kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

অটোপাস যেন অক্টোপাস কবলিত না হয়

গোলাম কবির   

২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:১৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অটোপাস যেন অক্টোপাস কবলিত না হয়

সব ধর্ম ও সমাজে জ্ঞানার্জনের প্রাধান্য আছে। সত্যিকার জ্ঞানীরা বিলম্বে হলেও পরিণামে সম্মানিত হন। জ্ঞান আহরণের জন্য বয়ঃক্রমের পরিধি নেই। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত যে পথ প্রসারিত। দূরত্বও প্রতিবন্ধক নয়। একদা স্বর্গ থেকে মর্তে আসত দেবশিশুরা। জ্ঞানের প্রয়োজনে চীন পর্যন্ত যেতে বলা হয়েছে (উতলুবুল ইলমা অলাউ কানা ফিসসিন); তখনকার দিনে চীনের দূরত্ব বেশি ছিল। অবারিত জ্ঞানচর্চার দ্বার সেখানে ছিল মুক্ত। আমরা এসব বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণের যোগ্যতা রাখি না। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে চারপাশে তাকিয়ে দেখে ভাবছি, আমাদের বর্তমান শিক্ষার আকালের দিকটি কি চিরকালীন থেকে যাবে! তা বোধকরি থাকতে দেওয়া যায় না।

জাগতিক ও সামাজিক বিষয়াদির পরিচয়ের জন্য জ্ঞান আহরণ আবশ্যক। তা ছাড়া বিষয়টি মানবাধিকারের অপরিহার্য অংশ। তবে প্রশ্ন উঠবে, দুর্বল মেধার মানুষ অথবা অনুশীলনবিমুখ ব্যক্তি উচ্চতর জ্ঞানের ভুবনে কত দূর পর্যন্ত প্রবেশাধিকার পাবে।

ভাবা অন্যায় নয়, এখনকার উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পর্যন্ত সত্যিকার লেখাপড়ার সঙ্গে পরিচয় থাকলে সামাজিক বিষয়াদির কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। নিকট অতীতে দেখেছি, সরকারি অফিসের বড়বাবু হিসেবে কথিত কর্মচারীদের একটা বড় অংশ ম্যাট্রিকুলেশনের বেশি পড়ার সুযোগ পাননি। অথচ ইংরেজি ভাষায় হলেও তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে নথিপত্র পরিচালনা করেছেন। এখনকার উচ্চশিক্ষার সহজলভ্যতার প্লাবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত সনদ করায়ত্ত করেও আমাদের ফেলে আসা গৌরব বড়বাবুদের সমকক্ষ হতে পারছে না। এর মোজেজা কী? অথচ উচ্চশিক্ষার সনদপ্রাপ্তির প্রতিষ্ঠান জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। সচেতন মানুষ ভাবছেন, এই প্রবণতা কভিডের চেয়ে মারাত্মক। শিক্ষাহীন সনদ তিল তিল করে সংশ্লিষ্টদের হত্যা করছে। অবশ্য কিছু ভাগ্যবান তার ব্যতিক্রম। এটা চিরকালই ছিল।

বলতে গেলে সারা দুনিয়ার রাজনীতিতে সমুন্নত প্রভাব ব্যবসায়ীসমাজের। হয়তো অনুরূপ প্রক্রিয়ায় অনার্স-মাস্টার্স পাঠের ধুম, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার তৈরির কাবুলিওয়ালার প্রতিষ্ঠান। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টান পড়ার আশঙ্কা। পক্ষান্তরে শিক্ষাব্যবসায়ীরা মোচে তা দিচ্ছেন। তথাকথিত অনার্স-মাস্টার্সদের আমরা আংশিক চিনেছি। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, বিশেষ করে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে সনদ সংগ্রহকারীদের আমরা চিনতে শুরু করেছি। চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁদের ব্যুৎপত্তির সন্ধান আমরা সাধারণ পাবলিক নিতে পারব না। তবে চিকিৎসাপত্রে চিকিৎসাশাস্ত্রের পারিভাষিক শব্দের বানান অনেকে শুদ্ধ করে লিখতে পারছেন না। এ বিষয়ে আমার উন্মীলন ঘটাল আমার এক ছাত্রের মেধাবী এমআরসিপি কন্যা।

যাবতীয় শিক্ষাক্ষেত্রে এই যে ভয়াবহতা তার মুখব্যাদান আমরা প্রত্যক্ষ করতে চলেছি। ‘করোনা’ বিপর্যস্ত পৃথিবী। অনলাইন-টুলাইন করেও শিক্ষার স্বাভাবিক গতি ফেরানো কঠিন। এ পরিস্থিতিতে অটোপাস দিতে হয়েছে। অটোপাসে কিন্তু সত্যিকার মেধাবীরা বিপাকে পড়লেও বিদ্যাব্যবসায়ীরা মৌজে আছেন (সবাই পাস), রসদের অভাব হবে না। তা ছাড়া সনদ ক্রেতারা দেখে আসছেন, সামনে-পেছনের কোনো দরজা দিয়ে যাঁরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করতে পারেননি, তাঁরাই দেশে-বিদেশের শিক্ষা কারখানা থেকে সনদ সংগ্রহ করে পায়ার জোরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সেজে বসছেন। ফলে অনেকের নজর যেনতেন প্রকারের সনদ সংগ্রহ। অথচ জ্ঞান আহরণের মূল উদ্দেশ্য মননের সৃজনীশক্তি বৃদ্ধি (হুজুগের সৃজনশীলতা নয়)।

প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য অটোপাস। এটাকে মওকা হিসেবে পেয়ে গেছে কিছু শিক্ষাব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। সবার জানা, অক্টোপাস কবলিত হলে প্রাণহানি অনিবার্য। তবু আলেয়াকে আলো ভেবে আমাদের সন্তানরা অগ্নিস্নাত হচ্ছে, যার পরিণতিতে আমরা জাতি হিসেবে পঙ্গু হয়ে যাব।

ব্যবসায়ীদের নজর পুঁজি বৃদ্ধির দিকে। আর প্রকৃত রাজনীতিকরা চান মানবকল্যাণ। দুর্ভাগ্য, অনেক নকল দেশপ্রেমিক নানা ক্ষমতার পদলেহন করে নতুন ক্ষমতাধরদের প্রশ্রয়ে রাজনীতি কলুষিত করেন। তাঁরা বিভিন্ন ধরনের অপব্যবসা শুরু করেন। এ জন্য কত কৌশল তাঁদের জানা! আর এই কৌশল দিয়ে বাজিমাত করছেন। মধুটুকু তাঁরা পান করছেন। আর গরল গলাধঃকরণে নীলকণ্ঠ হতে হচ্ছে বিশ্বমানবতার জগজ্জননীকে । শোনা গেল, ওই বিশ্ব প্রদত্ত অম্লান খেতাবের পাশে দেশের কেউ কেউ তাঁকে নতুন খেতাব দানের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করছেন। উদ্দেশ্য সাধু হলে কথা নেই; কিন্তু শিকে ছেঁড়ার মতলব থাকলে!

আমরা শঙ্কিত, শিক্ষাব্যবসায়ীরা নির্মমভাবে অটোপাসকে অক্টোপাস কবলিত করবেন। আমরা শিক্ষার দেখভালকারীদের অনুরোধ করব, অটোপাস যেন অক্টোপাস কবলিত না হয়। আমাদের বিশ্বাস, মানবতার জগজ্জননীর মানবকল্যাণকে সর্বান্তঃকরণে কাজে পরিণত করার ব্রতই হবে সবচেয়ে বড় খেতাব।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা