাতে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে আগুন লেগে পুড়ে গেছে ৬০-৭০টি ঘর। স্থানীয়রা বলছেন, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা বস্তি প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ চেষ্টা এবং এর বিরুদ্ধে আদালতের স্থগিতাদেশ চলার মধ্যে গত পাঁচ বছরে এখনে ছয়বার অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ঘরের সংখ্যা কমে বস্তির আকার ছোট হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ বস্তির প্রতিটি ঘর এবং দোকান অবৈধ। এসব দোকান ও ঘর থেকে প্রতিমাসে ভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল বাবদ কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন স্থানীয় কাউন্সিলরের সমর্থক ও যুবলীগের কয়েকজন নেতা। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধও চলছে। এ কারণে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে।’

গত ২৬ ডিসেম্বরে গভীর রাতে মিরপুর বাউনিয়া বাঁধ বস্তিতে আগুনে শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। ১১ মাসের মাথায় মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে এই বস্তিতে আবার আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট অনেক চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বস্তির বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘দু-এক-বছর পর পরই এই বস্তিতে আগুন লাগে। কিন্তু এসব ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ কখনোই জানা যায় না। বস্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে কয়েকটি গ্রুপ আছে বলে জানি। তারা বিভিন্ন সময় বস্তির ঘর ভাড়া, পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়।’

মঙ্গলবার মোহাম্মদপুরে বাবর রোডের জহুরি মহল্লার পাশের বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। এ বস্তির বাসিন্দারাও নাশকতার অভিযোগ করছেন।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ভাসানটেকের সিআরপির পাশে ৬ নম্বর বস্তিতে আগুন লাগার পর বাসিন্দারা নাশকতার অভিযোগ করেন। এতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ফায়ার সার্ভিস। তবে সেই তদন্তে নাশকতার কিছুই পাওয়া যায়নি বলে সূত্র জানায়।

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এই বস্তি থেকে কয়েকটি পরিবার তাদের বাসার জিনিসপত্র সরাচ্ছে। ‘স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান জমির মালিক বলে সেখানে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। সাজেদা বেগম ও সুকন নামে এক দম্পতি জানান, তাঁরা ছোট থেকে বড় হয়েছেন এই বস্তিতে। এর একটি অংশ আবুলের বস্তিতে আগুন লেগেছিল। এতে জাহাঙ্গীরের অংশের বস্তিরও শতাধিক ঘর পুড়েছে। এরপর ঘর ঠিক করে অনেকে বসবাস শুরু করেন। তবে গত ১৪ সেপ্টেম্বর নোটিশ দিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর সেখানে বুলডোজার লাগানো হয়।

বস্তি তৈরি করা জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে আগুন দিয়ে বস্তির একটি অংশ ফাঁকা করা হয়েছে। এরপর ফাঁকা ছয় বিঘা জমি সরকার থেকে বরাদ্দ নেয় স্কলার্স মালিকরা। তাঁরা স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও পুলিশ প্রশাসন নিয়ে এখন ২০ বিঘার মতো জমি দখল করে নিয়েছে।’ স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের’ দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা বক্তব্যের জন্য ব্যবস্থাপক আব্দুল মতিনের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর দেন। ওই নম্বরে ফোন করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়।

গত ৩০ অক্টোবর কল্যাণপুরের নতুন বাজার বস্তির ৭ নম্বর সেকশন এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে দুজন দগ্ধও হয়। এই বস্তির ৮ নম্বর সেকশন এলাকায় ২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।  বস্তির একাধিক বাসিন্দা বলেন, স্থানীয়ভাবে পরিচিত পোড়া বস্তিতে ‘হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের’ জমি পুনরুদ্ধারের জন্য উচ্ছেদ অভিযানে আদালতের নির্দেশে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। এর পরে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডকে তাঁরা সন্দেহের চোখেই দেখছেন। 

মিরপুরের রূপনগরের ৭ নম্বর সেকশনের ঝিলপাড় চলন্তিকা বস্তিতে গত বছরের ১৬ আগস্ট, গত ২৪ জানুয়ারি এবং ১১ মার্চ তিনবার অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে শত শত ঘর পুড়ে গেছে। ছোট হয়ে এসেছে বস্তির পরিধি। কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই দীর্ঘদিন ধরে বস্তিটি নিয়ন্ত্রণ করে একটি প্রভাবশালীচক্র। সরকারি জায়গার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া আরো কিছু ব্যক্তি।

বিদ্যুতের লাইন নিয়ে কুর্মিটোলা ক্যাম্প (বিহারি বস্তি) ও রাজু বস্তির মধ্যে বিতণ্ডা হতো প্রায়ই। এর মধ্যেই ২০১৪ সালে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে প্রাণ হারায় ক্যাম্পের ১০ জন। গত বছরের ৩ মার্চ উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যেই কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তিতে আগুন লাগে। আগুনে সবচেয়ে বেশি পুড়েছে বনানীর কড়াইল বস্তি—গত ১০ বছরে ১৭ বার। এক বছরেই পুড়েছে তিনবার। এসব আগুন স্বাভাবিক কারণে লেগেছে, এমনটা মনে করেন না বস্তিবাসীরা।

নাশকতা পায় না তদন্ত কমিটি 
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ঘটনায়ই তদন্ত করে কমিটি ফায়ার সার্ভিসের ডিজির মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেয়। তবে তদন্তে নাশকতার কোনো প্রমাণ মেলে না। অনেক কমিটিতে যুক্ত থাকা উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বস্তিতে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে মূলত লুজ অ্যায়ারিংসহ বিভিন্ন কারণে আগুন লাগে। আমরা কাজ করার সময়ও সরকারি লোক বলে বস্তিবাসী আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলে। হামলা করার ঘটনাও আছে। তবে আমরা পেশাদারির সঙ্গে জানমালের নিরাপত্তায় কাজ করি। অনেক ঘটনায় বস্তিতে ঝামেলার তথ্য পাওয়া যায়। অভিযোগ আসে। তবে এগুলো তদন্তে প্রমাণিত হয় না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা