kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩ ডিসেম্বর ২০২০। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

ব্যাংকিং খাতকে বর্তমান সমস্যা থেকে বেরোতে হবে

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ   

৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০৪:৫০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ব্যাংকিং খাতকে বর্তমান সমস্যা থেকে বেরোতে হবে

বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে দেশের ব্যাংকিং খাতের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে; কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকিং খাত নিজেই ধুঁকছে, যার নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক আর্থিক খাতের ওপরই পড়েছে। এর মধ্যে দেশের অর্থনীতির জন্য বড়সড় ধাক্কা হয়ে আসে করোনাভাইরাস সংক্রমণ। শিগগিরই এই মহামারির শেষ দেখা না গেলেও একে মোকাবেলা করেই আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতকে আবারও সামনে এগিয়ে আসতে হবে। এই এগিয়ে আসার পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা দরকার।

প্রথমত মনে রাখতে হবে, আমাদের ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নানা রকম চ্যালেঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সেসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই করোনাকালীন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি তথা প্রণোদনা প্যাকেজটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, এই প্রণোদনা প্যাকেজটি ব্যাংকনির্ভর, বলতে গেলে ঋণনির্ভর। প্যাকেজটির সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এটি মোটামুটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্যাকেজ, যা বিভিন্ন সেক্টরকে অন্তর্ভুক্ত করে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু এর বাস্তবায়নটা হলো অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিছুটা পেয়েছে। বাকিরা পায়নি। শেয়ার মার্কেট পায়নি, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও পায়নি। কৃষি খাতও পায়নি। অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে এর বাস্তবায়ন। এ ছাড়া সাধারণ ঋণপ্রবাহেও গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জনে আমাদের ব্যাংকি খাত যে ভূমিকা পালন করেছে, তা এখন কেমন যেন কিছুটা থমকে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য (অ্যাকসেস লিকুইডিটি) দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর খরচ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও পর্যাপ্ত ছাড় দিয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোয় ঘাটতি কমিয়ে আনা গেলেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে ব্যাংকিং খাতের আরেকটু সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত।

বাস্তবতা হলো, ব্যাংকিং খাতে যদি শ্লথ গতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়, তাহলে তা সামগ্রিক আর্থিক খাতকেই গ্রাস করে। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের সংকট সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতে ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদনশীলতা, অন্যান্য অর্থনৈতিক তৎপরতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, এমনকি জীবনযাত্রা—সব জায়গায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম অর্থনৈতিক তৎপরতাকে গ্রাস করার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমরা দেখেছি ২০০৭-০৮ সালের বিশ্বমন্দায়। তখন এ খাতে অনেক দুর্নীতি ও অনিয়ম সংঘটিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহনির্মাণ খাতে ধস এবং সেখানকার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলো কলাপস করেছিল। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন বাংলাদেশেও এর কিছু প্রভাব পড়ে।

বর্তমানে কভিড-১৯-এর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব এবং দেশীয় অর্থনীতিতে প্রকট ও দীর্ঘস্থায়ী। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নিজেদের ভূমিকা আরো গতিশীল করতে হবে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও একটা ভূমিকা আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো শক্ত অবস্থান নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যাপারে ডেডলাইন দিয়েছে। সেপ্টেম্বরে তা শেষ হয়ে গেছে। বলতে গেলে, এসএমই খাতে প্যাকেজের কোনো ঋণ যায়নি; কিন্তু এর পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এর মধ্যে আবার খেলাপি ঋণে বারবার সময় বাড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সুদ দিতে হবে না। আবারও ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদ মওকুফের সময় বাড়ানো হয়েছে।

দিন দিন খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং আদায়ে গড়িমসি কেন দেখা যায়? এর কতগুলো বিশেষ কারণ আছে। প্রথমটা হলো, আর্থিক (ফিন্যানশিয়াল নর্মস) এবং ব্যবস্থাপনা প্রথা (ম্যানেজমেন্ট নর্মস) পরিপালন সন্তোষজনকভাবে না হওয়া। এই সব প্রথা পরিপালন না করার অর্থ হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, সেটা শক্ত হাতে নিচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, অনিয়ম ধরা পড়লেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তি না পাওয়া। এখানে রীতিমতো কালচার অব ইম্পিউনিটি (দায়মুক্তির সংস্কৃতি) চলছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। এ কারণে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারি দেখা যায়, যার সর্বশেষ নাম পিকে হালদার। এই পিকে হালদার তো হঠাৎ উদিত হয়নি। পর্যায়ক্রমে ঘটেছে। যেখান থেকে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা সেটা করা হয়নি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কতগুলো বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রথমত, ব্যাংকগুলোকে আরো সক্রিয় হতে হবে। আরো গঠনশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আরো উদ্ভাবনী উপায়ে গতানুগতিক পথ পরিহার করতে হবে, বিশেষ করে ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ও ঋণদানের ব্যাপারে। এখন ছোট ও মাঝারি শিল্প গতানুগতিক প্রক্রিয়ার মুখে পড়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, ঋণ পাচ্ছে না। তৃতীয় বিষয়টা হচ্ছে মনিটরিং বাড়াতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আমি বলব, দুর্বলতা কাটাতে ব্যাংক অনুযায়ী পারফরম্যান্স সূচক বেঁধে দিতে। এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি বা পারফরম্যান্স ভালো না হলে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পরিষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ অগ্রগতি ভালো না হলে শুধু এমডির সঙ্গে আলোচনাই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বিভিন্ন ব্যাংক মালিকদের ভূমিকা ও প্রভাব আমলে নিতে হবে। এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন, খেলাপি করছেন, তা বন্ধ রাখতে হবে। এ জন্য ব্যাংকিং সুশাসনটা খুব দরকার। এখানে পরিচালক বা চেয়ারম্যানের আরো জবাবদিহি করতে হবে।

সম্প্রতি সানেম (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকার ওপর একটা গবেষণা করেছে। তাতে গভর্ন্যান্স ও পলিটিক্যাল ইকোনমির ওপর বেশ জোর দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাত আগের মতো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে আরো উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের পথে ব্যাংকিংসেবা এবং ব্যাংকের ভূমিকা আরো প্রভূত উন্নত করতে হবে। আরেকটি বিষয়, আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপরও কিন্তু নানা রকম চাপ থাকে। এই মুহূর্তে তাদের চাপ থেকে বেরিয়ে আসা খুব দরকার। তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দেশনা দেওয়া সীমিত, কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সরকারের অর্থ বিভাগ আছে। অথচ বেসরকারি ব্যাংকের বিষয়েও যদিও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার রয়েছে, তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খুব একটা শক্ত ভূমিকা দেখা যায় না। আমার মনে হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সব ব্যাংকের ব্যাপারে আরো প্রো-অ্যাকটিভ হয়, তবে সরকার বা অর্থ বিভাগ থেকে অহেতুক হস্তক্ষেপ কমানো যাবে। কিন্তু সেটা করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দ্বিতীয়ত, মালিকপক্ষের দায়। এখন ব্যাংকগুলোতে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। এখানে সেবা দেওয়ার ইচ্ছাটা মুখ্য নয়। যে যার মতো করে বিশেষ ব্যবসায়ী গ্রুপ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ভাগ করে নিয়েছে। একটি ব্যাংকের সঙ্গে আরেকটি ব্যাংকের প্রতিযোগিতা হলে যে সর্বোচ্চ সেবাটা পাওয়া যাবে, সেটা আর নেই। তৃতীয়ত, বিগ বিজনেস হাউসগুলো ব্যাংকিং খাত ম্যানিপুলেট করে। তারা বড় লোন বেশি পাচ্ছে। ছোটদের জন্য ঋণ ডিসবার্সমেন্ট খুব একটা হয় না। আবার যেসব সদস্যভিত্তিক বাণিজ্যিক ট্রেড বডিসগুলো রয়েছে—এফবিসিসিআই, এমসিসিআই বা অন্যান্য আঞ্চলিক ব্যাবসায়িক সংগঠন, তাদেরও ছোট, মাঝারি এবং অবহেলিত ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ভূমিকা চোখে পড়ে না।

২০১৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী ফরাসি অর্থনীতিবিদ জাঁ তি হল এবং তাঁর কিছু সহকর্মী একটা বই লিখেছিলেন—‘ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস’ (২০১০) গ্রন্থে বিশ্বের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা ও সংকট নিয়ে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। গ্রন্থটিতে আমাদের মতো দেশের অর্থনীতিকে খুব একটা ফোকাস দেওয়া হয়নি; কিন্তু বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, উন্নত দেশগুলোর সমস্যা নিয়ে লেখকদের যা আলোচনা, সেসব সমস্যা আমাদের দেশে আরো প্রকটতর।

আরেকটি বিষয়, আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি দুর্বল হয়, ব্যাংকগুলো যদি দেশের অর্থনীতির লক্ষ্য অনুযায়ী সেবা দিতে না পারে, তাহলে আপনি কী করে চিন্তা করেন যে আমাদের পুঁজিবাজার আরো উন্নত ও গতিশীল হবে? শেয়ারবাজার এবং বন্ডের বাজার দুটিকেই উন্নত করতে হলে মনে রাখতে হবে যে ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে পুঁজিবাজার তথা সামগ্রিক আর্থিক খাতের সম্পর্কটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সব শেষে বলব, কভিড থেকে বের হয়ে আমাদের উন্নতি টেকসই করতে চাইলে প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর প্রচেষ্টা জোরদার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গতানুগতিকতার বাইরে যাওয়া, তথা উদ্ভাবনীমূলক চিন্তা করা। এর সঙ্গে আমাদের রাজনীতির সদিচ্ছার প্রতিফলন দেখাতে হবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ব্যাংকিং খাতে কেমন করে ঋণগুলো দিন দিন ক্রমাগত খেলাপি হচ্ছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। অথচ সবাই নির্বিকার। আমাদের নেতারা এবং অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন, আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যদিও বাস্তবে সেটাকে আমি বলব আলোর ঝলক, সামনে এগিয়ে যাওয়ার কিছু পাথেয় মাত্র, তবে আরো করণীয় অনেক বাকি। অনেকেই আসল সমস্যা দেখছেন না। রোগ দেখছেন, রোগের কারণগুলো দেখছেন না। কারণগুলো কী? শিথিল নীতি, নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব, সর্বোপরি সুশাসনের অভাব, জবাবদিহির অভাব—এগুলো মূল কারণ। টেকসই ব্যাংকি খাত নিয়ে অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের এসব সমস্যা দূর করতেই হবে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা