kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

ভিন্নমত

খাদ্য মজুদ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত

আবু আহমেদ   

২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:১৮ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



খাদ্য মজুদ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত

পর পর দুটি খবর উদ্বেগের। সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আমনের পর্যাপ্ত ফলন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দফায় দফায় বন্যার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে জানা গেছে, দেশে খাদ্য মজুদ দ্রুত কমছে। আমন ওঠার আগে আগে খাদ্য মজুদের কিছুটা কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে আমনের ফলন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বেশি পরিমাণে ও দ্রুতগতিতে মজুদ কমতে থাকায় উদ্বেগটা এড়ানো যায় না। উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, বিশ্বে যেসব দেশে কমবেশি খাদ্য খাটতি আছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে জনবহুল দেশের একটি। অর্থাৎ আমাদের খাদ্যের চাহিদা বেশি। আরেকটি উদ্বেগের কারণ হলো, আমাদের অসাধু ব্যবসায়ীচক্র, যারা সামান্য খাদ্যপণ্যের ঘাটতিকেই কাজে লাগিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলে। আবার আমাদের জনগণও চাল-গমের দাম দিয়ে সরকারকে মূল্যায়ন করতে চায়। এর মধ্যে কভিডের কারণে বিশ্ববাণিজ্যের মন্দার বিষয়টি তো আছেই। ফলে আমনের ফলন কেমন হবে, সেদিকে না তাকিয়ে করণীয় নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

১৪ অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যশস্যের মোট মজুদের পরিমাণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার টন। এর মধ্যে চাল আট লাখ ৮৩ হাজার টন এবং গম তিন লাখ ১২ হাজার টন। গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের একই সময়ে সরকারের গম ও চাল মিলিয়ে খাদ্য মজুদ ছিল ১৭ লাখ ২০ হাজার টন। তার মানে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর খাদ্য মজুদের ঘাটতি প্রায় পাঁচ লাখ টন, যা শতকরা হারে ৩০ ভাগ কম। আবার গত এক মাসের ব্যবধানে মজুদ কমেছে প্রায় তিন লাখ টন। তার মানে মজুদ কমছে খুব দ্রুত।

গত বছর বিশ্বজুড়ে কভিড ছিল না। দেশেও ভালো ফলন হয়েছে। তখন বিশ্ববাণিজ্যও মোটামুটি চালু ছিল। এখন বিশ্বজুড়ে কভিড চলছে। বর্তমানে বিশ্বে খাদ্যশস্যের বাণিজ্যও সীমিত হয়ে যাচ্ছে, অনেকটা লোকালাইজড বা স্থানীয়করণ হয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ, দূর দেশ থেকে পণ্য আনা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ জন্য মিসর, তাইওয়ান, জর্দানসহ বিভিন্ন দেশ প্রচুর পরিমাণে খাদ্য মজুদ করছে। আবার তাদের লোকসংখ্যাও আমাদের মতো বেশি নয়। আমাদের চাহিদা বেশি বলে যখনই গোডাউনে মজুদ কমে যাওয়ার খবর আসে, তখনই স্থানীয় সিন্ডিকেটেড বাণিজ্য শুরু হয়ে যায়। সুযোগ পেলে এই সিন্ডিকেট চাল ও গমের মূল্য ৩০ বা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। তখন চালের দাম খুচরা বাজারে ৭০-৮০ টাকা কেজি হয়ে যেতে পারে। আমরা দেখে আসছি, এই সিন্ডিকেট সব সময় সরকারি গুদামের খবর রাখে।

বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি বৈশ্বিক প্রবণতাও বিবেচ্য বিষয়। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, ভারতসহ চাল রপ্তানিকারক দেশগুলো যদি দেখে আমাদের দেশে চালের ঘাটতি আছে, তখন তারাও দাম বাড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা গেছে, বাংলাদেশের চালের চাহিদা বাড়লেই রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রতি টন চালে ৫০ ডলার পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেয়। তাদের প্রবণতা হলো, বিশ্ববাজারে চালের দাম নির্ধারণে বাংলাদেশকে ‘ডিটারমাইনিং ফ্যাক্টর’ হিসেবে বিবেচনা করা। বাংলাদেশের চাহিদা বেশি হওয়ার কারণেই এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে একজন অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার পরামর্শ, বাংলাদেশকে চাল-গম আমদানি করার বিষয়ে সময় থাকতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারের গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতেই হবে। যদি খাদ্য নিরাপত্তা আমরা চাই, আমাদের সেদিকেই যেতে হবে। আমাদের কৃষকরা উৎপাদন করছেন, এটা ঠিক আছে। তবে রাতারাতি আমরা উৎপাদন ২০ বা ৩০ শতাংশ বাড়াতে পারব না। আবার আমনের ফলন নিয়েও সংশয় রয়েছে।

আমদানি করে সাময়িকভাবে খাদ্যের মজুদ বাড়ানোর চিন্তা যেমন করা দরকার, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ খাদ্যোৎপাদন আরো বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দেওয়া দরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের দুটি সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। প্রথমটা হলো, কৃষিজমি দ্রুত কমে যাওয়া। দ্বিতীয়টা কৃষকের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া। আমার জানা মতে, গত এক যুগে ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। জমির বহুমুখী ব্যবহারের সঙ্গে যে হারে ফসলি জমি কমছে, তাতে ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা দরকার।

জমি হলো একটি সাবস্টিটিউট বিষয়। মানুষ এর থেকে সর্বোচ্চ আর্থিক সুবিধা নিতে চায়। তাই একটিতে লাভবান না হলে কৃষক জমির অন্য ব্যবহারে ঝোঁকেন। এই বহুমুখী ব্যবহারের কারণেই ফসল উৎপাদন কমছে, বিশেষ করে ধান। তাই ফসলি জমি কৃষি সম্পর্কিত অন্যান্য উৎপাদনকাজেও ব্যবহার হচ্ছে বেশি। যেমন—মৎস্য, দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামার। কৃষক যখন ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, তখন তাঁরা জমির বিকল্প ব্যবহারের দিকে ঝোঁকেন, বিশেষ করে খাদ্যশস্য উৎপাদন না করে অন্যান্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন। তাই কেউ ফসলি জমিতে পুকুর করে মৎস্য খামার গড়ে তুলছেন, আবার কেউ পোল্ট্রি ও দুগ্ধ খামার গড়ে তুলছেন। অনেক সচ্ছল ব্যক্তি কৃষিতে হতাশ হয়ে জমিতে বনজ গাছও লাগিয়ে রাখছেন। তাঁরা মনে করেন, ফসল করে ঠকার চেয়ে ১০-১৫ বছর পর গাছ বিক্রি করে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। কেউ কেউ তো ফুল, ফলের বাগানও করছেন। এর বাইরে অপরিকল্পিত আবাসিক স্থাপনা, আবাসিক প্রকল্প ও শিল্পায়ন আমাদের কৃষিজমির বড় অংশ গ্রাস করছে। আশার দিক হলো, আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা অধিক ফসল উৎপাদনে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন সরকারের দায়িত্ব ফসলি জমি রক্ষার পাশাপাশি কৃষককে ন্যায্য মূল্য প্রদান করে ফসল উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া। আরেকটি বিষয় হলো, সরকার ফসল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সার, বীজ বা সেচে যে ভর্তুকি দেয় সেটা ঠিক আছে। সরকারের উচিত, প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি খাদ্য অপচয় রোধ, খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি এবং এর ব্যাপ্তি বাড়ানো।

সরকারি কর্তব্যের পাশাপাশি আমাদের মধ্যবিত্তের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনা দরকার। সরকার যদি প্রকিউরমেন্টের মাধ্যমে কৃষককে আরো বেশি মূল্য দিতে চায়, তাহলে বেশি দামে চাল কেনার মানসিকতা আমাদের থাকতে হবে। আমাদের মিডল ক্লাসের মানসিকতাই হচ্ছে সস্তা পাওয়া। এ কারণেই দাম না পেয়ে কৃষক ঠকেন এবং তাঁরা জমির ব্যবহার অন্যদিকে নিয়ে যান। জনগণের সস্তায় পাওয়ার মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য তাঁদের উদ্বুদ্ধ করা উচিত।

মনে রাখতে হবে, সরকারি গুদামে চালের মজুদ আমাদের সামাজিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতার রক্ষাকবচ। গোডাউনে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল রাখার একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আছে। গোডাউনে চাল আছে, এ তথ্যই বাজারকে স্থিতিশীল রাখবে। যখন চাল নাই এই তথ্য তাঁদের কাছে যাবে, তখনকার প্রবণতা দাঁড়ায়—যেহেতু চালের মজুদ নেই, তাই বাইরে যা আছে তা মজুদ করো।

এই পরিস্থিতিতে আমার পরামর্শ হলো, মজুদ বাড়াতে সময় থাকতে আমদানি করতে হবে। ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে ওঠার আগেই সরকারকে তৎপর হতে হবে। আমদানি করার জন্য আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার কোনো সমস্যা নেই। চালের মজুদের সঙ্গে আরো অনেক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত আছে। সুতরাং সময় থাকতেই পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে। সরকারকে ভাবতে হবে, পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখা মানে এক ধরনের বিনিয়োগ।

খাদ্যের মজুদ কমার পেছনে যে কারণটা জানা গেছে, তা হচ্ছে সরকার যে পরিমাণ চাল বাজারে ছেড়েছে, সেই পরিমাণ সংগ্রহ করতে পারেনি। এখন যদি চালের দাম বেড়ে যায়, তাহলে গরিব লোকদের সরবরাহের জন্য খোলাবাজারে বিক্রি আরো বাড়াতে হবে। একেবারে দরিদ্র মানুষ যাতে সাশ্রয়ী মূল্যে চাল কিনতে পারে—সেই প্রস্তুতিও সরকারকে নিয়ে রাখতে হবে। না হলে সমাজে অসন্তোষ দেখা দেবে। করোনাভাইরাসের কারণে নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। গবেষকরা বলছেন, মধ্যবিত্তের তুলনায় নিম্নবিত্তের লোকদের ক্রয়ক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। সাধারণভাবে গরিবদের ক্রয়ক্ষমতা যদি ১০ শতাংশও কমে যায়, তাহলে সেটা অনেক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়; কিন্তু ধনীদের সেটা ২০ শতাংশ হলেও কোনো সমস্যা হয় না। কারণ গরিব সব সময় প্রান্তিক অবস্থানে থাকে। এ কারণে গরিবের চালে ৫ বা ১০ টাকা বেশি বাড়লেই তার জন্য খুব অসুবিধার সৃষ্টি হয়। তাই তাদের অভাব পূরণ করতে পূর্বপ্রস্তুতি রাখতে হবে।

চাল যদি আমদানি করতেই হয়, তাহলে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দেরি করলে চলবে না। সরকার সময় নিলে সিন্ডিকেট ট্রেডিংয়ে জড়িত ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেবেন। চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোও দাম বাড়িয়ে দেবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে চালের মতো বিষয় বেসরকারি খাতের ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দিলে চলবে না।

আমার কথা হলো, যদি বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে এটা সামাজিকভাবে খুব অগ্রহণযোগ্য ব্যাপার হবে। বাংলাদেশে এখন ভারত থেকে মাথাপিছু আয় বেশি। এখন বাংলাদেশে যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে চালের দাম বেড়ে যায়, তাহলে এই সব অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দেশ বড়লোকের সমাজ হয়ে গেছে—এই প্রশ্ন আসবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা