kalerkantho

শনিবার । ২৭ চৈত্র ১৪২৭। ১০ এপ্রিল ২০২১। ২৬ শাবান ১৪৪২

স্বাস্থ্যবিধি না মানতে নানা অজুহাত

করোনায় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা হচ্ছে না, মাস্ক পকেটে থাকলেও মুখে উঠছে না

তানজিদ বসুনিয়া ও শম্পা বিশ্বাস   

২১ নভেম্বর, ২০২০ ০২:৫৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাস্থ্যবিধি না মানতে নানা অজুহাত

পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটের বাদামতলী ফলের মার্কেটে স্বাস্থ্য সচেতনতার কোনো বালাই নেই। শারীরিক দূরত্ব তো দূরের কথা, ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ মাস্কও পরেন না। গতকাল সকাল ৯টার চিত্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

হাতিরঝিলে ওয়াটারবাসে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ছয় তরুণ। গুলশান পুলিশ প্লাজার সামনের ওয়াটারবাস কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহের পর সেলফি তুলছিলেন তাঁরা। এই ছয় তরুণের একজনের মুখেও ছিল না মাস্ক। কথা বলে জানা গেল, রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকা থেকে তাঁরা এখানে ঘুরতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে আব্দুর রহিম নামে এক তরুণ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন তো করোনা অনেক কমে গেছে। তাই মাস্ক পরি না।’ পাশ থেকে সিয়াম নামে আরেক তরুণ বলে উঠলেন, ‘আমি আগেও মাস্ক পরি নাই। যাগোর করোনা হইছে; হেরা মাস্ক পরলেও হইছে, না পরলেও হইছে। আর করোনা হইতে চাইলে কেউ থামাইতে পারব না।’

ঝিগাতলার বাসিন্দা মো, রানা চন্দ্রিমা উদ্যানে বন্ধু আমিনুল ইসলামসহ আরেকজনকে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তিনজনের মধ্যে একজন মাস্ক ব্যবহার করলেও তা ঝুলছিল থুঁতনিতে। বাকি দুজনের সঙ্গে ছিল না মাস্ক। জানতে চাইলে রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সব সময় মাস্ক পরে বের হই। আজ আসার সময় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মাস্ক নিতে ভুলে গেছি। সবার মাস্ক পরে বের হওয়া উচিত। আমিও এখন কেনার জন্য মাস্ক খুঁজছি।’

মাস্ক না পরার কারণ জানতে চাইলে মহাখালীর ডাব বিক্রেতা নাজির মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাস্ক কেনতে কেনতে তো ফতুর হইয়া গেলাম। রোজগারের টাকা তো এতেই চইল্যা যাবে। আগে পরতাম। অ্যাহন আর পরি না।’

সামাজিক দূরত্বের কথা তুলতেই তিনি আরো বললেন, ‘কাস্টমারগো নিজের মতো খাড়াইতে না দিলে তারা তো আমার দোকানে আইবো না। আমার বেচাকেনা কইম্যা যাইবো।’

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর হাতিরঝিল, চন্দ্রিমা উদ্যান, মহাখালী, সদরঘাটসহ বেশ কিছু এলাকা ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। ছুটির দিনে প্রশান্তির জন্য আনন্দ আড্ডায় বের হয়ে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে নিজেদের এভাবে করোনা আক্রান্তের ঝুঁকিতে ফেলছেন হাজারো মানুষ।

করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা নিয়ে দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার সতর্কবার্তা দিয়ে চলেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে রাজধানীসহ দেশজুড়ে চলছে বিশেষ অভিযান। করা হচ্ছে জরিমানা। এত কিছুর পরও স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাইছে না অনেকে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষের মুখে মাস্ক নেই। রেস্তোরাঁ, পার্ক, চায়ের দোকানে সামাজিক দূরত্ব না মেনেই আড্ডায় মেতেছে অনেকে। আবার অনেকে হাতে স্যানিটাইজার নিয়ে ঘুরলেও মুখে নেই মাস্ক। মাস্ক থাকলেও তা ঝুলছে থুঁতনিতে। ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানে ভিড় করে ঝালমুড়ি, চা খেতে দেখা গেছে অনেককে। এ ছাড়া অনেক ভবন কিংবা প্রতিষ্ঠানের সামনে জীবাণুনাশক টানেল, হাত ধোয়ার ট্যাপ থাকলেও সেসব অকেজো হয়ে পড়েছে।

রামপুরা থেকে নতুনবাজার যেতে ‘অনাবিল’ বাসে এক বিক্রেতার কাছ থেকে ১০ টাকায় চারটি মাস্ক কেনেন ময়না নামে এক নারী যাত্রী। মুখে মাস্ক না থাকলেও চারটি মাস্ক কিনে সেগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখেন তিনি। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, সস্তায় পেয়েছেন তাই কিনে রাখলেন। অনাবিল পরিবহনের ওই বাসে বেশির ভাগ যাত্রীর মুখেই দেখা যায়নি মাস্ক। করোনা সংক্রমণের কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ১ জুন থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও কেউ মানছে না স্বাস্থ্যবিধি। ‘অনাবিল’ পরিবহন ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী গণপরিবহন তুরাগ, রাইদা, স্বাধীন, রাজধানী, ভিক্টর ক্লাসিক, রইস, বৈশাখী এসব বাসেও একই চিত্র দেখা গেছে।

স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যতিক্রম দৃশ্যও চোখে পড়েছে। অনেককে সপরিবারে ঘুরতে বের হয়ে মুখে মাস্কসহ অন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে দেখা গেছে। হাতিরঝিলে ব্রিজের পাশে দেখা হলে কর কর্মকর্তা কিশোর দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা এসে তো সব কিছু পাল্টে দিয়েছে। পরিবারের সঙ্গে বহু দিন সেভাবে বের হতে পারিনি। ছুটির দিন বলে সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছি। তবে আমরা সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘুরতে বের হয়েছি।’ 

মহানগর প্রজেক্টের বাসিন্দা আফিফা খাতুন বলেন, ‘আমি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাইরে যাই। তবে বেশির ভাগ সময় দেখি অন্যরা মাস্ক ছাড়াই ঘুরে বেড়াচ্ছে, একে অন্যের গা জড়াজড়ি করে হাঁটছে। কখনো মাস্ক খুলে যেখানে সেখানে হাঁচি-কাশি দিচ্ছে। ফলে আমার একা সচেতন হয়ে কী লাভ হচ্ছে বুঝতে পারছি না।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা নিয়ে বর্তমানে মানুষের মধ্যে উদাসীনতা কাজ করছে। কেউ আর স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাইছে না। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন আনতে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মানুষ আর স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। গ্রামের অবস্থা আরো ভয়াবহ।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দীন সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম দিকে স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে আমাদের ভূমিকা খুবই ইতিবাচক ছিল। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই প্রবণতা নেই। এখন অনেক সচেতন মানুষও মাস্ক পরতে চায় না। করোনা থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করার বিকল্প নেই। মাস্ক হচ্ছে আমাদের একমাত্র ট্রিটমেন্ট। যেভাবেই হোক প্রত্যেকের স্বাস্থ্যবিধি মানা প্রয়োজন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা