kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ষড়যন্ত্র কোনোটিই কাম্য নয়

ড. সুলতান মাহমুদ রানা   

২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০৩:১০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ষড়যন্ত্র কোনোটিই কাম্য নয়

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ পাস হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান হওয়ার পরও বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যম সূত্রে আমাদের চোখে পড়েছে। মোটা দাগে বলা যায়, বিগত এক মাসে এমন কোনো দিন যায়নি যেদিন ধর্ষণের কোনো সংবাদ গণমাধ্যমে আসেনি। খবরের পাতা ওল্টালেই কোনো না কোনো ধর্ষণের ভয়াবহতা চোখে পড়েছে। অন্যদিকে ধর্ষণের শাস্তি যখন মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে, তখনো সালিসের মাধ্যমে ধর্ষকের শাস্তি নিষ্পত্তির কয়েকটি ঘটনা আমাদের অবাক করেছে। ফলে আমাদের মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে এমন সালিসি কাঠামোয় ধর্ষণের বিচার নিষ্পত্তির বিষয়টি অব্যাহত থাকলে আদৌ কি ধর্ষণপ্রবণতা কমে আসবে?

সাধারণত গ্রামাঞ্চলে সালিসের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। আর এই বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতিত্বমূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবসংবলিত। যুগ যুগ ধরে গ্রাম্য সমাজজীবনে বিচার বা সালিসপ্রক্রিয়া খুবই প্রচলিত হয়ে থাকলেও এখন ভয়াবহ অপরাধের শাস্তি সালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সালিসব্যবস্থায় গ্রামপর্যায়ে নারীঘটিত বিষয়গুলো তথা ধর্ষণের মতো বিষয় সমাধানের নামে গ্রাম্য মোড়লরা রীতিমতো অনৈতিক বাণিজ্যে লিপ্ত হয়ে থাকেন। ধর্ষণের শাস্তি যখন মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে, তখন এই সালিস কাঠামোতে বিচার নিষ্পত্তির বিষয়টি বেড়ে যেতে পারে। কারণ সালিসব্যবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি ও ছত্রচ্ছায়ায়। অথচ ধর্ষণের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণও রাজনৈতিক প্রভাব। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় অনেকেই ক্ষমতার দাপট হিসেবেও এসব অপরাধকর্মকে ব্যবহার করে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ও বেপরোয়া শক্তিতে পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক শক্তি। অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করেছি, নানা ধরনের ভয়াবহতা সংঘটিত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তখন সেই দলের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখেছি।

নৈতিকতার অবক্ষয় যে নেই, তা নয়; তবে রাজনৈতিক প্রভাব এ ক্ষেত্রে প্রধান। অপরাধীরা মনে করে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাবে। তাদের কিছু হবে না। এই ভাবনা তাদের বেপরোয়া করে তোলে। তা ছাড়া ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মামলাগুলো এমনভাবে পরিচালিত হয় যে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগকারীই দোষী পরিগণিত হয়। তাদের নানাভাবে দোষ দেওয়া হতে থাকে, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয় ও বদনাম ছড়ানো হয়। সব মিলিয়ে যে নারী সহিংসতার শিকার হলেন, তাঁর প্রতি একটা ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করা হয়। এ কারণে নির্যাতনের শিকার অনেকেই মুখ খুলতে চান না, আইনের আশ্রয় নিতে চান না। সমাজের এই বর্বর মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য মানবিক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একটি চলমান মানবিক ও সামাজিক আন্দোলনই ধর্ষণের মতো ভয়াবহতা বন্ধ করতে পারে। এমনকি শুধু রাজপথে আন্দোলন করে কোনো অপরাধকে চিরতরে বন্ধ রাখা যাবে না। আইনের প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও সামাজিক প্রতিরোধ এ ক্ষেত্রে জরুরি।

গত ২২ অক্টোবর কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘আন্দোলন শেষ কথা নয়’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। আইন সংশোধন করে তখনই লাভ হওয়া যাবে, যখন ওই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হবে। ধীরে ধীরে সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর করতে হলে সমাজের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালাতে হবে। শুধু রাজপথের আন্দোলন নয়, পরিবারেও গড়ে তুলতে হবে এমন মানসিকতা। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একটি প্রবণতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে কোনো কিছু ঘটলেই সেটি সরকার পতনের ইস্যু করা। এর আগেও বেশ কয়েকটি আন্দোলনে এমন প্রবণতা প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনেও এমনটা লক্ষ করা গেছে।

আমাদের দেশে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। সরকার সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। কয়েক বছর আগে সরকারের জঙ্গিবিরোধী ভূমিকা সারা পৃথিবীতে প্রশংসিত হয়েছে।

আমরা সবাই নিশ্চয়ই স্বীকার করব, সব ক্ষেত্রে এবং সব বিষয়ে হাতেনাতে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সফলতার লক্ষ্যে বিদ্যমান দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণও সফলতার একটি মাপকাঠি বলা যায়। বর্তমান সরকার এমন দুর্বলতা চিহ্নিত করার পদক্ষেপ গ্রহণে বেশ তৎপর রয়েছে। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সরকারি দলের রাজনীতিকরা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপচর্চা করেন। ফলে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ কিছু অপরাধ বেড়ে যায়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি, সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীরা ক্ষমতার দাপটে নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে পারে। কিন্তু অভিযোগকারী কিংবা অভিযুক্তদের মধ্যে যারা অধিকতর নিরীহ তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট অপরাধী এবং তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ-সমাবেশ করে থাকে স্থানীয়রা। এতে সমর্থন জানান সুধীসমাজের প্রতিনিধি ও গণ্যমান্যরা। এমন মানববন্ধন কিংবা প্রতিবাদ জানানোর ঘটনা একটার পর একটা ঘটতেই থাকে; কিন্তু স্থায়ী সমাধান কেন হয় না? এর পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করার বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বসহকারে আমলে নিতে হবে। তা না হলে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও তা কোনোভাবে সমূলে বন্ধ করা সম্ভব হবে না। সরকারকে আইন প্রয়োগে এমন কঠোর হতে হবে যাতে কোনোভাবেই কেউ এই ধরনের নোংরা ও ভয়াবহ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দুঃসাহস করতে না পারে কিংবা রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে না পারে। সর্বোপরি সরকারের পাশাপাশি সামাজিক ঐক্যবদ্ধতাও যেকোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সহায়ক হতে পারে। তবে বিগত সময়ে বেশ কিছু আন্দোলনে আমরা লক্ষ করেছি যে আন্দোলনকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে উসকে দিতে একটি মহল তৎপর থাকে। তারা সমস্যার সমাধান চায় না, তারা চায় ক্ষমতা। কাজেই এসব ষড়যন্ত্রকারী বিষয়টি সব সময়ই বিশেষ নজরে রাখতে হবে, তা না হলে শুধু ধর্ষণ নয়, কোনো সমস্যারই স্থায়ী সমাধান দেওয়া সম্ভব হবে না।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা