kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

এই সব বিকৃত রাজনৈতিক প্রবচন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী   

২০ নভেম্বর, ২০২০ ০৩:৪১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এই সব বিকৃত রাজনৈতিক প্রবচন

গত ৭ নভেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতের পর সাংবাদিকদের সম্মুখে ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস বলে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবসের এমন দাবি এই প্রথম মির্জা ফখরুল ইসলামের কণ্ঠে শোনা গেল। কোনো দেশের স্বাধীনতা দিবস দুটি হতে পারে এমন আজগুবি কথা কেউ শুনেছেন বলে মনে হয় না। একটি স্বাধীনতা দিবস সংগঠিত করতে জাতিকে দীর্ঘদিন আন্দোলন, সংগ্রাম, পরিকল্পনা, গণজাগরণ, সশস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত করে অবশেষে অর্জন করার নজির ইতিহাসে দেখা যায়। এই স্বাধীনতা দিবসের প্রতি দেশের জনগণের থাকে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। কারণ এর সঙ্গে জড়িত থাকে জাতির স্বাধীনসত্তার বিকাশের দীর্ঘ লড়াই, ত্যাগ-তিতিক্ষা, মানুষের আত্মাহুতি।

পৃথিবীর সব দেশেই এমন একটি দিন রয়েছে, যেটিকে যুগের পর যুগ শত বছর ধরে জনগণ শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে থাকে। মূলত পরাধীনতা থেকে মুক্তিলাভের জন্যই স্বাধীনতাসংগ্রাম, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার এবং সর্বশেষ স্বাধীনতা অর্জনের মতো মহিমান্বিত বিষয় ইতিহাসে ঘটে থাকে। স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা থাকেন এক বা একাধিক নেতা, কিন্তু এর বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে জনগণ। নেতা ও জনগণের সম্মিলিত সংগ্রামের ফসল হচ্ছে স্বাধীনতা লাভ। মূলত পরবর্তী প্রজন্ম যেন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারে, মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, উন্নত-সমৃদ্ধ জীবন লাভ করতে পারে—সে জন্যই পূর্বপুরুষরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন। গত দুই-আড়াই শ বছর ধরে পৃথিবীর সব মহাদেশেই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছিল স্বাধীন রাষ্ট্র লাভের জন্য। পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র লাভের পর আমাদের জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল এই রাষ্ট্রে পূর্ব বাংলার জনগণের কোনো স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি বরং বরিত হয়েছে। সে কারণে পাকিস্তান লাভের পরপরই আমাদের নেতারা জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবিতে লড়াই-সংগ্রাম শুরু করে। সেই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হাল ধরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর রাজনৈতিক দল। এর জন্য তাঁকে এবং তাঁর দলের নেতাদের জেল-জুলুম-নির্যাতন বরণ করতে হয়েছিল। মৃত্যুর মুখোমুখি কয়েকবার হতে হয়েছিল। অবশেষে ছয় দফার আন্দোলন স্বাধীনতার এক দফায় রূপান্তরিত হলো। সাড়ে সাত কোটি মানুষের বেশির ভাগই স্বাধীনতা লাভের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও সমর্থন জানিয়েছিল। কিছু মানুষ বিরোধিতা করেছে, তারা পাকিস্তান ভাঙতে চায়নি, স্বাধীনতাও চায়নি। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিল। এই ত্যাগের বিনিময়ে ২৬শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিজয় লাভ করেছিল। সুতরাং আমাদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং এর তাৎপর্য অনেক ব্যাপক ও গভীর অর্থ বহন করে। সে কারণেই ২৬শে মার্চ আমরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে ১৬ই ডিসেম্বর ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। গোটা দেশ এবং জাতি স্বাধীনতার এই দিনে কতটা আবেগঘন থাকে সেটি সবাই দেখতে পায়। ৪৯ বছর ধরে আমরা এভাবেই আমাদের স্বাধীনতা দিবস পালন করে আসছি।

১৯৭৫ সালে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশে যা ঘটেছিল তার সঙ্গে স্বাধীনতার কোনো ন্যূনতম ইতিবাচক সম্পর্ক ছিল না। বরং ওই দিন রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাবাহিনীপ্রধান জিয়াউর রহমান আসীন হলেন এবং দেশব্যাপী সামরিক শাসন জোরদার হলো। পাকিস্তানি ভাবাদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যা যা দরকার হলো তা-ই করা হলো। যে পাকিস্তানকে আমরা ১৯৭১ সালে বিদায় জানিয়েছিলাম, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সমর্থকরা ৭ নভেম্বর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনীতিতে আসীন হলেন। বিএনপি নামের একটি রাজনৈতিক দল ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হলো। যে দলের ডানে-বাঁয়ে পাকিস্তানপন্থী এবং উগ্র বামপন্থীরা আশ্রয় নিল। অথচ এই উভয় শক্তি পাকিস্তানকালেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে পরিত্যাজ্য ছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এরা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। কারণ এই সব ডান এবং উগ্র বামরা কখনোই দেশ এবং জাতির জন্য রাজনৈতিক কোনো আন্দোলন, সংগ্রাম, জনসচেতনতা তৈরি ইত্যাদিতে কোনো অবদান রাখেনি, বরং বিরোধিতা করেছিল। দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা কোনোকালে একটি ঢিল ছুড়েছে এমন প্রমাণ ইতিহাসে নেই। মির্জা ফখরুলরা এখন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন। কিন্তু পাকিস্তানকালে কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম কিংবা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বয়স থাকা সত্ত্বেও তাতে যুক্ত ছিলেন এমন কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ১৯৭৫-১৯৮১ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এর পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রচেষ্টা শুরু হলো। ১৯৯১-১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দখল করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। সবচেয়ে নগ্নভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা হলো ২০০১-২০০৬ সালে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা এই অপরাধটি তখন করেছিল, এখন তারা সেটি লালন করে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তারা মনে-প্রাণে গ্রহণ করছে না, সম্মানও করে না।

বিএনপির শাসনকালে স্বাধীনতাবিরোধী এবং রাজাকারদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ও সুযোগ-সুবিধাদানে সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করা কিংবা তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অজস্র নজির স্থাপন করা হয়েছে। সে কারণেই মির্জা ফখরুল সাহেব এবং তাঁর দলের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতার অর্থ বহন করে না। যেহেতু ১৯৭১ গ্রহণ করতে যথেষ্ট দ্বিধা রয়েছে, তাই ৭ নভেম্বরকে বিএনপির মতো করে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ভাবতে ভাবতেই মুখ ফসকে বের হয়ে গেল। তবে মির্জা ফখরুল যেহেতু ৭ নভেম্বর ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ দিবস বলে অভিহিত করেছেন, তাই প্রশ্ন জাগে প্রথম স্বাধীনতা দিবস কোনটি? ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ দিবসের পরের ইতিহাস পাকিস্তানি ভাবাদর্শের—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা দিবস সম্পূর্ণরূপে বাঙালি জাতিসত্তা ও অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী বিকাশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে আলাদা। সুতরাং মির্জা ফখরুলের দাবি মোতাবেক ৭ নভেম্বর পাকিস্তানি ভাবাদর্শের যে স্বাধীনতার পুনরুজ্জীবন জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তাঁর দল গঠনের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল, সেটি মূলতই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রথম ঘটেছিল, তাহলে ধরে নেওয়া যায় মির্জা ফখরুল সাহেবদের প্রথম স্বাধীনতা দিবস হচ্ছে ১৪ই আগস্ট ১৯৪৭ সাল। সেই স্বাধীনতার বিলুপ্তি ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের পর। পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রতি যাদের আস্থা ও বিশ্বাস ছিল তারাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে মানতে পারেনি। সুতরাং তাদের স্বাধীনতার আরেকটি দিন তাদের প্রয়োজন। সেটি ৭ নভেম্বর। মির্জা ফখরুল এমনটি আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন। তবে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা দিবসকে অস্বীকার করে যখন হত্যাকাণ্ডের সামরিক শাসন এবং পাকিস্তানের পুনরুজ্জীবনের যাত্রাকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করেন, তখন সেটি অবশ্যই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ বললে মোটেও অত্যুক্তি করা হবে না। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ধারা এবং এর বিপরীত ধারা এখন এক নির্মম রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ ধারায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বিএনপি স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে কতটা নগ্নভাবে দাঁড়ায় সেটি ২০০১-২০০৬ সালে দেখা গেছে। ১৯৭৫-১৯৮১ সালেও একই অবস্থা বিরাজ করেছিল। সুতরাং যে দল স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা, সহিষ্ণু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, সেই দল কখনোই গণতন্ত্রের সেবক হতে পারে না।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা