kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

দখলবাজ বলতেও ভয়

লায়েকুজ্জামান   

৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০৫:০৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দখলবাজ বলতেও ভয়

হাজি সেলিম বরাবরই সারা দেশে, বিশেষ করে পুরান ঢাকায় আলোচিত নাম। কয়েক দিন আগে ছেলের অঘটন ঘটানোর কারণে তাঁর চেয়েও এখন সবার নজর পিতা হাজি সেলিমের দিকে। জমিজমা দখলকে তিনি প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাকেও তিনি তোয়াক্কা করেননি। তাঁর দখলবাজির বুলডোজারের কবল থেকে রক্ষা পায়নি প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের শতবর্ষী ভবনও।

১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৬৫ ও ৬৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বিএনপি সমর্থিত কমিশনার প্রার্থী হিসেবে জয়লাভের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতার সিঁড়িতে পদার্পণ। এর দুই বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যান। গত নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমানেও তিনি সংসদ সদস্য।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে হাজি সেলিমের দীর্ঘদিনের সঙ্গী ও এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরান ঢাকায় হাজি সেলিমের পরিবারের মালিকানায় থাকা বাড়ি, ভবন ও বিপণিবিতানের সংখ্যা এক শর ওপরে। তিনি মূলত তিন শ্রেণির ভূমি দখলের জন্য বেছে নেন। এগুলো হচ্ছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জমি, মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে, এমন ভূমি এবং দুর্বল মালিকানার শরিকদের জমি। ভূমি দখলের পর বেশির ভাগ জমিই তিনি নানা কৌশলে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বৈধ করে নিয়েছেন। তবে এখনো বৈধ করতে পারেননি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন জমি।

একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, কোনো জমি নিয়ে শরিকানা বিরোধ আছে—এমন খবর পেলে তিনি লোকজন পাঠিয়ে ওই জমি দখলে নেন, পরে বিভিন্ন কৌশলে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন। মালিকানার কাগজপত্র তৈরি করে নেন। আবার কোনো জমির মালিকানা নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে বিরোধ বাধলে তিনি প্রথমে যেকোনো একজন শরিকের জমি কিনে নেন। এরপর চাপ দিয়ে পুরো জমি দখল করেন। বাকি শরিকরা নামমাত্র মূল্যে জমি লিখে দিতে বাধ্য হন।

এসব নিয়ে পুরান ঢাকায় আড়ালে আবডালে আলোচনা চললেও কেউ প্রতিবাদ বা অভিযোগ জানানো কিংবা মুখ খোলারও সাহস পাননি। এখনো কেউ সাহস করে মুখ খুলছেন না। অনেকেরই আশঙ্কা, হাজি সেলিম দ্রুতই এই ঝামেলা কাটিয়ে উঠে স্বমূর্তিতে ফিরবেন।

হাজি সেলিমের আদি বাড়ি ২৬ দেবীদাসঘাট লেনে। পিতা চান মিয়া ছিলেন ঠেলাগাড়ির সরদার। ইসলামিয়া স্কুলের সামনে একটি পানের দোকান ছিল তাঁদের। হাজি সেলিমও বসতেন ওই দোকানে। এরপর তিনি চলে যান বাদামতলী ঘাটে। শুরু করেন সিমেন্টের ব্যবসা। এই ব্যবসা থেকেই তাঁর উত্থান শুরু। কথিত আছে, ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা সিমেন্টের বস্তায় মাটি মিশিয়ে বিক্রি করতেন তিনি।

১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৬৫ ও ৬৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বিএনপি সমর্থিত কমিশনার প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ৬৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হন তাঁর স্ত্রী গুলশানারা। এই সময়েই পুরান ঢাকায় ব্যাপক আলোচিত হন হাজি সেলিম। তাঁর দখলবাজিও শুরু এই সময়েই। সংসদ সদস্য হওয়ার পর ব্যাপক হারে বাড়ে তাঁর দখল বাণিজ্য।

হাজি সেলিমের বড় স্থাপনা চান সরদার কোল্ড স্টোরেজ। এই জমির মালিক ছিলেন বিহারি জমিরউদ্দিন ও তাঁর ভাইয়েরা। ভাইদের মধ্যে বিরোধ ছিল জমি নিয়ে। হাজি সেলিম এক ভাইয়ের অংশ ক্রয় করে পরে পুরো জমি দখলে নেন। স্বল্প মূল্যে অন্য ভাইয়েরাও তাঁকে জমি লিখে দিতে বাধ্য হন।

নলগোলা মসজিদের পাশে প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে মদিনা ক্রোকারিজ মার্কেট। এই জায়গা সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত। সোয়ারীঘাটে ১১ কাঠা জায়গার ওপর নির্মাণ করা হয়েছে মদিনা ট্যাংকের শোরুম। এই জায়গা বিআইডাব্লিউটিএর। উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলার অঙ্গীকারনামা দেওয়ার পরও স্থাপনাটি ভাঙেনি অবৈধ দখলদার।

কামালবাগে তৈরি করা হয়েছে মদিনা ফিলিং স্টেশন। এই জায়গা বধির স্কুলের। এক একর জায়গা সরকার বধির স্কুলের নামে বরাদ্দ দিলেও জোর করে দখলে রেখেছেন হাজি সেলিম। মূক ও বধির সংস্থার সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকার একাধিকবার জমিটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েও পারেননি। মদিনা ফিলিং স্টেশনের পেছনে দেড় একর জায়গা দখলে নিয়ে ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন হাজি সেলিম। ওই জায়গা ঢাকা ওয়াসার। এই জায়গাগুলো ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভেতরে হলেও কেরানীগঞ্জ উপজেলার চররঘুনাথপুর মৌজার অধীনে।

লোহারপুল এলাকায় এক একর জায়গার ওপর নির্মাণ করা হয়েছে মদিনা রড-সিমেন্ট বিক্রির মার্কেট। জায়গাটির মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পাউবো কয়েক বছর পর পর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করার সময় প্রতিবারই নিজেই সরিয়ে নেবেন বলে মুচলেকা দিয়ে রক্ষা পেয়ে যান হাজি সেলিম। এর পাশেই পাউবোর ১০ কাঠা জায়গা দখল করে মদিনা ডেভেলপার কম্পানির সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে।

হাজি সেলিমের সবচেয়ে আলোচিত দখলবাজি হচ্ছে চকবাজারের জাহাজ বিল্ডিং। এটা ছিল পুরান ঢাকার প্রথম বাণিজ্যিক বিপণিবিতান। মোগল স্থাপত্য অনুসরণে বুধে হাজি নামের এক ধানঢ্য ব্যক্তি এক হাজার দোকানের এই বিপণিবিতান তৈরি করেন। ১৮৭০ সালে তিনি উত্তরসূরিদের জন্য বিপণিবিতানটি ওয়াকফ করে যান। এটা দেখভাল করতে থাকেন বুধে হাজির উত্তরসূরি হাজি আবদুল হক। ভবনটি না ভাঙার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও গত রমজানের ঈদের আগের রাতে দোকানের মালপত্রসহ ভবনটি গুঁড়িয়ে দিয়ে দখলে নেন হাজি সেলিম।

কামরাঙ্গীর চর থানার ঝাউচরে বিআইডাব্লিউটিএর তিন বিঘা জমি অবৈধভাবে দখল করে গুদাম নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন হাজি সেলিম। এ বিষয়ে বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক (বন্দর) এ কে এম আরিফউদ্দিন বলেন, ‘ওই জায়গাটি আমাদের এবং উচ্ছেদের পর আবারও তিনি গুদাম নির্মাণ করেছেন।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিব্বত হলের ৮.৮৮৯ কাঠা জায়গা দখলে নেন হাজি সেলিম। ওই জমির সঙ্গে ভাওয়াল এস্টেটের আরো প্রায় ৪৫ কাঠা জায়গা দখলে নিয়ে স্ত্রীর নামে নির্মাণ করেন গুলশানারা মার্কেট। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো জায়গাও রয়েছে তাঁর দখলে। অগ্রণী ব্যাংকের দখল করা ১৪ শতাংশ জায়গা এরই মধ্যে দখলমুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন লোকের নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাদের জায়গা-জমি দখলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে।

জমিজমা দখল করার জন্য হাজি সেলিমের রয়েছে অস্ত্রধারী এক বিশাল বাহিনী। এই বাহিনীই মূলত দখলের নেতৃত্ব দেয়। এর মধ্যে রয়েছেন চকবাজারের হিরো কামাল, লালবাগের দেলোয়ার মিয়া, সুরমা আলমগীর, নেহাল ও রাজ্জাক। লালবাগ, কামরাঙ্গীর চর, মৌলভীবাজার, মিটফোর্ড, ওয়াইজঘাট, বাদামতলী, ইসলামপুরসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হাজি সেলিমের দুই শতাধিক সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করে চলছে।

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য গতকাল হাজি সেলিমের বাসায় গেলে তিনি প্রথমে দরজা খোলেননি। একপর্যায়ে দরজা খোলেন কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে আবার বন্ধ করে দেন।

এরপর ঘুরে দেখা যায়, হাজি সেলিমের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কিছু খোলা থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিরা কেউ নেই। যাঁরা আছেন তাঁদের কাছে কিছু জানতে চাইলে বলেন, ‘আমরা কর্মচারী, আমরা কিছু জানি না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা