kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

থামছে না নারী নির্যাতন

জটিল আইনি প্রক্রিয়ায় বাড়ছে বিচারহীনতা

এম বদি-উজ-জামান ও তানজিদ বসুনিয়া   

২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০২:৩০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



জটিল আইনি প্রক্রিয়ায় বাড়ছে বিচারহীনতা

আইন আছে, মামলাও হয়, নির্যাতনবিরোধী সভা-সমাবেশও চলে। আছে সরকারি নির্দেশনা, কর্মপরিকল্পনা, প্রচার-প্রচারণাও। তবু কেন কমছে না নারীর প্রতি সহিংসতা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে আইনের কঠোর প্রয়োগ না করা, দ্রুত বিচার না হওয়া এবং সামাজিক প্রতিরোধের অভাবে বাড়ছে নারী নির্যাতন। তাই শুধু আইন পাস করলেই হবে না, সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা এবং সামাজিক জাগরণই পারে নারী নির্যাতন রোধ করতে। এ জন্য সমাজের বিশিষ্টজনদের এগিয়ে আসতে হবে, জনগণকে সচেতন করতে হবে যে একজন পুরুষের মতো একজন নারীর অধিকারও সমান। বিশেষ করে, পরিবার থেকে শিশু বয়স থেকেই মূল্যবোধের শিক্ষাটা শুরু করতে হবে।

পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫০ হাজার ১০টি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ মাসে দেশে আড়াই হাজারের বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪৮৩টি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৩৪৯টি, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৮৪টি। আর সুপ্রিম কোর্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সারা দেশে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা ছিল এক লাখ ৬০ হাজার ৭৫০টি। আর ২০১৯ সালে এই মামলা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৩৯৩টি।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য মতে, গত বছর নারী ও শিশু নির্যাতন সহিংসতার ঘটনায় কল এসেছে ছয় হাজার ২৮৯টি। আর চলতি বছরের ১০ মাসেই কল এসেছে সাত হাজার ৭৩৫টি। করোনাকালের শুরুতে মার্চ মাসে কল ছিল সবচেয়ে বেশি, এক হাজার ১৬৪টি। এর পরে কিছুটা কমেছে। গত ১ মে থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ছয় মাসে ৯৯৯-এর ধর্ষণের অভিযোগে ২৯৯টি কল আসে। এ সময় ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ করে ১২১ জন এবং যৌন হয়রানির অভিযোগ করে ১৩৩ জন। ছয় মাসে ৫৯৫ জন নারী যৌতুকসহ বিভিন্ন কারণে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

গত অক্টোবরে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জরিপ জানায়, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসে মোট ৪৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ মোট ২১৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শ্লীলতাহানির শিকার পাঁচজন ও যৌন নিপীড়নের শিকার ১২ জন কন্যাশিশু। এসিড হামলার শিকার হয়েছে চারজন, যার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে একজনের। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে আটজন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৫ শিশুসহ ২১ জন। বিভিন্নভাবে নির্যাতনের কারণে পাঁচ শিশুসহ আত্মহত্যা করেছে ছয়জন। আট শিশুসহ ৪৬ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। সাইবার ক্রাইম অপরাধের শিকার চার শিশুসহ আটজন।

গত জুনে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ৫৩ জেলার ৫৭ হাজার ৭০৪ জন নারী ও শিশুর ওপর পরিচালিত জরিপের তথ্য মতে, গত মার্চ থেকে প্রতি মাসে পারিবারিক সহিংসতা দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। করোনায় সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, অভাব ইত্যাদির কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। দেশের ৫৩ জেলায় মোট ১২ হাজার ৭৪০ জন নারী ও শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। গত মে মাসে নির্যাতনের এই সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৪৯৪। বেসরকারি সংস্থা কোস্ট ট্রাস্ট পরিচালিত জরিপেও উপকূলের ছয় জেলায় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। জরিপে ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, পরিবারে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গালাগাল বা কটূক্তির ঘটনা ঘটেছে ৮২ শতাংশ পরিবারে। ৯ শতাংশ পরিবারে গায়ে হাত তোলা এবং ৯ শতাংশ পরিবারে যৌতুকের জন্য চাপ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশালসহ উপকূলের ছয় জেলায় কোস্ট ট্রাস্টের ১২টি শাখার অধীন ২৪০ জন দরিদ্র, নারীপ্রধান ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে এই জরিপ চালানো হয়।

পাঁচ বছর আগে ২০১৫ সালের ২১ মে কুড়িল ফ্লাইওভারে মাইক্রোবাসে ধর্ষণের শিকার হন এক তরুণী। পরদিন থানায় মামলা হয়। দুজন আসামির বিরুদ্ধে একই বছরের ২৩ আগস্ট অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ওই বছরই ঢাকার ৪ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। পরে মামলাটি যায় ৯ নম্বর ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু আজও বিচার শেষ হয়নি। শুধু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিতে হাজির না হওয়ায় মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ আটকে আছে তিন বছর ধরে। অথচ ২০০০ সালে করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০(২) নম্বর ধারা অনুযায়ী মামলাটির বিচার শুরু হলে একটানা চলার কথা। আর ২০(৩) ধারা অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। গত বছরের ১৮ জুলাই হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার আলোকেও ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হওয়ার কথা। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে তা এক মাসের মধ্যে লিখিতভাবে সুপ্রিম কোর্টকে জানানোর বিধান ও নির্দেশনা রয়েছে।

এ রকম অসংখ্য ঘটনা। ২০০৯ সালের ৩০ জুন বরগুনা সদর উপজেলায় স্কুলছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলায় নিম্ন আদালতে বিচার শেষ হতে লেগেছে ১১ বছর। বরগুনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গত ১৮ নভেম্বর দেওয়া রায়ে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কালুপাড়া গ্রামে এক রিকশাচালকের স্ত্রীকে ২০০৪ সালের ২ মার্চ রাতে ধর্ষণের ঘটনার ১৬ বছর পর এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে গত ৮ নভেম্বর রায় দিয়েছেন রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। ২০০৪ সালের ১১ এপ্রিল রাতে নোয়াখালীর হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নের একটি বাড়িতে ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলায় এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১৬ বছর পর গত ২৮ অক্টোবর।

এসব বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্যাতন কমাতে হলে সত্যিকার অর্থে আইনের কঠোর প্রয়োগ হতে হবে। যেসব মামলা হচ্ছে তার দ্রুত বিচার হতে হবে। যেসব কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, শুধুমাত্র নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে এটা প্রতিরোধ করা সম্ভব। সমাজপতিদের এগিয়ে আসতে হবে নিজ নিজ এলাকায় নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।’

জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি বিশেষজ্ঞ সেলিনা আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি শিশু ধর্ষক হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। আমাদের এই সমাজের কিছু প্রচলিত নিয়ম ও ব্যবস্থা ওই শিশুকে ধর্ষকে পরিণত করে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে হলে সমাজের ওই ব্যবস্থাগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। ধর্ষণ প্রতিরোধে শুধু ফাঁসিতে ঝোলানো কোনো সমাধান হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘ধর্ষণ নিয়ে আমাদের নীরবতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ এবং নারীর প্রতি সম্মান—এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সেক্স এডুকেশন নিয়ে আলোচনা হওয়াটা জরুরি। ছোটবেলায় শিশুদের মানসিকতায় এসব বিষয়ে বীজ বপন করতে হবে। এই শিক্ষাটা শুরু করতে হবে পরিবার ও স্কুল-কলেজ থেকে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কঠোর আইন করেও সমাজ থেকে নারী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না, এর অন্যতম একটি কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। প্রতিটি পরিবারে নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে পুরুষ।’ তিনি বলেন, ‘নারী নির্যাতন কমাতে হলে নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। একজন নারী একজন মানুষের কাছে কখনো মা, কখনো স্ত্রী, কখনো মেয়ে আবার কখনো বোন হিসেবে রয়েছেন। এটাকে যদি সকলেই নিজের মধ্যে ধারণ করে, তবেই কেবল নারী নির্যাতন কমতে পারে। আর এটা ধারণ করতে হলে স্কুল, কলেজসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটাকে পাঠ্যভুক্ত করতে হবে।’

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনায় মামলা হচ্ছে। বিচারও হচ্ছে। তবে এই বিচারে প্রভাব পড়ছে না। এর একটাই কারণ, একটি মামলা হওয়ার পর তা বিচারের জন্য বছরের পর বছর পড়ে থাকে। বিচার দ্রুত হতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শাস্তি দ্রুত কার্যকর করতে হবে।’

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সিস্টেম আছে, আইন আছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে, কিন্তু তার পরও নির্যাতন কমছে না। কারণ এগুলো থাকলেও তাদের কোনো প্রয়োগ নেই। গণতন্ত্র যদি টেকসই না হয়, আইনের যদি প্রয়োগ না থাকে, তাহলে নারীর প্রতি সহিংসতা কখনোই কমবে না। আমাদের বিচারব্যবস্থাকে পুরো ঢেলে সাজাতে হবে।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহসভাপতি মাসুদা রেহেনা বেগম কালের কাণ্ঠকে বলেন, ‘যে ধর্ষক সে-ও তো কোনো পরিবার থেকে এসেছে। মূল্যবোধের শিক্ষার জায়গায় বড় একটি গ্যাপ থেকে যাচ্ছে। আমাদের সামাজিক কাঠামো ধর্ষককে প্রশ্রয় দিচ্ছে। পরিবার সদস্য ও সমাজের প্রভাবশালীরা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ধর্ষককে গ্রেপ্তারের হাত থেকে বাঁচাতে চাইছে। মোটকথা আমাদের সিস্টেম ধর্ষকদের উৎসাহিত করছে।’

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে নির্দিষ্ট করে যেকোনো একটি কারণ ধরলে হবে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো থেকে মনিটরিংয়ের পর্যাপ্ত ঘাটতি আছে। ১৮০ দিনে যে মামলার সমাধান হওয়ার কথা, সেটি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা